চামড়া কেলেঙ্কারির এপিঠ ওপিঠ

:: মাহমুদুর রহমান সুমন || প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৪ ০৯:২৩:৫০ || আপডেট: ২০১৯-০৯-২৪ ০৯:২৩:৫০

কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এবার ভয়াবহ কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছে। বিগত ৫০ বছরে এই খাতে এ ধরনের মর্মান্তিক ও ন্যক্কার জনক, অথনৈতিক বিধ্বংসী ঘটনা আর কখনো ঘটে নি। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দুষছে। সমন্বয়ের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। মাঝখান থেকে নষ্ট হয়েছে,হচ্ছে বিপুল পরিমাণ চামড়া। গরিব মানুষ, যাদের ‘হক ছিল এই চামড়ার টাকায়, তারা নিদারুণভাবে বঞ্চিত হয়েছে। চামড়া শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে ভয়াবহ এই দর পতনে। লোকসান হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

চামড়ার ভয়াবহ দরপতন ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়া, এই দুঃখজনক ঘটনার প্রভাব পরিণতি নিয়ে দেশের প্রিন্ট ওইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকায়। মুখথুবড়ে পড়েছে চামড়া শিল্প তথা দেশের গুরুত্বপূর্ণ রফতানিখাত। কী কী কারণে এমনটা ঘটেছে বা ঘটছে? কারণ বহুবিধ। চামড়া শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় সুষ্ঠু সমন্বিত সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাব, চামড়া শিল্প নগরীতে সুযোগ সুবিধার ঘাটতি, ট্যানারি গুলোতে বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) স্থাপনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অনভিপ্রেত দীর্ঘসূত্রতা, ট্যানারি মালিকদের কারসাজি, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, ব্যাঙ্ক ঋণ পাওয়া এবং আদায়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি কারণ এই খাতকে অন্ধকারে নিপতিত করেছে। সৃষ্টি হয়েছে গোলমেলে এক অস্থিরতার।সংকট দূরীভূত হওয়ার পরিবর্তে আরো ঘনীভূত হচ্ছে ক্রমেই।

সরকারের তরফে ঈদুল আযহার আগে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা। খাসির চামড়ার দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা, বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। দেশের কোনো কোনো জায়গায় গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা, ছাগলের চামড়া ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে এটাই ছিল চামড়ার সর্বনিম্ন রেট। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপুবিশ্বাসের মতে, অবিশ্বাস্য হারে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কারসাজি। জনগণের সঙ্গত প্রশ্নঃ ব্যবসায়ীদের কারসাজি হলে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?

চামড়ার ন্যূনতম দাম না পাওয়ায় বহু জায়গায় চামড়া নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ হুমায়ূন বলেছেন, এবার সর্বোচ্চ ১০ হাজারের মত চামড়া নষ্ট হতে পারে। এটা মোট চামড়ার ‘জিরো পয়েন্ট ফাইভ’ পার্সেন্ট। খুবই নগণ্যব্যাপার। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিদ্যমান সংকট সমাধানের লক্ষ্যে সচিবালয়ে চামড়া খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এক বৈঠক শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের একথা বলেন। মন্ত্রী চামড়া নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে বিএনপির হাত আছে বলে মন্তব্য করেন। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সম্প্রতি প্রথম আলোতে তাঁর কলামে চোখা মন্তব্য করেছেন। ‘চামড়া-চক্রান্ত চাট্টিখানি কথা নয়’ শিরোনামের কলামে তিনি লিখেছেন,…চামড়া নষ্ট করা প্রসঙ্গে বর্তমান শিল্পমন্ত্রী বললেন ‘তাহলে বিএনপি (চামড়া) কিনে ফেলে দিয়েছে’। বিএনপিকে দুই চোখে দেখতে পারে না, এমন মানুষও এই বক্তব্যে লজ্জিত। আমি গত ৫০ বছরে উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত মাননীয় মানুষদের যে পাঁচটি দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি শুনেছি, এটি তার অন্যতম।

হাল আমলের চামড়া নষ্ট করা বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার দিকে চকিত দৃষ্টিপাত করা যাক। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবারের চামড়ার অর্ধেকেরও বেশি নষ্ট হয়ে যাবে। নষ্ট চামড়ার অর্থ মূল্য অন্তত ২৪২ কোটি টাকা। রফতানির হিসাবে ক্ষতির অঙ্ক গিয়ে দাঁড়াবে কয়েক গুণ বেশি। ন্যূনতম দাম না পেয়ে কমপক্ষে ১০-১৫% গরুর চামড়া সড়কে ফেলে ও মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। সময় মত লবণ না দেওয়া, বৃষ্টি ও গরমের জন্যও কমপক্ষে ২০ শতাংশ গরুর চামড়া নষ্ট হবে। অন্যদিকে দামের ধসের কারণে নষ্ট হয়েছে ছাগল ও ভেড়ার ৮০ শতাংশ চামড়া। অর্থাৎ প্রায় এক কোটি চামড়ার মধ্যে ৫৩ লাখ চামড়াই নষ্ট হবে শেষতক।

চামড়া বেচাকেনায় সরকারের কার্যকর নজরদারি ও উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। অভিযোগঃ এই সুযোগে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কারসাজিতে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। কাঁচা চামড়ার নজিরবিহীন দর পতনের কারণ খুঁজে বের করার জন্য বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী মহিউদ্দিন মোঃ হানিফ। তিনি বলেন, হাইকোর্টের দু’টি দ্বৈত বেঞ্চে রিটটি ১৮ আগস্ট (২০১৯) উপস্থাপন করা হয়। বেঞ্চ দু’টি তা শুনানির জন্য গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

দাম না পেয়ে দেশের মানুষ চামড়া ফেলে দিচ্ছে। এর বিপরীত চিত্র কিন্তু ভয়াবহ। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে আমদানি করা হয়েছে ৯৪৫ কোটি টাকার বিদেশি চামড়া। কী কারণে এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার আমদানি-গচ্চা? কারণ বাংলাদেশী চামড়া শিল্প নগর পরিবেশ বান্ধব নয় বলে বিদেশি বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশী চামড়ার তৈরি পণ্য কেনে না। চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান রফতানি আয়ের খাত।২০২১ সাল নাগাদ এখাতে ৫০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু চামড়ার রফতানি কমছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ১০২ কোটি ডলার আয় করে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ শতাংশ কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া খাতে রফতানি আয় ছিল ১২৩ কোটি ডলারের বেশি। ট্যানারি মালিকরা তার স্বরে বলছিলেন যে নগদ টাকার অভাবে তারা কাঁচা চামড়া কিনতে পারছেন না। সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে জমি বুঝে না পাওয়ায় ব্যাঙ্ক থেকে আশানুরূপ ঋণ মেলে নি।

রুদ্ধদ্বার সেই বৈঠকের সূত্র বলছে, ট্যানারি মালিকরা বৈঠকে দাবি করেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে গেছে।প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম এক ডলারের নিচে ৫০ সেন্ট। কিন্তু ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম দেড় থেকে দুই ডলারের মধ্যে। সেই বৈঠকে বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলামও বলেছেন, ট্যানারি মালিকদের দেওয়া তথ্য সঠিক নয়।

তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে এটিই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, নগদ অর্থ সংকটের অজুহাত দেখানো হলেও কাঁচা চামড়ার মূল্য বিপর্যয়ের মূল কারণটি হচ্ছে ট্যানারি মালিকদের কারসাজি।তারা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা পেয়েও আড়তদারদের বকেয়া পাওনা সময় মত শোধ করেন নি। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে: চামড়াশিল্প খাতে সার্বিকভাবে ব্যাঙ্ক প্রদত্ত ঋণেরমোট পরিমাণ সাত হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু মাত্র কাঁচা চামড়া কেনার জন্যেই ট্যানারি মালিকদের ঋণ দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৬১২ কোটি টাকা। বাকি টাকা দেওয়া হয়েছে চামড়াজাত পণ্য তৈরির খাতে। যারা ঋণ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮০% ই ঋণখেলাপি। এই ঋণ বিশেষ সুবিধায় মাত্র সাত শতাংশ সুদে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেছেন, আড়তদারদের সঙ্গে আমাদের লেনদেনের সম্পর্ক দীর্ঘ ৫০ বছরের। দেনা পাওনা আছে ঠিক। তবে সমাধানও আছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের কারণে আমরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক টাকা ব্যয় হয়েছ্ছে সে কারণে অনেকেই ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি আড়তদারদের বকেয়াও পরিশোধ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি।

পরিশেষে বলতে চাইঃ চামড়াশিল্প নিয়ে যা ঘটে গলে তা সামান্য বিষয় নয়। এটি নিঃসন্দেহে জাতীয় অর্থনীতির বিরুদ্ধে সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। নেপথ্যে কারা, সেটা খুঁজে বেরকরতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। না হলে দুর্ভাগা অসহায় জনগণের ক্লেশ ও ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। দুর্বৃত্তরা আরো নির্মম ও বেপরোয়া হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে। বাণিজ্য ও শিল্প সরকারের এই দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা, কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিও উদ্ভূত এই সংকটেরজন্যে দায়ী। এই ধরনের তুঘলকি কায়কারবার, সরকারের নির্লজ্জ নির্লিপ্ততা ভম-লের একটিমাত্র দেশেই সম্ভব যার নাম বাংলাদেশ।

সুতরাং চামড়া শিল্প নিয়ে অবজ্ঞা, স্বেচ্ছাচার, নয়ছয় আর নয়। যারা এই অনভিপ্রেত দুঃসহ সংকটের জন্য দায়ী, তাদের উপযুক্ত শাস্তি বিধান নিশ্চিত করতে হবে।জাতীয় রফতানি খাতের ইস্যুতে কোনো ছাড় দেওয়া সমীচীন হবে না কিছুতেই। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ভয়াবহ আত্মধ্বংসী ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্যে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলকে তৎপর হতে হবে। পরস্পরকে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ নয়, সত্যিকারের ন্যূনতম দেশপ্রেমের পরিচয় যেন ভবিষ্যতে দেশবাসী পান। আমরা সেই প্রত্যাশায়ই থাকলাম।

মাহমুদুর রহমান সুমন: কলাম লেখক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ