ঢাকা, , মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারী ২০১৯

শাওনের আগে হুমায়ন আহমেদ ১০ম শ্রেনীর ছাত্রীর প্রেমে পড়েছিলেন

|| প্রকাশ: ২০১৬-০৭-২০ ১১:২০:১১ || আপডেট: ২০১৬-০৭-২০ ১১:২০:১১

Humaonআমার নাম কমলা। দ্যাখতে সোন্দর। তাই লোকে আমারে ‘কমলা সুন্দরী’ বইল্যা ডাকে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দিককার নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র এই কমলা’। সেই কিশোরী কমলা’কেই ভালোবেসে ফেলেছিলেন প্রেমিক হুমায়ূন। ঘরে তখন স্ত্রী গুলতেকিন আর চারটি সন্তান। দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনকে হৃদয়বন্দি করার ৬/৭ বছরের পূর্বের ঘটনা সেটি। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছিলো সেই অসম প্রণয় পর্বটিকে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো বললেন আমেরিকায় বসবাসরত বিশ্ববাতায়নের কবি-কথাকার-সাংবাদিক সালেম সুলেরী। আশির দশকে প্রবাস ফেরৎ লেখক হূমায়ূন আহমেদের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। ১৯৮৯ সালে দু’জনের যৌথ লেখায় একটি বইও প্রকাশিত হয়।

হুমায়ূন আহমেদের ২০০ বই-এর মধ্যে একমাত্র একটি বই-ই যৌথভাবে রচিত। বইটির নাম : কাদের সিদ্দিকীর গ্রন্থ সমালোচনা ও সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সেই সময়ে ভারতের প্রবাসজীবনে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী-কে ঘিরে প্রামাণ্য বইটি সংকলিত হয়েছিলো। কাছ থেকে দেখা বাঘা সিদ্দিকী ও তার বই স্বাধীনতা ৭১’ বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন সুদীর্ঘ নিবন্ধ। অন্যদিকে ভারতে গিয়ে কবি-সাংবাদিক সালেম সুলেরী গ্রহণ ও প্রকাশ করেছিলেন সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার। ছাপাও হয়েছিলো দুটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে, সাপ্তাহিক রোববার ও সন্দ্বীপে। অত:পর বই আকারে প্রকাশ। দুই লেখকের মিলন-গদ্যে সংকলিত বইটি জে. এরশাদ সরকারের শাসনামলে তুমুল আলোড়ন তুলেছিলো। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত বইটির লেখক সম্মানী কাদের সিদ্দিকী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটি’কে প্রদান করেছিলেন লেখকদ্বয়। প্রকাশের ২৩ বছর পর মৃত্যুবরণ করেন কো-রাইটার হুমায়ূন আহমেদ। স্বদেশে সক্রিয় রাজনীতিক কাদের সিদ্দিকী একাধিক কাগজে ‘হুমায়ূন বন্দনা’কালে এই বইটির কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণকারী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিইউয়র্কে মৃত্যুবরণ করেন ২০১২-এর ১৯ জুলাই। মরণব্যাধি কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় চিকিৎসা নিতে এসে অবশেষে মৃত্যুর শীতল পথেই পা বাড়ান।

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে হুমায়ূন গ্রন্থমালার একমাত্র যৌথলেখক কবি-সালেম সুলেরীর স্মৃতিকথা ধারণ করা হয়। পেশাজীবনে তিনি সাংবাদিক, একটি জনপ্রিয় পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি। আবার মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিউজ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। সাহিত্য চর্চায় বিশেষভাবে নিবেদিত। কবিতা-ছড়া-গদ্য মিলিয়ে বই-এর সংখ্যা ১৫ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত ও প্রবাসের লেখকদের সেতুবন্ধ সংগঠন তিনবাংলা’র গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট তিনি।
লেখক হুমায়ূনের প্রেমময় জীবন কেমনটি দেখেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে কবি সালেম সুলেরী কমলা সুন্দরী’র প্রসঙ্গটি চয়ন করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তি হুমায়ূনের প্রথম প্রেম গুলতেকিন বলেই আমরা জানি। প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহীম খাঁর গুণবতী দৌহিত্রী তিনি।

প্রথম তারুণ্যেই তাদের প্রেম এবং পরিণয়। ১৯৭৩ সালের সেই দম্পতি তিন বছরের মাথায় আমেরিকা পাড়ি জমায়। উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রার আর্থিক সহযোগিতা অনেকাংশে স্ত্রী গুলতেকিনই সমন্বয় করেছিলেন। টাঙ্গাইলের পৈতৃক সূত্র থেকে আহরিত হয়েছিলো অর্থ । ১৯৮৩-৮৪ সালে স্বদেশে ঘটে প্রত্যাবর্তন। আমরা হুমায়ূন ভাই-এর পাশে চিরতরুণী গুলতেকিন ভাবীকেই দেখতাম। দারুণ মানানসই ছিলো সেই খোলামনের দোলা দেওয়া জুটি।

তাহলে এর মধ্যে কমলা সুন্দরী’ ঢুকলো কি করে ? এই প্রশ্নের জবাবে কবি সালেম সুলেরী বললেন, এই ঘটনার একটি পটভূমি রয়েছে। কমলা সুন্দরী’ আসলে নাটকের একটি চরিত্রের নাম। ১৯৮৬-৮৭ সালে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন ভাই-এর প্রথম দিককার নাটক ছিলো সেটি। ঐ নাটকের নির্মাণকালেই কিশোরী ‘কমলা সুন্দরী’র প্রতি দুর্বল হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

প্রশ্ন : এই কমলা সুন্দরীর নাম কি ? কোথা থেকে এলো আর কোথায় হারিয়ে গেলো ? আপনিই বা এতো কিছু জানলেন কি করে ?

সালেম সুলেরী : কমলা সুন্দরী’র নামটি বলতে চাই না, সামাজিক বা পারিবারিক সমস্যা হতে পারে। তবে ঘটনাটা খুলে বলি। এই কমলা সুন্দরী’কে আমি চিনতাম এক মেধাবী-সুন্দরী কিশোরী হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরী স্কুলে দশম শ্রেণীর চোখকাড়া ছাত্রী ছিলো। তার বাবা বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তা ছিলেন, মুদ্রণ বিভাগের প্রধান, ভালো পদ্য লিখতেন। আমাদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক। প্রবাস ফেরৎ লেখক হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন পূর্ব সম্পর্কের জের ধরে। ঐ বাংলা একাডেমীতেই একদিন কমলা সুন্দরী’ এলো আমার কাছে। বিনয়ী কন্ঠে একটি অনুরোধ রাখলো। স্কুলে বিদায় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের মানপত্র লিখে দিতে হবে। ভাষা আমার, বুননও আমার অর্থাৎ হাতের লেখাও আমারই হতে হবে। এই কাজটি আদায়ের জন্যে একাধিক দিন তাকে বাবার কর্মস্থলে অর্থাৎ বাংলা একাডেমীতে আসতে হয়েছে। আমাদের তখন সেকেন্ড হোম ঐ বাংলা একাডেমী চত্বর। হুমায়ূন ভাই আড়চোখে বিষয়টি অবলোকন করেছেন। কিশোরীর স্মার্টনেস, বাচনভঙ্গি, দেহবল্লরী- সবই পর্দা-উপযোগী। অবশেষে বন্ধুবর বাবার কাছে নাটকের পাত্রী করার প্রস্তাবনা। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে যা হয়। হুমায়ূন ভাইকে বাসায় নিয়ে ভুড়িভোজ। অত:পর নাটকের জন্যে একপ্রকার কন্যাদান।

প্রথম বিয়ের ১৩ বছর পর সৃষ্টিপুরুষ হুমায়ূন আহমেদ যেন আরেকটি প্রণয়পাখির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লেন। এমনটি হতেই পারে। ইসলাম ধর্মে একজন সমর্থবান পুরুষ চারটি স্ত্রী লালন করার
অধিকার রাখে। মাথায় তখন ওনার নানান চিন্তা। খানিকটা হযবরল পরিস্থিতি ব্যক্তিজীবনে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, বিষয়টি ততোটা ডালাপালা মেলেনি। স্বল্প প্রচারিত একটি সিনে পত্রিকায় নাম গোপন রেখে প্রণয়তথ্য বেরুলো। ফলে উভয় পরিবার থেকেই সতর্কবার্তা নিক্ষেপিত হলো। ম্যাট্রিক বা প্রবেশিকা পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করা কমলা সুন্দরী’ নিজেকে গুটিয়ে নিলো। অগত্যা পাত্র খুঁজে বাবা-মা অপরিণত বয়েসেই ঠেলো দিলো সংসার অভিযাত্রায়। শুনেছি স্বামী-সন্তান নিয়ে কমলা সুন্দরী’ ভালোই আছে। অন্যদিকে প্রেমিক হুমায়ূন ভাই দ্বিতীয় মেয়ে শিলার সংস্কৃতিসেবী বান্ধবী মেহের আফরোজ শাওনের কৃপা প্রার্থী হলেন। গুলতেকিন পর্বের অবসান ঘটালেন ২০০৩-এ।

প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদের গুলতেকিন পর্ব থেকে শাওন পর্ব- কেমন উপভোগ করলেন ?

সালেম সুলেরী : শাওন পর্ব পর্যন্ত আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ায়নি। ‘কমলা সুন্দরী’র বিষয়টিতে আহত হয়েছিলাম। কচিকন্ঠে আমাদের সে আংকেল ডাকতো। চির আদরের সেই প্রিয় মুখটি পরে যেন অচেনা হয়ে গিয়েছিলো। ঘটনাটির পরে যে ২/৩ বার দেখা মিলেছিলো, তা যেন ছিলো ভাসুর-সাক্ষাৎ। অর্থাৎ নিজেকে আড়াল করে কোনওরকমে জরুরী কথা সেরে নেওয়া।

সেই দৃশ্যপট বা বেদনার ছাপ অচিরেই মুছতে পেরেছিলাম। কারণ হুমায়ূন ভাই দারুণভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। অধিকতর প্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন গুলতেকিন ভাবীর। বই লেখা, নাটক লেখা, টিভি বা এফডিসিতে ঢোকা- এসব গুণগত কর্ম নিয়ে তিনি মেতে উঠলেন। আমারও পেশাগত ব্যস্ততা বাড়লো। ১৯৮৪ তে ওয়েজবোর্ড অনুসৃত বেতনে দৈনিক পত্রিকায় চাকরি, পরের বছর বেকার, পরের বছর আবার দৈনিকে চাকরি, আবার বেকার, এরপর চার বছরের জন্যে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে নির্বাহী সম্পাদক। সর্বাধিক সার্কুলেশন প্রাপ্ত ম্যাগাজিনে উন্নীতকরণ। এই সময়ে হুমায়ূন ভাই লেখা-পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। ১৯৮৯ সালে ওনার-আমার লেখা দিয়ে বেরুলো যৌথ বই : কাদের সিদ্দিকীর গ্রন্থ সমালোচনা ও সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার’।

আমাদের সন্দ্বীপ ভবনে স্পোর্টস বিভাগে সাংবাদিকতা করতো মাহফুজ আহমেদ। পরবর্তীকালের জনপ্রিয় অভিনেতা। লেখক-নাট্যকার হুমায়ূন আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতো সে। বাড়ির ও হাড়ির অনেক খবর ওর কাছ থেকেই পেতাম। সাংবাদিক সহকর্মী পীর হাবিবুর রহমান, বর্তমানে (সাক্ষাতকারের সময়) বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর নির্বাহী সম্পাদক, আজ পাশা খেলবো’ গানের ঋদ্ধ কন্ঠশিল্পী সেলিম চৌধুরী আর অভিনেতা-সংগঠক তুহিন সম্পৃক্ত হয়েছিলো হুমায়ূন মিশনে। নাটক-সিনেমার শ্যুটিং মানেই দেখতাম তাদের দৌড় ঝাপ। নুহাশ পল্লী’ সাজানোর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। তাদের কাছেই একদিন জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার, আজকাল হুমায়ূন ভাই-এর বইগুলোতে গুলতেকিন ভাবীর নাম দেখছি না। গ্রন্থস্বত্ব বা কপিরাইট ঘরে পরিবর্তন কেনো ? তারাই জানালেন, পারিবারিক জীবনে পরিবর্তন আসছে যে…।

বিবাহ বিচ্ছেদের দু’বছর পূর্বেই জানতে পারলাম, হুমায়ূন ভাই আরেকটা কমলা সুন্দরী’ পেয়েছেন। এই কমলা’র মা-বাবা মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার পর্যায়ে নেই। এই কমলা’ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে পারদর্শী। কিশোর-তরুণ সংগঠন কচিকন্ঠের কেন্দ্রীয় কুশীলব। কচিকন্ঠের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বাংলাদেশে বহুমাত্রিক প্রেম-প্রণয়-পরিণয়ের খ্যাতিমান রাষ্ট্রনায়ক কবি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

সূচীপত্র প্রকাশনীর কর্ণধার বন্ধু সাঈদ বারী ২০০৩ সালে জানালো ঘটনাটি। গুলতেকিন ভাবীর সঙ্গে চুকে বুকে গেছে সম্পর্ক। সেই থেকে হুমায়ূন ভাই-এর সাথেও যেন আমার সম্পর্কের টালিখাতা বন্ধ। হুমায়ূন-গুলতেকিন জুটি ছিলো- ঊর্মিমালার তরঙ্গে দোলায়িত এক প্রাণময় দম্পতি। আমি আমার সেই ভালোলাগাকে বিসর্জন দিতে চাইনি। ঘনিষ্ঠজনেরা মন্তব্য করেছিলো, হুমায়ূন ভাই-এর ঐ পর্বের সঙ্গী-সহযাত্রীরা আন্তরিক হলে, দ্বিতীয় কমলা সুন্দরীকে তাড়ানো যেতো। আমি এমন মন্তব্যে প্রীত হইনি। কারণ, এক লাঠি তো বাজে না। বিয়ের বাদ্য বাজাতে প্রবীণ হুমায়ূন আর নবীনা শাওন- দু’জনই হৃদয়-তনু দিয়ে যা কিছু নাড়ানোর, নাড়িয়েছেন। কর্মিষ্ঠ কথক হুমায়ূনের জীবনের ঘণ্টা বেজেছে দ্বিতীয় বিবাহের মাত্র ৭ বছরের মাথায়। মৃত্যু চিরন্তন, তবে অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে তাঁর অন্তহীন শবযাত্রা।

প্রশ্ন : গুলতেকিন পর্বের পরে কি তাহলে আর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ-কথাবার্তা হয়নি ?

সালেম সুলেরী : লেখক হুমায়ূন-কে ছাড়িনি, তবে ব্যক্তি হুমায়ূনের নৈকট্য থেকে আমি দূরবর্তী হয়েছি। আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করি। বোধ করি তিনিই আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। গুলতেকিন ভাবী হুমায়ূন জ্বরে জারিত ভূমি বাংলাদেশ ছেড়েছেন। ছাড়ার আগে হৃদয়ের আর্তি দিয়ে লিখেছেন একটি অসামান্য বই-‘তালাক’। তবে ভাবীকে আর দেখিনি। দুবার দেখেছি হুমায়ূন ভাইকে। একদিন ঢাকার গুলশান মার্কেটে। কিছু একটা কিনতে দোকানে ঢুকলেন। চোরা-চাহনিতে দেখলাম-মুখাবয়ব নিকষ কালোয় আচ্ছন্ন। চমকে উঠেছিলাম। এতো চেহারা বিপর্যয় কেনো ? অতিরিক্ত ধূমপায়ীর প্রতিকৃতি যেন। কাছে গিয়ে বলতে চেয়েছি, ধূমপান মানে বিষপান। কিছুই বলতে পারিনি। বরং র‍্যাকের পাশে মুখ লুকিয়েছি। দ্বিধার রশিতে বাঁধা পড়ে গেলাম। অথচ একদা কতো সখ্য। কতো প্রুফ কেটে দিয়েছি তার সদ্য কম্পোজকৃত পান্ডুলিপির। বানান ঠিক করে দিতে হয়েছে রসায়ন শাস্ত্রের এই লেখক-শিক্ষকের। তৈরি করে দিয়েছি সাক্ষাৎকারের উত্তরমালা।

শেষবার দেখেছি নিউইয়র্কে, মুক্তধারার বইমেলায়। ২০০৭-০৮ সালে। এক ঝলক, চিকন চেহারায় ছড়ালেন বিষাদ। কেঁপে উঠলাম যেন। হাফ স্লিভ গেঞ্জিতে হয়তো তিনি বয়েস কমিয়েছেন। নতুন কমলা সুন্দরীর সঙ্গে ম্যাচ করে তারুণ্য এনেছেন দেহে, পোশাকে। বিষয়টি আমাকে মোহবিষ্ট করলো না। মুক্তিযোদ্ধা কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট ড. প্রদীপ রঞ্জন করের সঙ্গে কথা বলছিলাম। কিন্তু চোখ গেলো দূরে হুমায়ূন ভাইয়ের আদল অভিমুখে। আমি আতংকিত হলাম। অদ্ভূত এক ক্ষয়রেখা যেন সমগ্র শরীরে ভর করেছে । কানাডা, টরন্টো থেকে আসা লেখক-সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, জসিম মল্লিক অথবা প্রবাসের জনপ্রিয় কাগজ ঠিকানা’র খ্যাতিমান প্রেসিডেন্ট সাঈদ-উর-রব কন্ঠে ঢাল ছিলেন নানান প্রশ্ন। কিন্তু জ্যাকসন হাইটসের ‘পিএস ৬৯’ স্কুলের সবুজে মৃদু তৎপর প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে আমার ভেতরে নানা প্রশ্নের ঢেউ।

আমার মনে হচ্ছিলো- মানুষটির ভেতরে আয়ুখেকো রোগ ঢুকেছে। শরীরে ক্ষয়ের মাত্রা অধিক বেড়ে গেছে। রোগের প্রাদুর্ভাব চোখে-মুখে-ভুরুতে-কেশ-বিন্যাসে। পিএস ৬৯ স্কুলের সবুজ ঘাস যেন বলছে, হালের হুমায়ূন ৬৯ পর্যন্ত যেতে পারবে না।

আমি পারিনি। না সাক্ষাৎ, না কুশল, না হ্যালো। বিবেকের দরোজা আমাকে আটকে দিলো। ২০১১-এর সেপ্টেম্বরে আবার আকস্মিক সাক্ষাতের পটভূমি। নিউইয়র্কের কুইন্সের সাটফিনে আদালতের ঠিক পেছনে ১৪৮ নম্বর স্ট্রিটে। একেবারে কর্ণারে, থ্রি ফ্যামিলি হাউজ- বিক্রি হবে। আবাসন এজেন্ট ও হালে প্রকাশিত জাগরণ পত্রিকার কর্ণধার মুক্তিযোদ্ধা শরাফ সরকার নিয়ে গেলেন বাড়ি দেখাতে। সঙ্গে আরও দুজন এজেন্ট ও আমার বাণিজ্য সহযোগী গোলাম সারওয়ার চৌধুরী। বেজমেন্ট ও বহিরাবরণ দেখে পছন্দ হলো। একতলা-দু’তলা দেখতে গিয়ে জানা গেলো- চিকিৎসাধীন হুমায়ুন এ বাড়িতেই থাকেন। মনের বন্ধ ছাতা যেন হাট করে খুলে গেলো।
ভাবলাম কোলন ক্যান্সারের রোগী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনুস, অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিতসহ অনেক জ্ঞানী-গুণী সাক্ষাৎ করে গেছেন। আমিতো নগন্য একজন , একদা যৌথ বই-এর লেখক, সাক্ষাৎ করেই যাই।

দুতলায় ঢুকেই হতাশ হলাম। বাসায় একটি হাবাগোবা স্বভাবের কাজের মেয়ে। বললেন, ম্যাডাম আর মাযহার সাহেবে শপিং করতে গেছে। আর সাহেব? জানালো- ভিতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে ঘুমাইতেছেন। উঠতে দেরি হবে। দরোজার লকে হাত লাগিয়ে দেখলাম, ঘোষণা সত্য। একটি বাচ্চা আরেক রুমে ঘুমাচ্ছে, একটি খেলছে। এদেরই নাম নিষাদ, নিনিদ। দ্বিতীয় পক্ষের উত্তরাধিকার। প্রথম পক্ষের নোভা-শীলা-নুহাশদের কথাও কেনো জানি মনে পড়লো।

ম্যাডাম শাওন চিকিৎসা সহযোগী তথা অন্যপ্রকাশ-এর কর্ণধার মাযহারকে নিয়ে ঠিক কতোক্ষণে ফিরবেন- গৃহ পরিচারিকার তা জানা নেই। অতএব, আমাদের পাঁচজনের কুশল- প্রত্যাশী দলটি পাততাড়ি গুটিয়ে প্রত্যাবর্তনের যানবাহনে নিলো। আমরা উঠে বসলাম। সেবার বাংলাদেশ থেকে মাত্র ছয় দিনের জরুরী কাজে ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, আবার ফিরে এসে হুমায়ূন-দর্শনে মনোযোগ দেবো। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তা আমার বাঁকফেরা আবেদন মঞ্জুর করেননি।

প্রশ্ন: সবশেষে মৃত্যুপরবর্তী হুমায়ূন আহমেদ ও পরিবারবর্গ নিয়ে কিছু বলুন।

সালেম সুলেরী : সবাইকে কাঁদিয়ে ৬৪ বছর বয়েসে বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন আহমেদ উর্ধ্বাকাশে চলে গেছেন। দেহটি রাখা হয়েছিলো ‘নুহাশ পল্লীর সমাধিতে। পরিবার, পরিজন, নিকটাত্মীয়, শুভার্থীরা একযোগে দোয়া করছেন। জীবনাবসানের বর্ষপূর্তিতে স্ত্রী শাওন নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন সমাধি গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নিজের শিক্ষাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অসমাপ্ত কাজ বা হুমায়ূন ভাই-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। অন্যদিকে এই স্মৃতিময় দিনে ভক্ত-পাঠকেরা প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের কথামালা শুনতে একান্ত আগ্রহী ছিলেন। ফেসবুকে নানারকম পোস্ট আর বহুমাত্রিক আলোকচিত্র লক্ষ্য করলাম।

সচেতন মহলে এখনও যেন দুই পর্বে দ্বি-খন্ডিত। রেখে যাওয়া সম্পদ আর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের কপিরাইট বা সম্মানী নিয়েও বিতর্ক আছে। এসবের দ্রুত সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা করি। যদিও অনেকের অভিমত, কর্তাবিহীন পরিবারটি এখন নন্দিত নরকে’। অথবা শঙ্খনীল কারাগারে অন্তরীণ। – সূত্র: সাপ্তাহিক বাঙালীতে প্রকাশিত সাক্ষাতকার।

সানবিডি/ঢাকা/এসএস