শেয়ার মার্কেটে স্টপ-লস ট্রেডিং স্ট্র্যাটেজীর প্রয়োগ

:: শফিকুল ইসলাম || প্রকাশ: ২০২০-০৭-২৫ ১০:০৬:৫৬ || আপডেট: ২০২০-০৭-২৫ ১০:২৯:৩৪

শেয়ার মার্কেটে লাভের উদ্দেশ্যেই মানুষ বিনিয়োগ করে। কম দামে কিনে তা বেশী দামে বিক্রি করা, বোনাস রাইট পেয়ে শেয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির সাহায্যে মোট ভ্যালু বাড়ানো এবং ডিভিডেন্ড প্রাপ্তিযোগ এসবের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী লাভবান হতে পারেন। তবে একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগ স্ট্র্যাটেজী সঠিক না হলে, ভূল শেয়ারে বিনিয়োগ করা হলে, সঠিক সময় ও সঠিক দামে কেনাবেঁচা না করতে পারলে লাভ করা যায় না। নানাবিধ ইন্টারনাল এক্সটার্নাল কারণে শেয়ার দাম পড়ে যেতে পারে যার ফলে লাভ তো দূরের কথা, মূল বিনিয়োগেই টান পড়ে। এটা এমন এক মার্কেট যেখানে টাকা হাওয়া হতে বেশী সময় লাগে না।
শেয়ারবাজার নামক মূদ্রার দু’টি পিঠ আছে। তা হলো Risk আর Reward; অর্থাৎ লাভের সম্ভাবনা যেমন বেশী লোকসানের ঝুঁকিও তত বেশী। তবে সব শেয়ারে ঝুঁকির মাত্রা যেমন একরকম নয়, তেমনি বিনিয়োগকারীর ট্রেডিং স্টাইল্ভেদে ঝুঁকির মাত্রাও হয় নানামূখী। একজন সর্ট টার্ম ট্রেডার যিনি শেয়ার ক্রয়ের অল্প ক’দিন পরেই তা বিক্রি করে দেন সে ঝুঁকি আর যিনি মৌলভিত্তির শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিনিয়োগ করে শেয়ার ধরে রাখেন তাদের দু’জনের ঝুঁকির মাত্রা নিশ্চয়ই একরকম নয়।

শেয়ার মার্কেটে ঝুঁকি বেশী সেটা সত্য। তবে সে ঝুঁকি কমানোর উপায়ও আছে। কম ঝুঁকিযুক্ত শেয়ার ক্রয়, সামান্য লাভেই বিক্রি করে দেয়া, মৌলভিত্তি শেয়ারে বিনিয়োগ, ইত্যাদি নানা উপায়ে তা করা যায়। তবে ঝুঁকি হ্রাসের মাধ্যমে নিজের মূলধন প্রটেকশনের অন্যতম যুৎসই ও কার্যকরী পন্থা হলো স্টপ-লস অর্ডার প্রয়োগ করা। দুঃখজনকভাবে বলতে হয় যে, বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের ট্রেডিং সিষ্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্রিম স্টপ-লস প্রাইস বসানোর সুযোগ নেই। আবার ঝুঁকি হ্রাসের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার বিরাট অভাব রয়েছে। এসব ঘাটতি না থাকলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বর্তমান যে অবস্থা তা কখনো হয়তো হতো না এবং মার্কেটও আজ অনেক বেশী Liquid & Vibrant থাকতো।

স্টপ-লস কিঃ যখন কোন শেয়ার ক্রয় বা বিক্রয়ের পরে তার দাম বৃদ্ধি বা হ্রাসের পরিবর্তে হ্রাস বা বৃদ্ধি পায় সে অবস্থায় মূলধন রক্ষার্থে কম লস দিয়ে ক্রয়মূল্যের নীচে বিক্রয় বা বিক্রয়মূল্যের উপরে ক্রয় করাই হলো স্টপ-লস ব্যবস্থা। এটা Sale স্টপ-লস বা Buy স্টপ-লস উভয়ই হতে পারে। অনেক দেশে, বিশেষতঃ উন্নত দেশসমূহে সর্ট সেল (Short Sale) ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। সর্ট সেল হলো নিজের কাছে শেয়ার না থাকা সত্বেও আগামীতে শেয়ারের দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বিনিয়োগকারী কর্তৃক এখনকার বাজার মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে পরবর্তীতে বাজার মূল্যে সমপরিমাণ শেয়ার কিনে তা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা। আগামীতে শেয়ার দাম না কমে বরং বাড়লে বিনিয়োগকারীকে সেক্ষেত্রে বেশী দামে কিনে শেয়ার ফেরত দিতে হয়। তখন তার লস হবে এবং সে লস সীমিত রাখতে তাকে Buy স্টপ-লস করতে হয়। আমাদের দেশে যেহেতু সর্ট সেল ব্যবস্থার অনুমোদন নেই, তাই Buy স্টপ-লস ধারনাটিও অপ্রাসংগিক। এখানে শুধুমাত্র Sale স্টপ-লস প্রযোজ্য।

স্টপ-লস কেন প্রয়োজনঃ ক্রয়ক্রকৃত শেয়ারের দাম না বেড়ে তা কমতে থাকলে বিনিয়োগকারী্র মূলধনও ক্রমশঃ নিঃশেষ হতে থাকে। দাম আরও কত কমবে তা কারোরই জানা নেই। যদি ক্রমশঃ কমতেই থাকে তবে একসময় মূল্ধন প্রায় শেষ হয়ে যাবে। সেরুপ অবস্থা যাতে না হয় সেজন্য কিছু লস দিয়ে হলেও মূলধন রক্ষা করতে স্টপ-লস সেল অবলম্বনের বিকল্প নেই। স্টপ-লস পন্থা অবলম্বন করে মূল্ধন রক্ষা করে অন্য কোন ট্রেড থেকে হয়তো লাভ করে সে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়।

Sale স্টপ-লসের একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন, আপনার মূল্ধন আছে মোট ১০০০০ টাকা এবং তা দিয়ে কোন কোম্পানীর ৫০ টাকা দামের মোট ২০০টি শেয়ার কিনলেন। দেখা গেল যে ক্রয়ের কয়েকদিনের মধ্যে শেয়ারটির দাম না বেড়ে বরং কমে ৪৫ টাকা হয়ে গেল। আরও দাম কমে যেতে পারে সে আশংকায় আপনি Sale স্টপ-লস করলেন বাজার দর ৪৫ টাকায়। এতে আপনার মোট লস হলো ১০০০ টাকা। পরবর্তীতে শেয়ারটার দাম আরও কমে ৪০ টাকা হলো। দাম আর কমার আশংকা নেই ভেবে আপনি আবার সেই একই শেয়ার কিনলেন আপনার হাতে থাকা ৯০০০ টাকা দিয়ে। ৪০ টাকা দরে পেলেন মোট ২২৫টি শেয়ার। সেটার দাম বেড়ে যখন ৪৫ টাকা হলো তখন আপনি তা বিক্রয় করে পেলেন মোট ১০১২৫ টাকা। ধ্রুন, আপনার ট্রেডিং কমিশন লাগলো ১০০ টাকা। এতে করে আপনার শেয়ারের বর্তমান দাম ৪৫ টাকা অরিজিনালি ক্রয়কৃত দাম ৫০ টাকার চেয়ে কম হওয়া সত্বেও আপনার লস তো হলোই না বরং কিছু টাকা লাভ হলো। যদি আপনি স্টপ-লস না করতেন এবং শেয়ার ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত ৪৫ টাকা দরেই বিক্রি করতে বাধ্য হতেন তাহলে আপনার মোট লস হতো কমিশনসহ প্রায় ১১০০ টাকা।

শেয়ার মার্কেট সম্পর্কে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। তাহলো -Biggest enemy is myself। লোকসান করার জন্য দায়ী মার্কেট সিষ্টেম নয় বা অন্য কেউ নয় বরং নিজের মানসিকতা, যে কারণে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া ও যথাসময়ে তা কার্যকরী করা সম্ভব হয় না। মার্কেট ট্রেন্ড যাই হোক না কেন, কেনা দামের নিচে কোনক্রমেই শেয়ার না বিক্রির প্রবণতা এদেশের শেয়ার মার্কেটের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বৃহ- অংশের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা আশায় আশায় থাকেন যে অচিরেই দাম বেড়ে অন্ততঃ তাঁদের ক্রয়মূল্যের সমান বা বেশী হবে আর তখন তাঁরা বিক্রি করে বের হয়ে যেতে পারবেন। বাস্তবে শেয়ার মার্কেট হলো নির্দয় আবেগহীন এক জায়গার নাম। সেখানে কারো ব্যক্তিগত ভাবাবেগেরে এক পয়সা দাম নেই। কে তাঁর মূল্ধনের সবটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হলো আর কে রাতারাতি ধনী হয়ে গেল এসবে বাজার কোন্রুপ ভ্রক্ষেপ করে না। সেরুপ বাস্তবতা মাথায় রেখেই সাধারন বিনিয়োগকারীদের উচিত নিজ মূলধন নিজেই রক্ষা করার স্ট্র্যাটেজী গ্রহণ করা। আর সেজন্যই তাঁদের দরকার শেয়ার ট্রেডিংয়ে আবশ্যিকভাবে স্টপ-লস কার্যকর করা। এ ব্যবস্থা অবলম্বনে বড় বাধা হচ্ছে মানসিক। কারণ লস মেনে নেয়া কঠিন কাজ। নিজের লাগানো গাছের ডালপালা কাটতে যেমন মন চায় না, লসে শেয়ার বেচতেও তেমন কারোরই মন টানে না। কিন্ত গাছের ডালপালা না ছাটলে যেমন ভাল ফলন পাওয়া যাবে না, তেমনি স্টপ-লস ছাড়াও শেয়ার মার্কেটে টিকে থাকা যাবে না। তবে যারা মৌল্ভিত্তির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে পারেন তাদের হিসাব ভিন্ন।

স্টপ-লস অর্ডারের রকমভেদঃ শেয়ার মার্কেটে স্টপ-লস অর্ডারকে মূলতঃ দু’ভাগে প্রয়োগ করা যায়। একটি হলো মার্কেট অর্ডার, আরেকটি লিমিট অর্ডার। দু’টো টাইপের মধ্যে প্রভেদ রয়েছে। স্টপ-লস মার্কেট অর্ডার দিলে শেয়ারের দাম নির্ধারিত দামে আসামাত্রই অথবা ঐ দামে ক্রেতা না পেলে তার নীচে যে দাম পাওয়া যায় তাতেই বিক্রির মাধ্যমে অর্ডার বাস্তবায়ন করা হয়। আর স্টপ-লস লিমিট অর্ডার এর ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামে ক্রেতা পাওয়া গেলেই শুধুমাত্র শেয়ার বিক্রি করার সুযোগ থাকে। এ দুই ব্যবস্থারই ভাল মন্দ উভয় দিক রয়েছে। মার্কেট অর্ডারে শেয়ার বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার মোটামুটি নিশ্চয়তা থাকে। তবে একেবারেই শেয়ারের ক্রেতা নেই এমন অবস্থা হলে সেটা ভিন্ন কথা। আর লিমিট অর্ডারের ক্ষেত্রে বেধে দেয়া দর প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকলেও ঐ দামে বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। দাম দ্রুতই পড়ে গেলে তা আদৌ বিক্রি না হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। আর মার্কেট বা সংশ্লিষ্ট শেয়ারের দাম বেশী Volatile ধরনের হলে অনেক ক্ষেত্রে লিমিট অর্ডার অধিকতর উপযোগী হতে পারে। কারণ সেক্ষেত্রে দাম সাময়িকভাবে লিমিট দরের নীচে নেমে গেলেও তা আবার বেড়ে নির্ধারিত দর স্পর্শ করতে পারে, যদিও তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

আপনার ক্রয়কৃত শেয়ার দরের কত নীচে স্টপ-লস করবেন সেটা নির্ভর করবে সম্পূর্ণভাবে আপনার আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি গ্রহনের মানসিকতা, শেয়ার ব্যবসায় আপনার অভিজ্ঞতা, ইত্যাদি নানা ফ্যাক্টরের উপর। তবে এটুকু বলা যায় যে, শেয়ার দর ক্রমাগতভাবে বাড়ে কিংবা কমে না। সাধারনভাবে দর কিছুটা বেড়ে তা সামান্য কমে; তারপর আবার তা বাড়া শুরু করে। সেটাকে প্রাইস কারেকশন বলা হয়। সে কারণেই ক্রয় দামের অতি কাছাকাছি স্টপ-লস প্রাইস নির্ধারণ করা হলে দামের সামান্য কারেকশনেই তা স্পর্শ করতে পারে যেক্ষেত্রে অচিরেই সম্ভাব্য দামবৃদ্ধির সুযোগ হাতছাড়া হবে। আবার ক্রয়দামের অনেক নীচে স্টপ-লস করা হলে প্রতিটি ট্রেড ট্রানজেকশনে লসের পরিমাণ বাড়বে। তখন বিনিয়োগকারী যদি সেরকম বেশ কয়েকটা লস করে তবে তার মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। সে কারণে বিনিয়োগকারীকে তার নিজ অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত স্টপ-লস দাম ঠিক করাই হবে যৌক্তিক স্ট্র্যাটেজী।

কিভাবে স্টপ-লস কার্যকর করবেনঃ অনেক উন্নত দেশের ট্রেডিং প্লাটফর্মে শেয়ার ক্রয়ের সময়কালেই স্টপ-লস মার্কেট বা লিমিট অর্ডার বসানোর সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে মার্কেট প্রাইস স্টপ-লস প্রাইসে আসার পরে তা কার্যকর হয়। কিন্ত বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে অদ্যাবধি সে ব্যবস্থার সুযোগ নেই। তাই আপনার ব্রোকার এজেন্টকে অগ্রীম বলে রাখতে পারেন যেন তিনি নির্ধারিত দরে মার্কেট নেমে আসার পর আপনার শেয়ারটি বিক্রি করে দেন। বিকল্প হিসাবে আপনিও আপনার ক্রয়কৃত শেয়ারের দামের গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারেন এবং দাম স্টপ-লসের কাছে নেমে আসলে তা বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে পারেন।

পরিশেষে বলা যায় যে শেয়ার মার্কেটে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্টপ-লস সম্পর্কে সঠিক ধারনা লাভ করা এবং তা যথাযথভাবে প্রয়োগের কৌশল জানা একান্তভাবে আবশ্যক। সে ধারনা যত নির্মোহভাবে প্রয়োগ করা যাবে ততই তা বিনিয়োগকারীর জন্য সহায়ক হয়ে উঠবে।

লেখক: শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল)

Email: [email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ