কাজ আদায় করিয়ে নেয়ায় সাফল্যের শীর্ষে গুগলের সিইও
নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২০-১১-০১ ১২:৫৫:৫৩

নাজমুল ইসলাম: বর্তমানে গুগলের সিইও ৪৩ বছরের সুন্দর পিচাই ছিলেন ভারতের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আজকের দুনিয়াতে বিখ্যাত এ প্রযুক্তিবিদের হাতে তার বাবা-মা কিন্তু ১২ বছর বয়স অবধি কোন মোবাইল ফোন তুলে দেননি। ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন একজন ক্রিকেট পাগল মানুষ।
দেশটির যে প্রতিষ্ঠানের কৃতি স্নাতক ছিলেন, সেটিও বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গ থেকে মাত্র কয়েকশ’ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকেই উঠে এসে বনে গেলেন বিশ্বের অন্যতম কর্পোরেট অধীশ্বর। এ যেন বিশ্বজয়ের মতোই।
১৯৭২ সালের ১২ জুলাই দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন সুন্দর পিচাই। তার পুরো নাম পিচাই সুন্দররাজন হলেও সুন্দর পিচাই নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। তার বাবা রঘুনাথ পিচাই একটি ব্রিটিশ সংস্থায় বিদ্যুৎ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। অন্যদিকে তার জন্মের পূর্বে মা লক্ষ্মী পিচাই ছিলেন একজন শ্রুতিলেখক। ছোট এ সংসারে পিচাইয়ের অপর সঙ্গী ছিলো তার ছোট ভাই।
চেন্নাইয়ের জহর বিদ্যালয়ে শিক্ষার হাতেখড়ির দিন কাটবার পর তিনি ভর্তি হন পদ্ম সেশদ্রি বালা ভবনে। সেখান থেকে অসাধারণ কৃতিত্বের সাথেসঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন সুন্দর।
জয়েন্ট এন্ট্রান্সে তুখোড় ফলাফল করে তিনি সুযোগ পান ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ আইআইটি খড়গপুরে। সেখানে মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বি.টেক করবার সুযোগ পান তিনি। আইআইটিতে ভর্তির আগেই সফটওয়্যার তৈরিতে ঝোঁক ছিলো সুন্দরের। তার বানানো প্রথম সফটওয়্যারটি ছিলো একটি দাবার গেমের অ্যাপ্লিকেশন। ব্যাচেলরের পাঠ চুকিয়ে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার বৃত্তি পেলেন সুন্দর।
যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছিলেন একটা সুপ্ত বাসনা থেকে, তা হলো ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযুক্তি-স্বর্গ সিলিকন ভ্যালিকে তিনি পেতে চান নিজ কর্মস্থল হিসেবে। সেই স্বপ্নের দেশের ক্যালিফোর্নিয়ায় জিনিসপত্রের দাম দেখে তার মাথা খারাপ হবার যোগাড়। ব্যাগপ্যাকের দাম কিনা ৬০ ডলার (বাংলাদেশী প্রায় ৫ হাজার টাকা)! ওদিকে ৬ মাস কথা বলতে না পেরে বান্ধবী অঞ্জলিকেও প্রচণ্ড মিস করছিলেন তিনি। যাই হোক, শেষমেশ ভর্তি হলেন স্ট্যানফোর্ডে।
সুন্দরের অধ্যাপক তাকে পিএইচডির জন্য সুপারিশ করলেও সুন্দর পিএইচডি না করে সেখান থেকে ধাতব বিজ্ঞান ও অর্ধপরিবাহী পদার্থবিজ্ঞানের ওপর মাস্টার্স করলেন।
এবার পিএইচডি করতে এসে ড্রপ-আউট হলেন সুন্দর। তারপর সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাপ্লাইড ম্যাটিরিয়ালস নামে একটি অর্ধপরিবাহী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী ও প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি নেন। বেশিদিন অবশ্য সেখানে টেকেননি সুন্দর। ওদিকে এমএস করতে আমেরিকায় হাজির হয়ে গেলেন সুন্দরের প্রেমিকা অঞ্জলি। তখনই বিয়েটা সেরে নিয়েছিলেন তারা।
২০০৪-এ গুগলপ্লেক্সে তিনি যেদিন প্রথম ইন্টারভিউ দিতে এলেন, দিনটি ছিলো একটু উদ্ভট- এপ্রিল ফুল দিবস! কাকতালীয়ভাবে সেদিনই জিমেইল চালু করে গুগল। সেদিন তিনিসহ অন্যান্য চাকরিপ্রার্থীরাও ভেবেছিলেন মার খেতে যাচ্ছে গুগলের এই প্রজেক্ট! প্রথম দফাতেই চাকরিটা হয়ে গেলো তার। গুগলের সার্চ টুলবার নিয়ে কাজ করবার জন্য গঠনকৃত ছোট একটি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হলে সেখানেই গুগল-যজ্ঞে অভিষেক ঘটে সুন্দর পিচাইয়ের।
টুলবারের গুরুত্বে ২০০৬ সালে হঠাৎ করেই বাধ সাধলো মাইক্রোসফট। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারে ডিফল্ট করে দেওয়া হলো বিং-কে। তখন নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য নেতিবাচক এ পরিবর্তনের কার্যকরী ফলাফল প্রশমিত করতে কম্পিউটার নির্মাতাদের তিনি সম্মত করলেন তাদের হার্ডওয়্যারে টুলবার প্রি-ইনস্টল করতে। ফিরে এলো টুলবারের রাজত্ব।
গুগলের সার্চ টুলবারের সাফল্যই ছিলো সুন্দর পিচাইয়ের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া মুহূর্ত। কেননা এর মাধ্যমেই তিনি গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সার্গেই ব্রিনকে হাত করে ফেলেন। ফলস্বরূপ, সুন্দর কর্তৃক গুগলের নিজস্ব ব্রাউজার তৈরির পরিকল্পনায় সায় দিয়ে দেন তারা। ব্যস, ২০০৮ সালে চলে এলো ‘গুগল ক্রোম’। অল্প সময়েই মাইক্রোসফটের ইন্টারনেট ইক্সপ্লোরার ও মজিলা ফায়ারফক্সকে ছাপিয়ে ব্রাউজারের দুনিয়ায় একক আধিপত্য কায়েম করে ক্রোম।
এর ধারায় পরবর্তীতে ক্রোম সিরিজ হিসেবে বাজারে আসে ক্রোম ওএস, ক্রোমবুকস ও ক্রোমকাস্ট। ক্রোমের কৃতিত্বের পুরস্কারস্বরূপ সে বছরই পণ্যোন্নয়ন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন সুন্দর। চার বছরের মাথায় ক্রোম ও অ্যাপ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট বনে যান তিনি।
২০১৩ এর গোড়ায় অ্যান্ড্রয়েডের জনক ও প্রধান অ্যান্ডি রুবিন কর্মস্থল ছাড়লে ল্যারি পেজ সুন্দর পিচাইকে তার স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করেন। ল্যারি পেজের দূরদৃষ্টি সবথেকে ভালো পড়তে পারতেন সুন্দর পিচাই-ই। গুগলের প্রতি দায়িত্বে তিনি এতটাই নিষ্ঠাবান ছিলেন যে, টুইটার কর্তৃক একাধিকবার ‘লোভনীয়’ সুযোগ হাসিমুখেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। সফলতা ও সততার প্রতিদানস্বরূপ ২০১৪ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে ল্যারি পেজের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড, অর্থাৎ গুগলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ ‘প্রোডাক্ট চিফ’ পদে অধিষ্ঠিত হন সুন্দর।
২০১৬-তে তার নির্ধারিত মাসিক বেতন ছিলো সাড়ে ৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী টাকায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এর বাইরেও তহবিল, লভ্যাংশসহ নানা খাত থেকে প্রতি মাসে আরও মোটা অঙ্কই আয় করেন সুন্দর। ২০১৬ সালে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিলো ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসব তথ্যই ২০১৭-তে প্রকাশিত এবং তা ২০১৬ এর আয়ের ওপর হিসাব করা হয়েছে।
সুন্দর নিজেই স্বীকার করেন, কেবল মেধার জোরে কখনও এতদূর আসেননি তিনি। গুগলে তার চেয়েও তুখোড় মেধাবী অনেকেই রয়েছেন, কিন্তু মানুষের মন বুঝতে পারা, কাজ আদায় করিয়ে নেয়ায় পারদর্শিতাই তাকে সাফল্যের শীর্ষে তুলে এনেছে।
সানবিডি/এন আই/১২:৫৩/০১.১১.২০২০







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













