সাশ্রয়ী, লক্ষ্যনির্দিষ্ট ও কার্যকর বাজেটের প্রত্যাশা মিটল না: খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০৬-১৭ ২১:৪২:১২ || আপডেট: ২০২০-০৬-১৭ ২১:৪৪:২৭

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২০-২১ এমন সময়ে উপস্থাপিত হলো, যখন বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের কারণে একধরনের বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এ সংক্রমণের সূত্রপাত জানুয়ারি থেকে, তবে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে মার্চ মাস থেকে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও আমরা করোনা সংক্রমণের কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়েছি। প্রস্তাবিত বাজেটটি যখন উত্থাপিত হলো, তখন বাংলাদেশ বেশ কিছু ঝুঁকির মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করছে। চার ধরনের ঝুঁকিতে আমরা রয়েছি : ১. স্বাস্থ্যঝুঁকি, ২. খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ৩. কর্মসংস্থানের ঝুঁকি ৪. দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ঝুঁকি। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখা গিয়েছে যে, ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হতে যাচ্ছে, সে বছরে গত এক দশকে আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, বেকারত্ব হ্রাস এবং দারিদ্র্য বা আয়বৈষম্যের ক্ষেত্রে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছিলাম, সেগুলো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পড়বে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আইএলও, এডিবি এবং দেশের মধ্যে সিপিডি, পিআরআই-এর মতো সংস্থাগুলো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নিয়মিত পরিস্থিতি জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, সে বছরে সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা কিছু দুর্বল চিত্র দেখতে পাচ্ছি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থাকা, সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ততা, উচ্চ বাজেট ঘাটতি, নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং নেতিবাচক আমদানি প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়েছে। যদিও এর মধ্যে আমরা কিছু স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখতে পেয়েছি : মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে একধরনের স্থিতিশীল পরিস্থিতি, রেমিট্যান্স ফ্লোর ক্ষেত্রে যতটুকু নেতিবাচক ভাবা হয়েছিল ততটুকু না হওয়া, ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের অবস্থা স্বস্তিদায়ক থাকা এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়া। এ বিষয়গুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে।

কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ক্ষেত্রে যে প্রত্যাশাগুলো ছিল, বিশেষ করে সাশ্রয়ী বাজেট হওয়া, প্রাধিকারগুলোর পরিবর্তন করা এবং বিশেষ পরিস্থিতির বাস্তবতায় নতুন প্রাধিকার নির্ধারণ করা, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সাশ্রয়ী ব্যয় কাঠামো চিন্তা করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অথচ বাজেটে উত্থাপিত হওয়ার আগে এ ধরনের বিষয়গুলো অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছিল। সে বাস্তবতায় গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী যে বাজেটটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করলেন, সেখানে এই প্রত্যাশাগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন দেখতে পেলাম না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, তার কিছু ঘাটতির প্রতিফলন বাজেটে রয়েছে। বিশেষ করে ফিসকাল ফ্রেম বা রাজস্ব কাঠামোকে বেশ কিছু প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় রেখে কাঠামো তৈরি করে বাজেটটি উপস্থাপিত হলো। সেদিক থেকে আমরা বাজেটটিকে দুটি ভাগ করে বিশ্লেষণ করতে পারি। একটি হলো : সামষ্টিক এবং রাজস্ব কাঠামো, আরেকটি হলো : খাতওয়ারি প্রাধিকার। আমরা দেখতে পেয়েছি যে সরকার অত্যন্ত বাস্তবানুগভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.২ শতাংশ ধরেছে, যদিও অন্যান্য হিসাবে এটি আরও কম হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে একই ধরনের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে। সেক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বছর শেষে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাশা করছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপি শতাংশের হিসাবে ১২.৭ শতাংশ ধরা হয়েছিল। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপি হিসাবে ধরা হচ্ছে ২৫.৩ শতাংশ, প্রায় দ্বিগুণ। আমি যদি কাগজ-কলমেও হিসাব করি, তাহলে বর্তমান অর্থবছরে যে বিনিয়োগ হয়েছে তার থেকে বেশি বিনিয়োগ আগামী অর্থবছরে হতে হবে। সেক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। আর বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে ১২৫ শতাংশ। কোন বিচারে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা তাই প্রশ্নসাপেক্ষ। আবার কোন হিসাবগুলো মেলাতে গিয়ে এ প্রক্ষেপণগুলো করা হয়েছে, সেটাও প্রশ্নের উদ্রেক করে। মোট কথা, ম্যাক্রো ইকোনমির যে মেজর সূচকগুলো ধরা হচ্ছে, সে সূচকগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ থেকে যে অনুমিতি পাওয়া যায়, সেটি হলো সরকার ভাবছে যে, কভিড যেভাবে এসেছে, সেভাবে ২০২১ সালের প্রথমার্ধে তা চলে যাবে। এখানে সরকার ভি আকারের প্রবৃদ্ধি আগামী অর্থবছরে প্রত্যাশা করছে, যেটা এই অর্থবছরে আমরা হারিয়েছি। এই অনুমিতি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে, যেখানে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে দেখছি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরত যাওয়ার মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বৈশ্বিক পর্যায়ে আমরা যে পণ্যগুলো রপ্তানি করি, সেই বৈশ্বিক বাজারগুলোও প্রস্তুত নয়। যে দেশগুলো ভেবেছিল তারা বাজার স্বাভাবিক করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করবে, বিকিকিনি শুরু করবে, সেসব জায়গায় কভিড সংক্রমণ আবার বাড়ছে। সেদিক থেকে আমাদের পণ্য রপ্তানির জন্য আগামী ছয়মাস পরিস্থিতি অনুকূল না থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উপরন্তু, এরকম বিনিয়োগের জন্য আমাদের দেশীয় বাজারেও মানুষের যে আয়চাহিদা বা ব্যয়ের সক্ষমতা কতটুকু থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা, পণ্যের বিক্রি না হলে উৎপাদনমুখী কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করবে না। মনে রাখা দরকার যে এখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আন্ডার ক্যাপাসিটিতে চলছে। তাদের প্রচুর পরিমাণ আনইউটিলাইজড ক্যাপাসিটি এখনই রয়েছে। সুতরাং, সেগুলো ব্যবহার না করে নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কারণ নেই। এজন্যই এসব প্রক্ষেপণ নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে ফিসকাল ফ্রেমের ব্যাপারে আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে, সরকার আয়ের সাপেক্ষে ব্যয়ের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেবে। সিপিডির হিসাবে, যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, সে বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হবে বলে ধরা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এরকম পরিস্থিতি বা এরচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ে উচ্চ রাজস্ব নির্ধারণ করে উচ্চ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা তৈরি করা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সিপিডির হিসাবে বর্তমান অর্থবছরের হিসাবে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশ ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিককালের হিসাবে এ ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আদায় কখনোই সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আদায় হয়েছে ২৩ শতাংশ। এই আয়কাঠামোর ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ না হওয়া এবং এরকম আয়কাঠামো মাথায় রেখে ব্যয়ের চিন্তা করা আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এর কতটুকু অর্জন করা যাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এরকম চ্যালেঞ্জিং সময়ে সরকার কোনো মন্ত্রণালয়কে বড় ধরনের অর্থচাপে রাখতে চায়। কিন্তু সমস্যা দেখা যাবে অন্য জায়গায়। যখন আগামী অর্থবছরে কম রাজস্ব আসতে শুরু করবে, তখন এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ করা হবে ঠিক সে সময়ে প্রাধিকারমূলক খাতে অর্থ বরাদ্দ দিতে গিয়ে সরকার টানাপড়েনে পড়বে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এরকম একটি আশঙ্কা আমাদের রয়েছে। কেননা, সব খাতকেই সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বাজেটে রাখা আছে। বাজেটে চারটি খাতকে প্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। খাতগুলো হলো : স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা। এ জায়গাগুলোতে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ অর্থছাড় করতে পারবে কি না, সে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে জরুরি বিষয়গুলোতে অর্থছাড়ের বিষয়টি বাস্তবায়নযোগ্য হবে কি না সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। এক্ষেত্রে বিবেচনা করা দরকার, স্বাভাবিক সময়ে যেসব বিষয় জরুরি মনে হয়, সংকটকালীন তা প্রাধিকারের উপযোগী নাও হতে পারে। কিছুটা পরে হলেও সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অসুবিধা নেই। যেহেতু স্বাভাবিক সময়ে পণ্যের যে চাহিদা সেটি এখন নেই। সুতরাং, স্বাভাবিক সময়ের প্রাধিকারগুলোর পরিবর্তন করার যৌক্তিকতা সরকারের ছিল। কেননা, অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকার আগামী বছর একটা চাপে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সিপিডি থেকে আমরা বলেছিলাম কিছু ফাস্ট ট্রাকের প্রকল্প যেগুলোর ডিমান্ড এখন নেই, সেগুলোতে প্রাধিকার এখন কম দিতে।

সেক্ষেত্রে আমরা সিপিডি থেকে বিদ্যুৎ খাতের কথা বলেছিলাম। যেখানে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি রয়েছে, সেখানে নতুন ক্যাপাসিটি যুক্ত না করে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে যে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে, তা থেকে অর্থ সাশ্রয় করা যায়। সেই পদক্ষেপগুলো আমরা নিতে বলেছিলাম। সাশ্রয় করার জন্য আমরা সিপিডি থেকে কিছু ক্ষেত্র দেখতে পাচ্ছি। এ ক্ষেত্রগুলোতে গভীরভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ ছিল। বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমরা নন-ডেভেলপমেন্ট কিছু এক্সপেন্ডিচার দেখতে পেয়েছি, যেগুলো এই অর্থবছরে না থাকলেও হতো। যেমন ২৭,৯৬১ কোটি টাকা রাখা আছে শেয়ার ও ইক্যুইটির জন্য। এরকম গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইক্যুইটি এবং শেয়ার কেনার জন্য এত অর্থ বরাদ্দ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আবার ২২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা রাখা আছে বিভিন্ন অটোনোমাস বডিকে লোন আকারে দেওয়ার জন্য। কোন ধরনের বডির জন্য কতটুকু টাকা প্রয়োজন হবে, সেটিও দেখবার প্রয়োজন আছে। নন-ডেভেলপমেন্ট এক্সপেন্ডিচারের ক্ষেত্রে যে ভ্রমণজনিত ব্যয়, আপ্যায়নজনিত ব্যয় এবং যাতায়াতজনিত অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ ছিল বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা ইনোভেশন বা উদ্ভাবন করার যথেষ্ট প্রচেষ্টা আমরা দেখিনি। আবার ডেভেলপমেন্ট এক্সপেন্ডিচারের ক্ষেত্রেও আমাদের কাছে মনে হয়েছে, যেসব প্রকল্পের কাজ কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যেত, সেখানেও আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোও আসলে ব্যয়সাশ্রয়ী হচ্ছে না। এর ফলে বাজেট ঘাটতির কারণে সরকারকে একটি বড় ধরনের চাপে থাকতে হবে। এজন্য সরকারকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এবারে যে ১১ বিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেটা কতটুকু অর্জন করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার দেশীয় উৎস অর্থাৎ যে ৮৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে অথবা এ জন্য যে ঋণনির্ভর স্টিমুলাস প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, সেজন্য চাপের সৃষ্টি হতে পারে। আবার বেসরকারি খাতে যে স্বাভাবিক ঋণ দেওয়ার কথা, যদিও সেটা আগামী অর্থবছরে কম যাবে, তা সত্ত্বেও সেখানে একধরনের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে কি না সরকারের ঘাটতি অর্থায়নের জন্য, সে বিষয়গুলোকে আমরা চিন্তার জায়গা থেকে দেখছি। এটা হলো আমাদের রাজস্ব কাঠামো সম্পর্কিত অভিমত।

দ্বিতীয় বিষয় হলো- খাতভিত্তিক অর্থায়ন। এ অর্থায়নকে সরকার অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করেছে। যদিও আমাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো যেত। বিশেষ করে এরকম সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সেবা বাড়ানোর জন্য যে রকম বরাদ্দ বাড়ানো দরকার, সে অনুযায়ী ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলো, সেটা দিয়ে যথেষ্ট হবে কি না সেটা আমরা চিন্তা করছিলাম। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে এ মুহূর্তে কভিডের মোকাবিলার জন্য যে সমস্ত ইকুইপমেন্ট কেনা, ইমার্জেন্সি ফ্যাসিলিটিস তৈরি করা এবং লোকবল বৃদ্ধি করার জন্য যে রাজস্ব ব্যয়ের দরকার, সেজন্য যেন বাজেটে যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ থাকে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে আগেই একধরনের অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিককালে বরাদ্দ ব্যবহার করে দুর্নীতিরও অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে প্রকল্প টেন্ডারের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ এবং সেজন্য অনেক ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এ বিষয়গুলো স্বাস্থ্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু আমরা একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছি, তাই স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ও জরুরি সেবাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো খুবই প্রয়োজন। আমরা সিপিডি থেকে বলেছি, স্বাস্থ্য খাতে কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়ন দরকার। যেমন, কমিউনিকেবল ডিজিজেস বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস, কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক, নার্স ট্রেনিংয়ের প্রকল্পগুলো যেন দ্রুততর সময়ে বাস্তবায়ন হয়। আমরা জেনেছি যে, সরকার কভিডের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা আলাদাভাবে রেখে দিয়েছে। সেটি মূলত স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে। আমরা এটিকে যৌক্তিক পদক্ষেপ মনে করি। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, ৯৫ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা সবসময় বলে থাকি, পেনশনের বরাদ্দ আলাদা রেখে যদি সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ দেওয়া যেত, তাহলে সেটা সর্বাধিক কার্যকর হতো। কেননা, দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা যতদূর জানি, সরকার সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। আগেই ৫০ লক্ষ পরিবারের যে কথা বলা হয়েছিল, তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাবলিক ফুড স্টককে আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এগুলো আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়েছে, সরকারের প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল যে এগুলো বোধহয় স্বল্পকালীন মেয়াদে দিতে হবে। যেহেতু স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রলম্বিত হচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তাই এ ধরনের সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচি এককালীন দিলে হবে না, আরও কয়েকবার হয়তো দেওয়ার প্রয়োজন হবে। সুতরাং এজন্য বাজেট বরাদ্দ এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার মতো অপশনগুলো সরকারকে রাখতে হবে। একইসঙ্গে ক্যাশ ট্রান্সফারের যে উদ্যোগগুলো, সেগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। কিন্তু সেখানেও একই সমস্যা। ক্যাশ ট্রান্সফারের জন্য যে সিলেকশন করা হয়েছে, সেখানে ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সিপিডি থেকে বলা হয়েছে, সিলেকশন প্রসেসে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এনজিও, সিভিল সোসাইটি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করতে পারলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা যেত। ভালো ধরনের জবাবদিহিও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যেত। হয়তো-বা ত্রুটির বিষয়টি এত বড় হতো না। কেননা, এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে এলাকাগুলোতে কাজ করার কারণে তাদের কাছে এলাকার কার কী চাহিদা রয়েছে এবং কোন ধরনের চাহিদা রয়েছে, সে সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে। তাদের কাছে ডাটাবেইজ রয়েছে। সে সমস্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তারা সরকারকে সহায়তা করতে পারত। আমরা মনে করি, সিলেকশন প্রসেসে, এমনকি বাস্তবায়নের জন্য মনিটরিংয়ে এবং ডিস্ট্রিবিউশনেও স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি এনজিওদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

কৃষি খাতের ব্যাপারে আমরা সরকারকে সবসময়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে দেখি। এবারও সরকারকে এ বিষয়ে সংবেদনশীল মনে হয়েছে। কৃষি খাতের বাজেটেও উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ৬ শতাংশ পর্যন্ত কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট খাতের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য অ্যালোকেশন রয়েছে। ভর্তুকি ৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু কৃষি খাতের সমস্যা হলো, তারা বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। যেমন ভর্তুকি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘাটতি থাকে। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি তারা ব্যবহার করতে পারেনি এবং ২০১৯ সালে ১২শ কোটি টাকার ঘাটতি ছিল। এক্ষেত্রে তাদের যে ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে, সেটা যেন কৃষি মন্ত্রণালয় উপযুক্তভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতা দেখায়, সেটাই এবার আমাদের প্রত্যাশা। এর বাইরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। সেগুলোও যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়। কেননা, আগামী অর্থবছরে কর্মসংস্থানের বিবেচনায় কৃষি খাত আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাইব, কৃষি খাতের জন্য ৯ হাজার কোটি টাকার যে ফান্ড রয়েছে, সেটি যেন দ্রুততম সময়ে কৃষক পর্যায়ে যায়। কৃষি খাত যেহেতু মৌসুমভিত্তিক, তাই মৌসুমের সময়ে এটি যেন কৃষকের কাছে যথার্থভাবে পৌঁছায়। কর্মসংস্থানের দিক থেকে আমরা দেখছি যে, এ খাতে যে মন্ত্রণালয়গুলো ভূমিকা রাখে, তার মধ্যে দুটি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার দুটি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের মধ্যে রয়েছে যুব মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু কমে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের মধ্যে রয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, সরকারের কর্মসংস্থানের ঘোষণা অনুয়ায়ী বরাদ্দ কমানো দুটি মন্ত্রণালয়ের এমন কিছু প্রকল্প রয়েছে যেগুলোর বাস্তবায়ন দরকার। আমরা বেশ কিছু প্রকল্প আইডেনটিফাই করেছি, যেগুলো বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যেমন, জামালপুরে ইকোনমিক জোন করা, ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার করা, টাঙ্গাইল এবং চুয়াডাঙ্গায় বিসিক শিল্পনগরী করা, মিরেরসরাইতে ইকোনমিক জোনের কাজ দ্রুততম সময়ে করা। এছাড়া মহিলাদের জন্য প্রকল্প রয়েছে, হ্যান্ডলুমের প্রকল্প রয়েছে, ড্রাইভিং সেন্টার করার প্রকল্প রয়েছে, দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থানের প্রকল্প রয়েছে এ প্রকল্পগুলো দ্রুততম সময়ে শেষ করা যায়। এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার বেশকিছু প্রকল্প নিয়েছে। সরকার বাজেটে ঘোষণা করেছে যে, এর মাধ্যমে ১২ ঘণ্টা কর্মঘণ্টার সুযোগ তৈরি হবে। এটি বেশ ইতিবাচক উদ্যোগ। এছাড়া বিদেশ থেকে প্রচুর শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। তাদের জন্য গ্রামাঞ্চলে এবং কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

সবশেষে আমরা বলতে চাই, রাজনৈতিকভাবে সরকারের কভিড মোকাবিলার আকাক্সক্ষা রয়েছে। কিন্তু যে বাজেট কাঠামো দিয়ে এটাকে মোকাবিলা করা দরকার, সে কাঠামোতে দুর্বলতা রয়েছে। সে দুর্বলতাগুলো দ্রুততম সময়ে কাটানো দরকার। সেদিক থেকে যে বাজেটটি প্রস্তাবিত হয়েছে, সে কাঠামোটি পুনর্বিবেচনা করা হলে ভালো হতো। লক্ষ্যগুলো যদি সুনির্দিষ্ট করা যায়, প্রাধিকারগুলো যদি সুচিন্তিত হয় এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে যদি আমরা আরও সাশ্রয়ী হতে পারি, সেটা আগামী বছরে আমরা প্রত্যাশা করব। মনে রাখতে হবে, আগামী অর্থবছরটি চ্যালেঞ্জিং এবং এ ধরনের সীমিত বাজেট দিয়ে জনগণের কাছে ফল পৌঁছিয়ে দেওয়ার দিকে সবাই তাকিয়ে থাকবে।

লেখকঃ গবেষণা পরিচালক, সিপিডি, [email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ