শ্রমিকদের বেতন-বোনাস

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১৭ ১৪:২৪:৩৭ || আপডেট: ২০১৯-০৫-১৭ ১৪:২৪:৩৭

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের আগে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে যথারীতি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের শ্রমিক অসন্তোষ গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছয় শতাধিক পোশাক কারখানাকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। ১৩ মে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের সভাপতিত্বে শ্রমসংক্রান্ত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সভায় মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে প্রাথমিক সভা হয়েছে। যদিও শ্রমমন্ত্রী রুটিনমাফিক ‘ঈদের আগেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস শোধ’ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সভায় সুনির্দিষ্ট তারিখ না দিতে পারাটা দুঃখজনক।

বিজিএমইএ সূত্রের এই খবর উদ্বেগজনক যে গত ১৭ কর্মদিবসে ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং সেখানে ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। ঈদের আগেই আরও সমসংখ্যক কারখানা বন্ধ বা অকার্যকর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে দুই শতাধিক কারখানায় এপ্রিলের বেতন হয়নি। চলতি সংকটের জন্য মুখ্যত দুটি কারণ চিহ্নিত করেছে বিজিএমইএ। প্রথমত, প্রাক্‌–সাধারণ নির্বাচন পর্বে পোশাক ক্রয় ফরমাশ কমেছে, দ্বিতীয়ত ন্যূনতম মজুরি বেড়েছে, কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা মূল্য বাড়াননি। তাঁদের আরও ভয়, ঈদের আগে আশুলিয়া ও গাজীপুর ‘উত্তাল’ হতে পারে। বিভিন্ন স্থানের অন্তত ৫০টি কারখানার শ্রমিক রাস্তায় নামতে পারেন। আর এসব ঘটলে বিদেশি ক্রেতারা হতোদ্যম হবেন। চলমান সংকট কাটাতে তাঁরা সরকারের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ চেয়েছেন, কিন্তু সরকার তাঁদের দাবিকে এখনো বিবেচনায় নেয়নি।

তবে বিজিএমইএর এই অবস্থানের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতারা যাতে ক্রয় ফরমাশ ও দাম বাড়ান, সেটা একটা অব্যাহত চেষ্টার বিষয়, যার সঙ্গে মালিকদের দক্ষতার প্রশ্নও আছে। মালিকপক্ষ পোশাক রপ্তানিকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল, আর তা ৩৪ বিলিয়ন ডলার অতিক্রমও করেছে। এখন ঈদ সামনে রেখে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রশ্নে কোনো ধরনের ওজর–আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারখানা চলমান রাখতে অন্য সব খরচই চালানো যাবে, কিন্তু শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের প্রশ্ন এলেই মালিকেরা নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করবেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের ‘ভর্তুকি’ চাওয়ার প্রবণতা নতুন নয়।

আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের বৃহত্তম উৎসব ঈদ দোরগোড়ায়। তাই কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সভা জরুরি ভিত্তিতে ডাকা দরকার। সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হলে সব পক্ষের বৈধ স্বার্থ নিশ্চিত করেই উদ্ভূত সমস্যার একটা বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বিষয়টি নিয়ে গত বুধবার আমরা বিজিএমইএর একজন মুখপাত্র এবং কারওয়ান বাজারে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদশর্কের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা অনুমান করি, বেতন–বোনাস নিয়ে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে, এমন কারখানার সংখ্যা ২০টির কম হবে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ন্যূনতম মজুরির জন্য গঠিত ২৯টি কমিটিকে কারখানা নজরদারিতে যুক্ত করা হয়েছে।

সচিবালয়ে গত সোমবারের বৈঠকে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের তরফে ঈদের আগে মাত্র ১৫ দিনের বেতন দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। সরকার এতে সায় দেয়নি, কিন্তু ঈদের আগে শ্রমিকেরা কবে বেতন-বোনাস পাবেন, তার তারিখ ঠিক না হওয়া একটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিদ্যমান আইন তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের উৎসব ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে খুব সুরক্ষা দেয়নি। তাঁদের হুটহাট চাকরি চলে গেলেও ২০১৫ সালে চালু করা বিধান বলেছে, উৎসব ভাতার অধিকারীদের চাকরি হতে হবে কমপক্ষে ‘নিরবচ্ছিন্ন এক বছর’। পরবর্তী মাসের সাত কার্যদিবসের মধ্যে বেতন দিতে হবে।

গত বছর কিছু কারখানার মালিক শেষ মুহূর্তে কারখানা বন্ধ করে নিরুদ্দেশ হন। ঈদের পরে তাঁরা বেতন–ভাতা শোধ করে কারখানা চালু করেন। এর পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে।