আজারবাইজানের সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থায় নিজ দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে আর্মেনিয়া। বুধবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে এ বাস্তবতা স্বীকার করেন আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান। তিনি বলেন, আর্মেনিয়ার 'বহু হতাহত' হয়েছে। তবে এখনও সেনাবাহিনী এখনও কারাবাখের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।
নিকোল পাশিনিয়ান বলেন, ‘আমি আমাদের সব ভুক্তভোগী, শহীদ, তাদের পরিবার, অভিভাবক, বিশেষ করে শহীদদের মায়েদের উদ্দেশ্যে বিনম্র চিত্তে সম্মান জানাই। তাদের এই ক্ষতিকে আমি আমার ও আমার পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার জানা প্রয়োজন যে, আমরা একটা কঠিন পরিস্থিতি পার করছি।’
নিকোল পাশিনিয়ান বলেন, ‘জনশক্তি ও উপকরণের ক্ষয়ক্ষতি হলেও আর্মেনিয়ার সেনারা এখনও নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। তারা প্রতিপক্ষের জনশক্তি ও উপকরণের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জয়ী হতেই হবে, আমাদের বেঁচে থাকতেই হবে। আমাদের নিজেদের ইতিহাস তৈরি করতে হবে। আর আমরা এরই মধ্যে ইতিহাস তৈরি করছি। তৈরি করছি আমাদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের গল্প, আমাদের মহাকাব্য।’
কী হচ্ছে ওই অঞ্চলে?
আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ অভিযোগ তুলেছেন, আর্মেনিয়া তাদের গ্যাস ও তেলের পাইপ লাইনে আক্রমণ করেছে। তুরস্কের প্রচার মাধ্যম হেবারতুর্ক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আর্মেনিয়া আমাদের পাইপলাইন আক্রমণ করে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তার যদি এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।’
এদিকে মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে আজারবাইজানের সঙ্গে তার দেশের চলমান সংঘাতের জন্য তুরস্ককে দায়ী করেন আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী। রয়টার্সকে তিনি বলেন, তার বিশ্বাস তুরস্ক অবস্থান বদলালেই আজারবাইজান কারাবাখে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করবে।
নিকোল পাশিনিয়ান বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তুরস্কের অবস্থান পরিবর্তন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আজারবাইজান থামবে না। তারা সংঘাত থামাবে না।
তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির আলোচনার আগেই তুরস্ক প্রকাশ্যে আজারবাইজানকে সমর্থন দিয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, তারা আজারবাইজানকে লড়াই চালিয়ে যেতে বলছে। চুক্তির পরও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজেরি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করেছেন।
অন্যদিকে, তুরস্ক হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেছে, প্রতিবেশী আজারবাইজানের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার মূল্য দিতে হবে আর্মেনিয়াকে।
নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের পুরনো সংঘাত গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে আবার শুরু হয়। গত কয়েক দিনের সংঘাতে ৩ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। রুশ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে দুই পক্ষ মস্কোতে অস্ত্রবিরতির আলোচনায় সম্মত হয়। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরপরই উভয় দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
তুরস্কের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির নতুন শিক্ষাবর্ষ উদ্বোধনের সময় এ নিয়ে কথা বলেন তুর্কি প্রতরিক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার। তিনি বলেন, তুরস্কের মিত্র আজারবাইজানের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে আর্মেনিয়া। এটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, আর্মেনিয়া হামলা অব্যাহত রেখেছে। এসবের জন্য একদিন তাদের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ বলেছেন, নাগরনো-কারাবাখ নিয়ে শান্তি আলোচনার উদ্যোগে তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, সংঘাতে মধ্যস্থতার জন্য ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত মিনস্ক গোষ্ঠী নিরপেক্ষ নয়। সিরিয়া, লিবিয়া ও আন্তর্জাতিক সংঘাতে জড়িত বৈশ্বিক শক্তি তুরস্ককে এই সমাধান প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
উল্লেখ্য, সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর সামরিক জোটের সদস্য আর্মেনিয়া, যার নেতৃত্বে রয়েছে রাশিয়া। আবার আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্ক। তুর্কি ও আজেরি রাজনীতিকরা দুই দেশের সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে একটি বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। এটি হচ্ছে, ‘এক জাতি, দুই দেশ।’ দুই দেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মিল রয়েছে। সূত্র: বিবিসি।
সানবিডি/এনজে/৪:৫৪/১০.১৫.২০২০