ঢাকা, , মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮

৬৪টি প্রকল্পে এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ!

নিজস্ব প্রতিবেদক || প্রকাশ: ২০১৮-০৮-০৮ ০৯:১৮:৩৮ || আপডেট: ২০১৮-০৮-০৮ ০৯:২৬:০৮

চাঁদপুরের মতলবে ধনাগোদা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ বাকি থাকায় তা সম্ভব হয়নি। মজার ব্যাপার হলো, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটির জন্য মাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে! এতে প্রকল্পটি শেষ হওয়া অনিশ্চিত।

২০১৪ সালেই জামালপুর-মাদারগঞ্জ সড়ক প্রশস্ত করার জন্য তিন বছর মেয়াদি ৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ হয়নি। এই প্রকল্পও বাঁচিয়ে রাখতে চলতি বছরের এডিপিতে মাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

একই বছরে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর উন্নয়নে ৭০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন মেয়াদ বাড়াতে হবে। তাই এডিপিতে নামমাত্র বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এক লাখ টাকা।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এডিপিতে এ ধরনের ৬৪টি প্রকল্প আছে। এসব প্রকল্প বাঁচিয়ে রাখতে মাত্র এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকার এডিপিতে এসব প্রকল্পে সর্বসাকল্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির আধা শতাংশের কম।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এটি অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার চিত্র এটি। যখন অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। ফলে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই বছর আগে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ৩৬টি প্রকল্পে যে হারে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তাতে ওই সব প্রকল্প শেষ হতে ১০০ বছর লাগবে।

মূলত জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও মামলার কারণে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা যায় না। ফলে বছরের পর বছর প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায় স্থবির হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিবছরই এই ধরনের প্রকল্প চলমান রাখতে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। আবার বরাদ্দও দিতে হয়। সে জন্যই এমন প্রকল্পে ন্যূনতম এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

আবার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ বাকি থেকে যায়। কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধি কিংবা বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোকে অপেক্ষা করতে হয়। সে জন্যও অবশ্য অনেক প্রকল্পে নামমাত্র বরাদ্দ দেওয়া হয়। উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিনকী আস্তানা-চট্টগ্রাম সেকশনে ১১টি স্টেশনে বিদ্যমান সিগন্যালিং ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখনো প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়নি। তাই আগামী অর্থবছরের এডিপিতে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এমনও দেখা গেছে, প্রকল্প পাস করা হয়ে গেছে। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এমন প্রকল্পে টোকেন বরাদ্দ দিয়ে তা বাঁচিয়ে রাখা হয়। বিদেশি সহায়তাপুষ্ট অনেক প্রকল্পে দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে অর্থ ছাড় আটকে যায়। সেসব প্রকল্প চলমান রাখতে দেশজ উৎসের বরাদ্দ থেকে নামমাত্র বরাদ্দ দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৪টি প্রকল্পে ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯টি প্রকল্প হলো ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে। এই খাতে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো হলো ১ হাজার ২০২ কোটি টাকার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন; ৯৬৯ কোটি টাকার চট্টগ্রামের মুরাদপুর ২ নম্বর গেট ও জিইসি ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প; জামালপুর ও মাদারগঞ্জ পৌরসভার উন্নয়ন; চৌমুহনী পৌরসভার বন্যা-পরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়ন।

লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া রাস্তাঘাট নির্মাণের প্রকল্প আছে ১০টি। এই তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ; ঢাকার সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন; জামালপুর-মাদারগঞ্জ সড়ক প্রশস্ত করা; পাঁচুরিয়া-ফরিদপুর-ভাঙ্গা রেলপথ পুনর্বাসন ও নির্মাণ।

সব মিলিয়ে চলতি এডিপিতে ১ হাজার ৪৫২টি প্রকল্প আছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ২২৭টি, কারিগরি ১১৭টি, জাপান ঋণ মওকুফ তহবিলের (জেডিসিএফ) ২টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ১০৫টি প্রকল্প আছে। চলতি অর্থবছরে ৪৪৬টি প্রকল্প শেষ করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আর্কাইভ