নিরাপদ খাদ্যের অভাবে জাতি মেধাশূন্য হবে

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০১৯-১০-২১ ১৯:২১:১৫ || আপডেট: ২০১৯-১০-২১ ১৯:২১:১৫

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দা সারওয়ার জাহান বলেছেন, নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে না পারলে জাতি অসুস্থ ও মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। খাদ্যে ভেজাল ঠেকাতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একান্ত আলাপে এ কথা বলেন তিনি।

খাদ্যনিরাপত্তার ব্যাখ্যা দিতে দিতে গিয়ে সৈয়দা সারওয়ার জাহান বলেন, সাধারণত একটি দেশের পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুদ, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিতরণকে খাদ্যনিরাপত্তা বোঝায়। একজন মানুষের বাজারে গিয়ে খাদ্য কেনার সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। আবার বাজারে খাদ্যের উপস্থিতি থাকলেই জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। খাদ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। খাদ্য কেনার সামর্থ্য ও অধিকার থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি জড়িত।

তা হলে খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বশর্ত কী? ‘খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বশর্ত হলো দেশের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিতরণ করার অবস্থায় থাকা।’ বলেন সৈয়দা সারওয়ার জাহান।

‘একটি দেশের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো দেশে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুদ না থাকে তাহলে সে দেশে খাদ্য ঘাটতি এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সর্বত্র খাদ্যের চরম অভাব ও হাহাকার দেখা যায়। সীমিত খাদ্য সরবরাহের জন্য সরবরাহকৃত পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।’

শুধু খাদ্যনিরাপত্তা থাকলেই হবে না, খাদ্যের বিশুদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভেজাল খাবার খেয়ে ক্যানসারসহ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে না পারলে জাতি অসুস্থ ও মেধাশূন্য হয়ে পড়বে।’

বর্তমানে আমরা যে খাদ্য খাচ্ছি তা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ বলে মনে করেন সৈয়দা সারওয়ার জাহান। ‘আগে বিভিন্ন খাদ্যে যেমন মশলা, শিশুখাদ্য, গুঁড়া ও তরল দুধ, শাক-সবজি ও ফলমূলসহ অন্যান্য পণ্যে যেসব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হতো বর্তমানে সেসব পণ্যের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তাই বলা যায় বর্তমানে আমরা যেসব খাদ্য খাচ্ছি তা আগের চেয়ে যথেষ্ট নিরাপদ।’

তবে গুঁড়া হলুদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় আমরা জানতে পেরেছি, বাজারে ব্র্যান্ডের কিংবা খোলা যেসব হলুদ পাওয়া যাচ্ছে তার সব কটির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে সিসা পাওয়া গেছে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই বাজারের কোনো হলুদ যেন কেউ ব্যবহার না করে তার জন্য জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।’

বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশে খাদ্যনিরাপত্তায় কোনো সমস্যা নেই। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য কিছু বিষয়ে নজর রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন সৈয়দা সারওয়ার জাহান। খাদ্য নিরাপত্তার একটি দিক হলো কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকদের পর্যাপ্ত ও সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে। কোন পণ্য উৎপাদনে কতটুকু সার, কীটনাশক ব্যবহার করা হবে এবং উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের নিয়মনীতি মেনে তা সংরক্ষণ করতে হবে। শুধু কৃষিপণ্য না, অন্যান্য যেসব পণ্য যেমন পশুখাদ্য আছে তা উৎপাদনে ও সংরক্ষণেও সঠিক নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হবে।

সৈয়দা সারওয়ান জাহান বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তিতে খাদ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জও কম নয়। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশের জন্য খাদ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য আইনের সঠিক ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু লাভের জন্য আমরা নিজেরাই নিজেদের বিষ খাওয়াচ্ছি। এই মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের মানসিকতা ও আইনের প্রয়োগের অভাব নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তিতে খাদ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

খাদ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সৈয়দা সারওয়ার জাহান। ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি খাদ্য নিরাপদ আইনের প্রবর্তন হলেও কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। কিন্তু এই আইনের সঠিক প্রয়োগ লক্ষ করা যায় না। আইনের প্রয়োগ হলে বিভিন্ন সময়ে খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তা উঠত না। মানুষ বিনা দ্বিধায় খাদ্যে ভেজাল মেশাতে পারত না।

তবে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, ‘খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে বিগত আইনের পরিবর্তে ২০১৩ সালে নতুন আইন প্রবর্তন করা হয়ছে। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ, মজুদ, পরিবহন, বিতরণ, বিপণনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কেউ খাদ্যে ভেজাল কিংবা আইন বহির্ভূত কোনো কাজ করলে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এসব ব্যক্তি ও কোম্পানির বিরুদ্ধে আইন অনুসারে দ্রুত ও তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে মামলা দায়ের করতে পারবেন।’

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কতটা বাস্তবসম্মত বা সময়োপযোগী কাজ করতে পারছে? এই প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা সারওয়ার জাহান বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ শতভাগ বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী কাজ করছে। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের লোকবল খুবই কম। তা সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা ও এর সঙ্গে যুক্ত সব ব্যক্তি ও কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ এবং মিটিং করে আমরা তাদের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, মজুদ ও বিপণন যেন নিরাপদ, আইনসম্মত এবং বিএসটিআইয়ের নির্দেশনা অনুসারে হয় সে ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ ও সতর্ক করেছি। ইতিমধ্যে আমরা বিভিন্ন পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। এবং এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’ নিরাপদ খাদ্য সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তারা আপসহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

সানবিডি/ঢাকা/ঢাকা টাইমস/এসএস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ