ঢাকা,শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯

ঢাকায় প্রায় শতভাগ বহুতল ভবনের বীমা নেই

:: গিয়াস উদ্দিন || প্রকাশ: ২০১৯-০৪-০৭ ২১:১৬:২৮ || আপডেট: ২০১৯-০৪-০৮ ২০:২৫:২৮

ঢাকায় বড় ভবনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এসব ভবনের বীমা করা হয় না। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের (বিআইএ) হিসাবে বর্তমানে বীমাহীন ভবনের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এরমধ্যে বাংলাদেশ ভবনসহ স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ভবন মালিক বা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। মজার বিষয় হচ্ছে, বীমা কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বহুতল ভবনের ক্ষেত্রেও দুই একটি ছাড়া বাকীগুলোর বীমা করা নেই।

বিশেষ করে ভবনের তৈরির জন্য ব্যাংক ঋণ নেয়া হয়নি, এমন একটি ভবনেরও বীমা নেই। অর্থাৎ পুরোখাতই বিশৃংখল হয়ে পড়েছে। ফলে অগ্নিকা-, ভুমিকম্পসহ অন্য কোনো দুঘর্টন ঘটলে এর ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে না। সাম্প্রতিক সময়ে বনানীতে এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের পর বীমার বিষয়টি সামনে চলে আসে।

বীমা কোম্পানিগুলো বলছে সামগ্রিকভাবে এখাতের নিরাপত্তায় বহুতল ভবনের জন্য আইনে বীমা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে একদিকে বীমা কোম্পানিগুলো আইন কানুনসহ সবকিছু যাচাই করবে। অপরদিকে অবৈধ ভবন নির্মাণের বিষয়টি বন্ধ হবে। সামগ্রিকভাবে পুরোখাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে এখাতের নিয়ন্ত্রকসংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটির সংস্থা (আইডিআরএ) বলছে বীমা বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকারের আপাতত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্বাহী আদেশ লাগবে। দীর্ঘ মেয়াদে এজন্য আইনসংশোধনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

জানতে চাইলে আইডিআরের সদস্য গকুল চাঁদ দাস সানবিডিকে বলেন, বর্তমান আইনে বীমা করার বিধান রয়েছে। তবে তা বাধ্যবাদকতা নয়। তারমতে, বিল্ডিংয়ের জন্য অগ্নি ও ভুমিকম্প এই ঝুঁকির জন্য বীমা করা যায়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আইডিআর তার অফিসের জন্য বীমার প্রিমিয়াম বাবদ প্রতিমাসে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করছে। সাধারণ বীমার কাছে এই টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে তিনি বলেন, সমস্ত বিল্ডিংগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করতে হলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত জরুরি।

জানা গেছে- রাজধানীতে ভবন নির্মানের জন্য বর্তমানে রাজধানী উন্নয়ন কর্পোরেশন (রাজউক) অনুমোদন লাগে। আর বহুতল ভবনের নির্মাণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন লাগে। তবে বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে এই দুই সংস্থার দুই রকম সংজ্ঞা রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের আইন অনুযায়ী ছয়তলার ওপর যেকোনো ভবনই বহুতল। আর রাজউকের আইন অনুযায়ী, ১০ তলা থেকে বহুতল ভবন। দুই আইনের এমন সাংঘর্ষিক অবস্থার কারণে ১০ তলার নিচের বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র চায় না রাজউক। ফলে এই ভবনগুলো অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই গড়ে উঠছে। দুই আইনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থার অবসান দরকার বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

অন্যদিকে ভবনের নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে বীমা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভবন করলে তার জন্য বীমা বাধ্যতামূলক। না হলে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে যে সব প্রতিষ্ঠান ঋণ নেয়, ওই প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ হয়ে গেলে বীমার প্রিমিয়াম জমা দেয়া না। ফলে ভবনের বীমার বিষয়টি শুধু নামেই টিকে আছে। ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের হিসাবে হাতে গোনা কয়েকটি ভবনের বীমা থাকতে পারে। তাদের মতে, প্রায় শতভাগ ভবনেই বীমা নেই।

রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে করা এক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী সাততলা বা তার চেয়ে উঁচু ভবন আছে ১৬ হাজার ৯৩০টি। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার ২৪টি ভবন ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। অর্থাৎ ১১ হাজার ৯০৬টি ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা বাধ্যতামূলক থাকলে এই অনিয়ম কমে আসতো।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, প্রায় সব ভবনই বীমা শুন্য। অর্থাৎ হাতে গোনা কয়েকটি ভবনের বীমা থাকতে পারে, তাও সন্দেহ। তিনি বলেন, ঋণ নেয়ার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান বীমা করে। এরপর ভবন নির্মাণ শেষ হলে আর প্রিমিয়াম দেয় না।

শেখ কবির হোসেন বলেন, এসব ভবনগুলো বীমার আওতায় আনা গেলে দুর্ঘটনা কমতো। কারণ বীমা কোম্পানি পলিসি নেয়ার আগে সমস্ত বৈধ কাগজপত্র দেখে। এক্ষেত্রে ভবনের প্ল্যান, রাজউকের অনুমোদনপত্র, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, পানি দেয়ার জন্য আভ্যন্তরীণ সিস্টেম এবং বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়েছে কিনা তার সবকিছু দেখে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে বীমা করলে কাগজপত্রে কোনো দুই নম্বরি হওয়ার সুযোগ থাকে না।

তিনি বলেন, প্রতিটি বহুতল ভবনের জন্য বীমা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তারমতে, এটির জন্য সরকারের একটি নির্বাহী আদেশ যথেষ্ট। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স নেয়ার সময় বীমা আছে কিনা সে বিষয়টি চেক করা যেতে পারে।

জানা গেছে- দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থাপনা বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের বীমা নেই। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন নির্মাণ শেষ হয়। ভবনটি শহরের আকাশচুম্বী ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম। রাজধানীর মতিঝিলের কেন্দ্রে ৩১তলা এ ভবনটির উচ্চতা ১০১ মিটার বা ৩৩১ ফুট। ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, ভবনটির বীমা করার জন্য ২০০৫ সালে তাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ভবনটির কোনো বীমা করা হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, সাধারণত যে সব প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে করা হয়, ওই প্রতিষ্ঠানের ভবনের বীমাথাকে। কিন্তু ঋণ ছাড়া বীমা করা হয়েছে, তেমন কোনো রেকর্ড নেই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বীমা করা হয়েছে কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই। এই বিষয়টি যিনি দেখাশুনা করেন, বর্তমানে তিনিও দেশের বাইরে। ফলে বিষয়টি জেনে জানাতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোরও সমস্যা রয়েছে। কারণ বীমা করার পর ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর রেকর্ড ভাল নয়। ফলে এখাতের পুরো দেশের মানুষের এক ধরনের নেতিবাচক ধারনা রয়েছে। অর্থাৎ এক ধরনের আস্থা সংকটে বীমাখাত। আর এ সংকট কাটানো জরুরি।

তারমতে, সাধারণ মানের ১০তলা একটি ভবনের জন্য বীমা করতে মাসে ১০ লাখ টাকার মতো প্রিমিয়াম দিতে হয়। এতে বছরে আসে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে ভবনের মানুষ, অফিস, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য মূলবান সামগ্রীর জন্য প্রিমিয়ামের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।

ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের কাছে কোম্পানিগুলোর ২০১৬ সাল পর্যন্ত তথ্য রয়েছে। ওই তথ্যে দেখা গেছে ২০১৬ সালে দেশের বীমাখাতে অগ্নিবীমা বাবদ মোট প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। আর নেট প্রিমিয়াম ৭১২ কোটি টাকা। এরমধ্যেই ভবনের প্রিমিয়াম অর্ন্তভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ পুরো দেশের অর্থনীতির আকার অনুসারে এই সংখ্যা খুবই কম।