পোশাক কারখানায়গুলোয় বেতন-বোনাস নিয়ে অসন্তোষের শঙ্কা

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১৫ ১১:৪৯:০৯ || আপডেট: ২০১৯-০৫-১৫ ১১:৪৯:০৯

পবিত্র ঈদ উল-ফিতরের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা রয়েছে েএর ফলে বাড়ানো হয়েছে নজরদারী।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার স্টার গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড নামে পোশাক কারখানায় কাজ করছেন ৬৫০-এর মতো শ্রমিক। বেতন বকেয়া থাকায় সম্প্রতি এ শ্রমিকরা কারখানার মালিককে আটকে রাখেন। পরে সংশ্লিষ্ট মালিক সংগঠন ও সরকারি সংস্থার মধ্যস্থতায় এর সমাধান হয়।

১২ হাজারের মতো শ্রমিক রয়েছেন গাজীপুরে ইন্ট্রাম্যাক্স গ্রুপের পোশাক কারখানায়। বেতন বকেয়া থাকায় অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে এ কারখানায়ও।

শুধু স্টার বা ইন্ট্রাম্যাক্স নয়, পোশাক খাতের অনেক কারখানাই অসন্তোষপ্রবণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অসন্তোষপ্রবণ এ ধরনের পোশাক কারখানার সংখ্যা ছয় শতাধিক, যেগুলো নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর জানিয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সারা দেশের ৬৬০টি পোশাক কারখানার তালিকা পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা ২৪টি। আর ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার সংখ্যা ২৯। এগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ৬৬০টি কারখানাকেই অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে মোট ৬৬০টি পোশাক কারখানার তালিকা দেয়া হয়েছে। তালিকাটি আমাদের জেলা পর্যায়ের কার্যালয় ও ২৯টি কমিটির মাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। ছোটখাটো সমস্যা সব কারখানায়ই আছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমরা কারখানাগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখছি।

বিভিন্ন শিল্পের শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে ১৩ মে শ্রমসংক্রান্ত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির ৪১তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় সভায়। এ অসন্তোষের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় সাতটি বিষয়কে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে উল্লেখিত কারণগুলোর মধ্যে আছে যথাসময়ে অর্থাৎ ঈদের অন্তত সাত-আটদিন আগে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস না দেয়া। পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের ঈদ বোনাসের পরিমাণ নির্দিষ্ট না থাকায় কারখানাভেদে তা ভিন্ন ভিন্ন হওয়া।

সাতটি কারণের মধ্যে আরো আছে ঈদ উপলক্ষে যথাযথ সময় ও চাহিদা মোতাবেক ছুটি না পাওয়া। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা না দিয়েই হঠাৎ ঈদের প্রাক্কালে শিল্প-কারখানা বন্ধ অথবা লে-অফ ঘোষণা করা। শ্রমিক ছাঁটাই, নির্যাতন ও হয়রানিও আছে এর মধ্যে। সর্বোপরি রমজানে শ্রমিকদের সাধ্যাতীত কার্যাদেশ প্রদান ও রমজানে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা সঠিকভাবে নির্ধারণ না করা।

শ্রম মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের সাধ্যাতীত কার্যাদেশ প্রদানের তথ্য দিলেও পোশাক কারখানা মালিকপক্ষ বলছে, কারখানায় কার্যাদেশের ঘাটতি রয়েছে। অল্পবিস্তার যে কাজ আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে রয়েছে মূল্য কমানোর চাপ। এদিকে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারখানা মালিকদের। অনেকেই কারখানা বন্ধের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। নগদ অর্থের সংকটে বাংলাদেশ ব্যাংকেও তদবির করতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের। সংখ্যায় কম হলেও ক্ষেত্রবিশেষে মালিকদের ব্যক্তিগত স্বর্ণালংকার বিক্রি করেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে।

বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা চারটি কমিটি গঠন করেছি। এছাড়া ১৫টি জোনাল বৈঠকের মাধ্যমে যে সমস্যাগুলো উঠে আসছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হচ্ছে। অসম্ভব খারাপ অবস্থা অতিক্রম করতে হচ্ছে। ২৩১টি কারখানায় কঠোর নজরদারির বিষয়টি ঠিক আছে, তবে এগুলোর সমস্যাগুলো সমঝোতায় আসতে আসতে হয়তো ১০০ হবে। এভাবে ঈদের আগে ৬০-৭০টি কারখানার শ্রমিকরাও যদি রাস্তায় নামেন, তাহলে আমরা কোথায় যাব। এখন যে সমস্যাগুলো সামনে আসছে, সেগুলোয় মধ্যস্থতার মাধ্যমে সহযোগিতা দিচ্ছি আমরা। যদিও দায়িত্বটি মূলত কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সূত্রমতে, সংগঠনের নতুন পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৭ দিনে ২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। কার্যাদেশ সংকট ও বেতন পরিশোধে নগদ অর্থের ঘাটতিতেই কারখানা সচল রাখতে পারছেন না মালিকরা। ফলে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২১টি কারখানার মধ্যে একটি মালিবাগের লুমান ড্রেস লিমিটেড। লুমানসহ মোট ২১টি কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৮৫।

বিজিএমইএর সহসভাপতি এসএম মান্নান  বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে পাওয়া তালিকা যাচাই-বাছাই করে মোট ২৩১টি কারখানাকে আমরা নজরদারিতে রেখেছি। এর মধ্যে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা রয়েছে ২৫টি। এবারের সংকট অন্যান্যবারের তুলনায় অনেক বেশি।

৬ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে শিল্প, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে পোশাক খাতে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু কিছু শিল্প মালিক সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ না করায় সংশ্লিষ্ট কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে।

চিঠিতে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে মার্চের বেতন যারা পরিশোধ করেনি, সেসব তথ্য বিবেচনায় নিয়ে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা মহানগরী, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জে মোট ২ হাজার ৩৯৪টি কারখানার মধ্যে ১১৮টির বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করা হয়নি। এর মধ্যে ৩৬টি কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করতে সক্ষম হলেও অবশিষ্ট ৮২টির বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করার সম্ভাবনা নেই বলে জানা যায়। ফলে এসব কারখানায় যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ