ঢাকা, , মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারী ২০১৯

সফল হওয়ার গল্প শুনালেন মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক || প্রকাশ: ২০১৮-০৭-৩১ ০৯:২৫:৩৩ || আপডেট: ২০১৮-০৭-৩১ ০৯:২৫:৩৩

ব্যবসায় সফল হতে হলে পরিশ্রম আর ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। সম্ভাবনা বুঝতে হবে। সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। বাধা-বিপত্তি আসবে, থেমে গেলে চলবে না। ব্যবসা হচ্ছে রেললাইনের মতো। ঠিকমতো চলতে শুরু করলে আর আটকে থাকতে হয় না।

কথাগুলো বলছিলেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল। যিনি শূন্যহাতে ব্যবসা শুরু করে আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার। সোমবার রাজধানীর সোবহানবাগে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত একক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে তিনি উদ্যোক্তা হয়ে গল্প শোনান। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি তাদের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে ২০১৬ সাল থেকে দেশের সফল উদ্যোক্তাদের নিয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া লেকচার’ সিরিজের আয়োজন করে আসছে। সোমবার ছিল ১৩তম পর্ব।

মোস্তফা কামাল বলেন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের একেবারে প্রত্যন্ত পল্লীতে তার জন্ম। যেখানে যাতায়াতের জন্য কোনো সড়ক ছিল না। গ্রামের পাঠশালায় মৌলভীদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১২ কিলোমিটার দূরের জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন। এরপর একই দূরত্বে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়ে মেট্রিক পাস করেন। বাড়ি থেকে সবচেয়ে কাছের কলেজটি ছিল ১৪ কিলোমিটার দূরে। ভর্তি হলেও লেখাপড়া সেখানে করা হয়নি। দূরের কলেজে যেতে বাবার কাছে একটি সাইকেল চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা সাইকেল কিনে দিতে পারেননি। এতেই রাগ করে ঢাকায় চলে আসেন। ওঠেন গুলিস্তানে এক আত্মীয়ের কাছে। কিন্তু লেখাপড়া আর নিজে কিছু করার তাগিদে সেখানে বেশিদিন থাকেননি। যাত্রাবাড়ীতে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে লজিংয়ের ব্যবস্থা করেন। খুঁজতে থাকেন চাকরি। গুলিস্তানেই একটি দোকানে সামান্য বেতনে চাকরি মিলে যায়। কিন্তু ভেতরে তাগিদ ছিল একটা ব্যবসা করার। এ তাগিদ আরও আগে থেকেই তিনি অনুভব করতেন। গ্রামের বাড়িতে থাকতে হাটের দিন চাচার সুপারি দোকানে বসতেন তিনি। হাটে বেচাকেনা শেষ হলে চাচা তাকে ছোলা বুট খেতে কিছু পয়সা দিতেন। সেই থেকে তিনি বুঝতেন দোকান থাকলে টাকা হয়।

মোস্তফা কামাল জানান, ‘কোনো স্বপ্ন বা পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এগোতে পারেননি। পারিবারিক অবস্থা ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো। মৌলভীবাজারে চাকরি করতে করতে অল্প টাকা জমিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তখন দেশে ব্যবসার বিশেষ পরিবেশ ছিল না। ব্যবসা ছিল পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরে। এরপর দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। নুন, কেরোসিনের মতো সামান্য জিনিসও পাওয়া যায় না। এ রকম প্রতিকূল পরিবেশে ব্যবসা করতে হয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। ব্যাংক আছে। অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। বাজার বড় হয়েছে। আইন-কানুন সহজ হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি জানার জগৎকে বড় করে দিয়েছে। ফলে এখন উদ্যোগ নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। তবে সবকিছু এগিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিযোগিতাও বড় হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে কামলা মনে করি। আমার জীবন ছিল সংগ্রামের ও যন্ত্রণাময়। জ্ঞান, পাণ্ডিত্য আমার নেই। দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেছি। কাজের ব্যস্ততায় বিয়েও করেছি দেরিতে। নিজে একটা দোকান করে সেখানে ছোট ভাইকে বসিয়েছি, নিজে হেঁটে হেঁটে সাপ্লাইয়ের কাজ করেছি। এভাবে কাজ করতে করতে ১৯৯০ সালে প্রথম কারখানা স্থাপন করি। মেঘনা ঘাটে কারখানা হওয়ায় নামও হয় মেঘনা গ্রুপ।’

ব্যবসায় ব্যাংক থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন জানিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, প্রথমে কেউ ঋণ দেয় না। তাকে প্রথম ঋণ দিয়েছিল সাবিনকো। এরপর তৎকালীন রূপালী ব্যাংক। ব্যবসায় লোকসান হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের টাকা সময়মতো পরিশোধ করেছেন তিনি। সবসময় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেক লোকই কাকা, বড় ভাই বা আত্মীয়দের পুরনো বই পড়ে লেখাপড়া শিখেছে। এখন সময় বদলেছে। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার হয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েরা চাইলে হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে ঢুকতে পারছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের যে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এখন সম্ভাবনা অনেক বেশি।

অনুষ্ঠানে মোস্তফা কামালের স্ত্রী, মেয়ে, জামাই, নাতিসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সবুন খান, উপাচার্য অধ্যাপক ইউসুফ এম ইসলাম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক এস এম মাহবুব উল হক মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।