ঢাকা, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

‘মিথ্যা না বললে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক || প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৩ ২০:৪৮:১৩ || আপডেট: ২০১৮-১০-০৩ ২০:৪৯:১৩

মিথ্যা না বললে, ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত না করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘যারা মিথ্যা তথ্য দেবে না, ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে না, আমার মনে হয় তাদের (এই আইন নিয়ে) উদ্বেগের কিছু নেই। যারা মিথ্যা প্রকাশ করেছে, তাদের জন্যই এটা উদ্বেগের বিষয়।’

বুধবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ৭৩তম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানসহ যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, বিবিসি একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মিথ্য সংবাদ প্রকাশ করেছিল। প্রমাণ হওয়ার পর সবাইকে রিজাইন করতে হয়েছে। কিন্তু যার বিরুদ্ধে ওই সংবাদ প্রকাশ করা হলো, তিনি তো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই গেলেন। কিন্তু যে প্রকাশ করল, তার তো কিছু হলো না। তার যে সম্মানটা গেল, ক্ষতি হলো, তার ক্ষতিপূরণ হবে কিভাবে? পদ্মা সেতু নিয়ে অনেকের অনেক কথা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। কিন্তু আমাদের যে ক্ষতিটা হলো, তার কী হবে?

তিনি বলেন, ‘কোনো একজন সংসদ সদস্য হলেন। যদি এলাকায় তার অসম্মান হয়, সেটার কী হবে? সাংবাদিকরা উদ্বিগ্ন বুঝলাম, কিন্তু আমাদের উদ্বেগটা কে দেখবে?’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কারও যদি অপরাধী মন না থাকে, ভবিষ্যতে অপরাধের পরিকল্পনা না থাকে, তার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই। আগে তো সমন জারি করা হতো না, সরাসরি গ্রেফতার করা হতো। তবে মিটিং-টিটিংয়ে যেসব মানুষদের দেখলাম, তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ারই কথা। তারা তো ফাইল নিয়ে রেডি হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে লিখবে— সরকার এই করেনি, ওই করেনি। আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই। অন্তত আমি থাকতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই।

সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নোংরামি ঠেকাতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার লিটন দাসের এক ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য বিষয়ে একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, এই ধরনের নোংরামি যেন না হয়, সেই জন্যই সাইবার সিকিউরিটি আইন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন নোংরামি গোটা বিশ্বের জন্যই বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের সাংবাদিকরা এসব ঘটনা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, লিটন দাস এত ভালো খেলেছে, তাকে কেন এমন বলা হলো আমি জানি না। আমি ব্যস্ত থাকায় এগুলো দেখতে পারিনি। আমার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টও নেই। যাদের আছে, তারা দেখালে দেখতে পাই। তবে যারা এই ধরনের কাজ করে, তারা বিকৃতমনা। এদের কোনো নীতি-টিতি নেই।

বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারিতে চাকরিতে কোটা সম্পূর্ণ বাতিল করার প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, কোটা বিষয়টা আমাদের নজরে আগে থেকেই ছিল। প্রতিবছরই বিষয়টি আমি মনিটরিং করছিলাম। কোনো সরকারি চাকরিতে যদি কোটা পূরণ না হয়, তাহলে মেধাতালিকা থেকে সেই পদ পূরণ করার জন্য আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি বলে, আমি কোটা চাই না। মেয়েরা বলছে, তারা প্রতিযোগিতা করে আসবে। তাহলে তো আর কোনো অসুবিধা নাই। কোটা না থাকলে আর সংস্কার নিয়েও আন্দোলন হবে না। তাই কোটাই বাতিল করে দিলাম।

তিনি বলেন, কিন্তু কোটা বাতিল করেও আরেক মুশকিল। এবার বলে, আমরা বাতিল চাই না, সংস্কার চাই। একবার বলে বাতিল, একবার বলে সংস্কার। এখন কারও যদি কোটা দরকার হয়, সেটা বলুক আমাদের এই কোটা চাই। আন্দোলন ছাড়া আর কোটা দেবো না।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ তাদের নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশে তো অনেক রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে কোন দল আসবে, আর কোন দল আসবে না, সেটা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত তো আমরা নিতে পারি না। তবে আমাদের আশা, সব দলই নির্বাচনে আসবে।’

গত কিছুদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট গঠনের চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা জোট হচ্ছে, আমি খুব খুশি। তাদের জোট করার জন্য যা যা সহযোগিতা লাগে, আমি তাও করতে রাজি। কারণ আমি জানি, বাংলাদেশে ভোট আছে দুইটা— একটা হলো আওয়ামী লীগ, আরেকটা অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। অ্যান্টি আওয়ামী লীগ ভোটটা তো একটা জায়গায় যেতে হবে। একটা জায়গা তো লাগবে তাদের জন্য। এখন একটা বড় জোট হচ্ছে এবং সেখানে কিন্তু বড় বড় মানুষই আছে। জোট হওয়া তো ভালো কথা। আমার কথা হচ্ছে, শত ফুল ফুটতে দেন। এটা নির্বাচনের জন্য ভালো।

তিনি আরও বলেন, আর শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনে আসবে কি না, বা করবে কি না, বা করতে পারবেন কি না, বা সেই সাহস তাদের আছে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। কিন্তু জোট যখন হচ্ছে, আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি। প্রক্রিয়াটা চলতে থাক।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জোটের আকার বাড়বে কি না— এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, জোটের কলেবর বৃদ্ধি মানে কী? আমাদের জোট তো যা আছেই আছে। আমরা সেভাবেই চলছি। আর কেউ যদি আমাদের সঙ্গে আসে, আসবে। সেটা দেখব। আমাদের এত বেশি, এত বড় কলেবরের দরকার নেই।

সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক বলেন, বিরোধী দলীয় একজন নেতা বলেছেন যে আওয়ামী লীগকে পরাস্ত করতে তারা প্রয়োজনে শয়তানের সঙ্গেও ঐক্য করবে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত যেন আওয়ামী লীগকে সমর্থন না দেয়, সে কথা তিনি ভারতকে বলেছেন।

এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল থাকবেই। কিন্তু যারা শয়তানের সহযোগিতা চায় তারা নিজেরা কী, তা তো আপনারা নিজেরাই জানেন। যারা শয়তানের সঙ্গে হাত মেলাবে, তাদের সমর্থন দিতে দেশবাসী প্রস্তুত কি না, সেটাও দেখতে হবে। নিশ্চয়ই এই দেশর মানুষ শয়তান চায় না। এটা হলো বাস্তব কথা। আমি এটা নিয়ে কোনো কমেন্ট করতে চাই না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রথম একজন সংখ্যালঘু থেকে তাকে আমরা প্রধান বিচারপতি বানিয়েছিলাম। তিনি সেই পদটিকে সেভাবে সম্মানজনকভাবে ধরে রাখতে পারেননি। এখানে কিন্তু আমাদের কিছু করার ছিল না। এখন যে কথাগুলো উনি বলছেন, এখানে আমার কমেন্ট করার কিছু নেই। আর বই যেটা লিখেছেন, বই পড়েন আপনারা? আমার কোনো আপত্তি নাই, পড়ে দেখেন কী লিখেছে।

জনগণ না চাইলে ক্ষমতায় থাকবেন না— এমন প্রত্যয় জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে রাজনীতি করি না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে উনি (এস কে সিনহা) অনুরোধ করেছেন আমাকে সমর্থন না দিতে। এই রকম তিনি কেন, সবাই করেছে। এই যে বিএনপি যাচ্ছে (ভারতে), সবাই যাচ্ছে (ভারতে), গিয়ে অনুরোধ করে আসছে। এখন কে সমর্থন করবে, আর কে সমর্থন করবে না বা বাইরের দিকে মুখাপেক্ষী হয়ে আমার রাজনীতি না। আমি মনে করি, আমার জোর হচ্ছে আমার দেশের জনগণ। আমার জনগণের সমর্থন আছে কি না, জনগণ আমাকে চায় কি না, জনগণ আমাকে ভোট দেবে কি না, সেটাই বিবেচ্য বিষয় আমার কাছে।

তিনি বলেন, আমার ওরকম কারও সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে হবে কি হবে না— সে প্রশ্ন যদি করেন আমি বলব, আমার ক্ষমতায় না থাকাই ভালো। দেশের মানুষের শক্তিটা হচ্ছে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তি যদি না থাকে, আর দেশের মানুষ যদি না চায়, কে আমাকে ক্ষমতায় এনে বসাবে? ওই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজনীতি আমি করি না।

জাতিসংঘের ৭৩তম অধিবেশনে ভাষণ দেওয়াসহ সফরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাতে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বিশ্বনেতারা বলেছেন, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকেই তারা দেখবেন বলে আশাবাদী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যার যার সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা সবাই আমাকে উইশ করেছে, আমি যেন আবার ফিরে আসি। তবে জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই। আগামীতে যেন আবার দেখা হয় (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে), এই কথা সবাই বলেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘে গিয়েছি। যতজন হেড অব স্টেট, হেড অব দ্য গর্ভনমেন্ট, যাদের সঙ্গেই দেখা হয়েছে বা যত প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গেই কথা হয়েছে, তারা প্রতেক্যেই আমাকে একটি মেসেজই দিয়েছেন— আপনারা আবার আপনাকে দেখতে চাই। আবার আপনি ক্ষমতায় আসুন, সেটাই চাই। তখন আমি তাদের বলে আসিনি যে আপনারা একটু আসেন, আমাকে ক্ষমতায় বসে দিয়ে যান। আমি কিন্তু সেটা বলিনি। আমি তাদের জবাব একটাই দিয়েছি, দেখেন, দেশের মানুষ যদি ভোট দেয়, আমি আছি; না দিলে নেই। হয়তো এটাই আপনাদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। কারণ এখন তো বয়স হয়ে গেছে।

আর্কাইভ