উত্তরঞ্চলের নিভৃত জনপদ দিনাজপুর।এই জেলার কাহারোল থানার দশমাইলের বাসিন্দা আকবর আলী।অক্লান্ত পরিশ্রম ও দুর্ণিবার প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার।মাষ্টার্স শেষ করার পর এই ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে নিজের হতাশা গ্রস্ত জীবনকে পেছনে ফেলে বর্তমানে একজন সফল উদ্যোক্তা তিনি।এলাকার শত শত যুবককে কম্পিউটার ট্রেনিং দেয়ার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।এই উদ্যোগকে সফল করার জন্য তিনি ‘বর্ষা কম্পিউটার এন্ড ট্রেনিং সেন্টার’ নামে একটি পেজ তৈরি করেছেন।
উদ্যোক্তা জীবনে আসার গল্পটা শুনতে চাইলে আকবার আলী সানবিডি প্রতিনিধিকে জানান,পারিবারিকভা্বে চরম অস্বচ্ছলতার কারনে পড়ালেখা চালানো ছিল অত্যন্ত দুরুহ।পড়ালেখা চালিয়ে যেতে অনার্স প্রথম বর্ষেই নেমে পড়েন উপার্জনের আশায়।সেই লক্ষ্যে প্রথমত বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পুরাতন মোবাইল সংগ্রহ করে তা বিক্রির মাধ্যমে যে আয় হতো সেটা দিয়ে পড়ালখা চালানোর কাজ শুরু হয়।এই উপার্জন পড়ালেখা চালানের জন্য যথেষ্ট ছিলো না।তাছাড়া সাংসারিক অনটন তো ছিলোই।
তিনি আরো বলেন,অনার্স ২য় বর্ষে থাকাকালীন তার বাবা মারা যান।এতে সাংসারিক অনটন আরো চরম পর্যায়ে পৌঁছে।সে সময় দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডে চাকুরীর জন্য একলাখ বিশ হাজার টাকা জমা দেন।তবে সে চাকুরীটি হয়নি এবং টাকাও ফেরত পাননি।বাসা থেকে চাকুরীর জন্য টাকা নিয়ে চাকুরী না হওয়ার কারণে পারিবারিকভাবে চরম অপমান এবং লাঞ্ছণার শিকার হন।
তিনি সানবিডি প্রতিনিধিকে জানান,সে সময় কোন উপায় না দেখে কাহারোলে উপজেলার দশমাইল মোড়ে কোনোরকমে একটি কম্পিউটার ক্রয় করে মেমোরি লোডের কাজ শুরু করেন।দীর্ঘ দুই বছর শুধু মেমোরি লোডের মাধ্যমে যা ইনকাম হতো তা দিয়ে্ই নিজের চলাফেরার খরচ বহন করেন।এই ইনকামের পরিমাণ ছিলো খুবই নগণ্য।এরপর তিনি মুনাফার উপরে কিছু টাকা নিয়ে একটি প্রিন্টার এবং একটি ক্যামেরা কিনেন।তবে এলাকাটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় ইনকাম খুব ভাল হত।সে সময় তিনি দোকানটি দেখাশোনার জন্য একজন কর্মচারী রাখেন।সেই কর্মচারী আকবর আলীর অনুপস্থিতিরি সুযোগে দোকানের মালামাল সহ নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।এ ঘটনায় তিনি পুরো নি:স্ব হয়ে পড়েন।সে সময় তার মা মারা যান।
জানতে চাইলে আকবর আলী বলেন,পুরোপুরি নি:স্ব হওয়ার পরেও তিনি হাল ছাড়েননি।নতুন স্বপ্ন নিয়ে নতুন উদ্যেমে আবার পথচলা শুরু করেন।সফলতার লক্ষ্যে তিনি তার নামের কিছু জমি বন্ধক রাখেন এবং সেই টাকা দিয়ে একটি কম্পিউটার ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনেন্।পুনরায় তিনি দোকানটি চালু করেন। সে সময় দোকানটি বড় করার জন্য লোন নেওয়ার চেষ্টা করেন তবে কোথাও তিনি সে সহযোগিতা পাননি।পুনরায় তিনি কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকুরীর প্রস্তাব পান এবং সেই চাকুরীটি পাওয়ার লক্ষ্যে পনেরো শতক জমি বিক্রি করেন।জমি বিক্রি করা টাকা চাকুরীর জন্য জমা দেন।চাকুরীতে যোগদানের পনেরো দিন পরে দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে চাকুরীটি চলে যায়।চাকুরীর সাথে পুরো টাকা দালালরা আত্নসাৎ করে।
আকবর আলী বলেন,এরপর তিনি সকল ধরনের চাকুরীর আশা ত্যাগ করে নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন উদ্যেমে কাজ শুরু করেন।কম্পিউটার সর্ম্পকে ভালো ধারণা থাকায় তিনি দুটো কম্পিউটার নিয়ে সাধারণ ছাত্রদেরকে স্বল্প খরচে প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করেন।এ কাজ শুরুর পর তিনি খুব ভালো সাড়া পান।অনেক ছাত্র ট্রেনিং উদ্দ্যোশে তার কাছে আসতে থাকে।তবে কম্পিউটার কম থাকায় তিনি অনেক ছাত্র ভর্তি নিতে অসমর্থ হন।সে সময় বাংলাদেশ ডাকবিভাগ কর্তৃক পরিচালিত পোস্ট-ই সেন্টারের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য আবেদন করেন।তার আবেদন গ্রহণ করা হয়।এরপর তিনি পোস্ট-ই সেন্টার থেকে দুইটি ল্যাপটপ পান।এরপর তিনি কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সরকারি সার্টিফিকেট প্রদানের অনুমতি প্রাপ্ত হন।যা বাংলাদেশ ডাকবিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত। এবার তার জীবনের হতাশার মেঘ কেটে সফলতার আলোকচ্ছটা দেখা দেয়।
জানতে চাইলে আকবর আলী বলেন,বর্তমানে তার প্রশিক্ষণ সেন্টারের কম্পিউটার ল্যাবে ১৪ টি কম্পিউটার আছে।তিনি এখানে সকল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেন।তার এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে।তার সেন্টারে প্রতি সেশনে প্রায় ৭০ থেকে ৯০ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিয়ে বের হন।এছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবীর লোকজন তার কাছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেন।এখন তার মাসিক ইনকাম ৩০ হাজারের উপরে।
আকবর আলী বলেন,২০১৬ সাল থেকে তিনি এখন পযর্ন্ত দিনাজপুর জেলার ডিজিটাল ই-পোস্ট সেন্টারের শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথম স্থান দখল করে আছেন।এক্ষেত্রে তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন ডেপুটি পো্স্ট মাস্টার জেনারেল দিনাজপুর(ডিপিএমজি)মো:আজাদ আল শামস।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষন সেন্টারটিকে তিনি একটি আইটি ফার্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চান এবং বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।তিনি দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে চান।তার এই উদ্যোগের সীমাবদ্ধতাগুলো দুর করে ট্রেনিং সেন্টারের উন্নয়নকল্পে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।
সানবিডি/এনজে