করোনা মহামারীতে বাড়ছে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৬ ১৯:৩০:৪৬ || আপডেট: ২০২০-০৪-০৬ ১৯:৩০:৪৭

প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে বৈশ্বিক বাণিজ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। বৈশ্বিক মহামারী ঠিক কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তা এখনো অনিশ্চিত। ফলে ভোক্তাদের মধ্যে বিরাজ করছে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভোক্তারা ঝুঁকেছেন অতিরিক্ত খাবার ক্রয়ে, যা তারা আপত্কালের জন্য মজুদ করছেন। অন্যদিকে মহামারীর মধ্যে জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে বিভিন্ন দেশ। একই পথে হাঁটছে এশিয়ার শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশগুলোও। ফলে এ অঞ্চল থেকে খাদ্যপণ্যটির রফতানি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। চাল রফতানিকারী দেশগুলোর বৈশ্বিক তালিকায় ভিয়েতনামের অবস্থান তৃতীয় শীর্ষ। প্রতিকূল পরিবেশের জেরে কয়েক বছর ধরে দেশটিতে চাল উৎপাদনে মন্দা চলছে। তার ওপর পড়েছে বৈশ্বিক মহামারীর প্রভাব। ফলে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশটি সম্প্রতি খাদ্যপণ্যটির নতুন রফতানি বিক্রয় চুক্তি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চালের রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন।

ভিয়েতনাম বাদেও চালের রফতানি সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ কম্বোডিয়া। একই আভাস দিয়েছে মিয়ানমারও। অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলায় খাদ্যপণ্যটির রফতানি কমিয়ে দিতে পারে দেশটি।

জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও এশিয়া অঞ্চলের চালের বাজার বিশ্লেষক ডেভিড ডাউই বলেন, এশিয়ার দেশগুলো খুব একটা সতর্ক না হয়েই চালের রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তারা কেবল নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে।

অনেক দেশ আবার মনোনিবেশ করেছে বাড়তি আমদানির দিকে। ফিলিপাইন এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশ। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রচুর চাল আমদানি করে থাকে। নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় দেশটি চালের আমদানি বাড়াতে পারে। অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তায় ফিলিপাইন এরই মধ্যে ৬০ কোটি ডলার অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি তিন লাখ টন চাল ক্রয়ের পরিকল্পনা করেছে। ভিয়েতনামের শীর্ষ চাল রফতানির বাজার দেশটি। অতিরিক্ত চাল আমদানিতে ফিলিপাইন সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রফতানিকারী দেশগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় চুক্তির আশ্রয় নিতে পারে। রাজধানী ম্যানিলায় অবস্থিত জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের গুদামে এরই মধ্যে বস্তা বস্তা চাল মজুদ করতে শুরু করেছে দেশটি।

চীনের অবস্থাও একই। চীন বিশ্বের শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশ। একই সঙ্গে দেশটি খাদ্যপণ্যটির শীর্ষ ভোক্তা দেশ। পর্যাপ্ত চাল উৎপাদন হওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে দেশটি খুব একটা চাল আমদানি করে না। রফতানিও করে কম। তবে নভেল করোনাভাইরাসের ধাক্কা সামলে বাজারে খাদ্যপণ্যটির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ বছর দেশটি রেকর্ড চাল কিনতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

তবে চাল রফতানি বন্ধের মতো পরিস্থিতি কি আদৌ তৈরি হয়েছে? খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বাস্তব পরিস্থিতি পুরো উল্টো। এ মুহূর্তে চালের আসলে কোনো সংকট নেই। বিশ্বের বৃহত্তম রফতানিকারী দেশ ভারতের গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত চাল মজুদ রয়েছে। এছাড়া চলতি মৌসুমে দেশটিতে রেকর্ড চাল ও গম উৎপাদন হতে পারে। চাঙ্গা থাকতে পারে খাদ্যপণ্যটির বৈশ্বিক উৎপাদনও। মার্কিন কৃষি বিভাগ ইউএসডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে মোট ৫০ কোটি টন চাল উৎপাদিত হতে পারে। এ মৌসুমে কৃষিপণ্যটির বৈশ্বিক মজুদ বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৮ কোটি টনে, যা এ যাবত্কালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

শুধু ভারতে খাদ্যপণ্যটির মজুদ বাড়ছে তা নয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল রফতানিকারী দেশ থাইল্যান্ডে এবার খরা ভাব বিরাজ করছে। ফলে চলতি মৌসুমে দেশটিতে চালের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পরও দেশটি সম্প্রতি জানিয়েছে, এ বছরের রফতানি লক্ষ্য পূরণের জন্য তাদের হাতে যথেষ্ট চাল মজুদ রয়েছে। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, এ মুহূর্তে দেশটির বাজারে পণ্যটির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে।

এদিকে বিশ্বজুড়ে চালের রফতানি চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দামও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মার্চে থাইল্যান্ডের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের রফতানিমূল্য বেড়ে টনপ্রতি ৫১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৩ সালের পর থেকে পণ্যটির সর্বোচ্চ রফতানি মূল্য।

ডেভিড ডাউই এ বিষয়ে বলেন, স্বল্পমেয়াদে চালের দাম বাড়লেও তা খুব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি মনে করেন না পণ্যটির দাম বেড়ে ২০০৮ সালের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। ওই সময় প্রতি টন চালের দাম ১ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বৈশ্বিক খাদ্য ঘাটতির মধ্যে থাইল্যান্ড চালের রফতানি বন্ধ করে দিলে পণ্যটির দাম বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছিল।

এদিকে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গম রফতানি সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া, কাজাখস্তান ও ইউক্রেন। এ পরিস্থিতিতে এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের খাবার নিশ্চিতকরণের বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সানবিডি/ঢাকা/এসএস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ