বৈশ্বিক উত্তোলন হ্রাস চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধিতে অনিশ্চয়তা

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৩ ১৫:৪৩:৪৫ || আপডেট: ২০২০-০৬-০৩ ১৫:৪৩:৪৫

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার চাঙ্গা করতে চেষ্টার কোনো কমতি নেই অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ বা ওপেকের। এর জের ধরে চলতি বছরের এপ্রিলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলন হ্রাসে বৈশ্বিক চুক্তিতে সম্মত হয় জোটভুক্ত দেশগুলো ও এর মিত্ররা। ৬০ দিন স্থায়ী চুক্তির মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন উঠেছে, সংস্থাটি চলমান চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়াতে পারে। খবর রয়টার্স ও অয়েলপ্রাইসডটকম।

৯ জুন ওপেক প্লাস জোটের বৈঠকে বসার কথা ছিল। তবে জোটটি আসন্ন বৈঠকের তারিখ এগিয়ে ৪ জুন নির্ধারণ করেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এ বৈঠকে জোটটি জ্বালানি তেলের উত্তোলন হ্রাসসংক্রান্ত চলমান চুক্তিটির মেয়াদ আরো এক থেকে তিন মাস বাড়িয়ে নিতে পারে।

আগে থেকে নানা জটিলতায় ধুঁকতে থাকা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর। মহামারীর প্রকোপে চলতি বছরের প্রথম দিকে পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক গড়ে তিন কোটি ব্যারেলের বেশি কমে যায়, যা মোট বৈশ্বিক চাহিদার ৩০ শতাংশের বেশি। পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদার এমন অপ্রত্যাশিত পতনে হু হু করে কমতে শুরু করে দাম। দরপতনের ধারাবাহিকতায় এপ্রিলের শেষ নাগাদ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে কমতে শূন্য ডলারে গিয়ে ঠেকে।

এর আগেই অবশ্য সৌদি-রুশ মূল্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ধাক্কা খায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার। ওই সময় জ্বালানি পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। মূল্যযুদ্ধ শুরুর পরবর্তী সময়ে পণ্যটির দাম কমতে কমতে প্রতি ব্যারেলে ২০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। একদিকে জ্বালানি তেলের রেকর্ড দরপতন, অন্যদিকে নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী—এ দুইয়ের জের ধরে জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারকরা পড়েন মহাবিপদে।

এ পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার চাঙ্গা করার রূপরেখা তৈরি করার লক্ষ্যে এপ্রিলের শেষে বৈঠকে মিলিত হয় ওপেক প্লাস। বৈঠকে ওপেকভুক্ত দেশ, রাশিয়া এবং অন্য সহযোগী দেশগুলো মে ও জুনজুড়ে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন সক্ষমতার তুলনায় দৈনিক গড়ে ৯৭ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ ২০ শতাংশ কমে আসবে বলে প্রত্যাশা জোটটির। ওপেকের ইতিহাসে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আগে কখনই অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন এতটা কমায়নি।

তবে আসন্ন বৈঠকে ওপেক প্লাসের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন হ্রাসের বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ আদতে বাড়বে কিনা সে বিষয়ে এখনো কিছুই নিশ্চিত নয়। এমনিতেই জোটটির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্যটির উত্তোলন হ্রাস নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে চলমান চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের শেষ অবধি বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে রাশিয়া এখন পর্যন্ত কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেনি।

তবে জ্বালানি তেলের বাজারে ভারসাম্য ফেরাতে ওপেক প্লাসের চুক্তিটি বেশ সফল হয়েছে বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। রেকর্ড সর্বনিম্ন দাম থেকে পণ্যটির দাম ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সর্বশেষ কার্যদিবসে আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৩৯ ডলার ৩৪ সেন্ট, আগের দিনের তুলনায় যা ১ ডলার শূন্য ২ সেন্ট বা ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আদর্শ প্রতি ব্যারেল ওয়েস্ট টেক্সাসের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়ে ৩৬ ডলার ৩৪ সেন্টে উন্নীত হয়েছে, আগের দিনের তুলনায় যা দশমিক ৯৯ সেন্ট বা ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।

অবশ্য জ্বালানি তেলের বাজারে ভারসাম্য ফেরার পেছনে ওপেকের রেকর্ড উত্তোলন হ্রাস চুক্তির বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের শেল অয়েল উত্তোলন হ্রাসও অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। গত দুই মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের শেল অয়েল উত্তোলন দৈনিক গড়ে ১৬ লাখ ব্যারেল বা কমপক্ষে ১২ শতাংশ কমে গেছে।

ওপেকের জ্বালানি তেল উত্তোলন হ্রাসসংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে অস্ট্রিয়াভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেবিসি এনার্জির এক নোটে বলা হয়েছে, বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ বাড়ালে জ্বালানি তেলের বাজার হয়তো আরেকটি পতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। তবে বর্তমান স্তরের চেয়ে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটা খুব একটা কাজে আসবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্কের উত্তেজনা জ্বালানি তেলের বাজারে নয়া হুমকিতে পরিণত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের চোখ রাঙানিকে পাত্তা না দিয়ে সম্প্রতি হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারির পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে চীনের পার্লামেন্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভ্রমণ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হংকংয়ের বিশেষ সুবিধা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে আবার গত সোমবার রাষ্ট্র পরিচালিত সংস্থাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের খামারজাত পণ্য ক্রয় কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে চীন। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্রমাবনতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আরো একটি চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সানবিডি/ঢাকা/এসএস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ