ঢাকা, , শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

জরিমানার ৩০% অর্থ ট্রাফিক সদস্যদের জন্য চায় ডিএমপি

নিজস্ব প্রতিবেদক || প্রকাশ: ২০১৮-০৮-১০ ১০:১১:০০ || আপডেট: ২০১৮-০৮-১০ ১০:১১:০০

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ট্রাফিক বিভাগে কর্মরতদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ঢাকার রাস্তায় তীব্র দূষণের মধ্যে কষ্টকর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায়ই নানা ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। বিষয়টি মাথায় রেখে ট্রাফিক প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদায় হওয়া জরিমানার ৩০ শতাংশ এ বিভাগে কর্মরত সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দের সুপারিশ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব বরাবর একটি চিঠিও পাঠিয়েছে ডিএমপি।

রাজধানীর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন ট্রাফিক সদস্যরা। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি ও আইন ভঙ্গকারী চালকদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছেন তারা। এসব মামলা থেকে প্রাপ্ত অর্থ যাচ্ছে সরকারি কোষাগারে। অন্যদিকে তীব্র দূষণের মধ্যে কষ্টকর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ডিএমপির পক্ষ থেকে জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠানো হয়েছে চিঠিটি।

ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বিশ্বের ব্যস্ততম শহরগুলোর অন্যতম রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ মহানগরীতে আয়তনের তুলনায় রাস্তাঘাট অপ্রতুল। ফলে যানজট এখানকার একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণাধীন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলো থেকে নিঃসৃত ধুলাবালি এবং যানবাহন ও কল-কারখানা সৃষ্ট বায়ু ও শব্দদূষণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া একজন ট্রাফিক পুলিশকে ঝড়, বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও তার দায়িত্ব পালন করে যেতে হচ্ছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ঢাকায় প্রতিনিয়ত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ট্রাফিক সদস্যদের প্রত্যেক পালায় (শিফটে) নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার ডিউটি শেষেও অতিরিক্ত ডিউটি করতে হচ্ছে। আগে ট্রাফিক সদস্যদের দুই পালায় ডিউটি করতে হলেও বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের তিন পালায় ডিউটি করতে হচ্ছে। দিন-রাত তীব্র শব্দ ও সার্বক্ষণিক মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করার কারণে এ বিভাগের সদস্যদের অনেকেই মানসিক বৈকল্য, বধিরতা, ক্যান্সার, যক্ষ্মা, অপুষ্টিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বিভাগের সদস্যদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা বাবদ ব্যয় পরিশোধ করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর ইন্টেলিজেন্স কোঅর্ডিনেশনের (এনসিআইসি) সভায় ট্রাফিক পুলিশদের এসব সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সে সময় ট্রাফিক প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদায় হওয়া মোট জরিমানার একটি অংশ প্রতি মাসে বিভাগীয় সদস্যদের বরাদ্দ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। চিঠিতেও বিষয়টি উল্লেখ করে জরিমানার ৩০ শতাংশ অর্থ এ বিভাগে কর্মরত সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দ দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

চিঠির বিষয়ে জানতে চেয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি অবগত নন বলে জানান। তবে জরিমানা থেকে আদায় হওয়া অর্থের ৩০ শতাংশ পেতে যাচ্ছেন বলে এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক সদস্যদের মধ্যে খবর পৌঁছে গেছে।

জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠানো ডিএমপি কমিশনারের চিঠির বিষয়বস্তুর প্রতিফলন দেখা যাবে ঢাকার যেকোনো সড়কেই। বিশেষ করে রাজধানীর রাস্তায় কর্মরত ট্রাফিক সদস্যদের প্রায়ই কানের সমস্যায় ভুগতে দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় যেকোনো রাস্তায় শব্দের তীব্রতা ৬০-৮০ ডেসিবল। অথচ শব্দের স্বাভাবিক মাত্রা ৩৫-৪৫ ডেসিবল। এ মাত্রা যখন ছাড়িয়ে যায়, তখন শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণেই বেশির ভাগ ট্রাফিক সদস্য ভুগতে থাকেন কানের সমস্যায়।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সমন্বয়কারী ডা. এমদাদুল হক বণিক বার্তাকে জানান, ট্রমা, চর্মরোগ, কিডনিজনিত রোগ, শ্বাসকষ্ট, নাক-কান ও গলার সমস্যায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ট্রাফিক বিভাগে কর্মরতদের সংখ্যাই বেশি। সারা দিন কালো ধোঁয়ার মধ্যে ডিউটি করার কারণে তারা এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

তিনি আরো বলেন, ঢাকার বাতাসে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বস্তুকণা, সিসা, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, কার্বন মনোক্সাইডসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দদূষণ। ফলে ট্রাফিক পুলিশরা অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ক্যান্সার, শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া, মাথাব্যথা, চোখে প্রদাহ, হার্টের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরে সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা পুলিশ সদস্যের মধ্যে ৫১ হাজার ১৮৮ জন এসেছেন ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে। ২৮ হাজার ৪৩৮ জন এসেছেন চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে, প্রায় সমসংখ্যক রোগী এসেছেন কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে। শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এসেছেন ২২ হাজার ৭৫০ জন। এছাড়া নাক-কান ও গলার সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১৪ হাজার ২১৮ জন পুলিশ সদস্য।