

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, শিক্ষকরা না বুঝে আন্দোলন করছেন। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি শিক্ষকরা পে স্কেলের কোন বিষয়গুলো বোঝেননি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যে সব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে তা ঘোষিত অষ্টম পে স্কেলে অনুপস্থিত রয়েছে।
যে বিষয়গুলো পে স্কেলে নেই সেই বিষয়গুলো কিভাবে শিক্ষকরা বুঝবেন সেই বিষয়টি বুঝিয়ে বলার জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি। তিনি যদি প্রমাণ করতে পারেন, শিক্ষকরা যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছেন এবং যা যৌক্তিক বিবেচনায় মন্ত্রী পরিষদের অনেক সদস্য বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পে স্কেলে রয়েছে।
তাহলে আমাদের শিক্ষক নেতাদের অজ্ঞতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা জাতির কাছে করজোরে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন সেই প্রতিশ্রুতি প্রদান করছি। আর যদি তিনি প্রমাণে ব্যর্থ হন তাহলে আমরা সাবেক স্বৈরশাসক হুসেন মুহাম্মদ এরশাদের এক সময়ের সহযোগী এই সাবেক আমলাকে আর এক মূহুর্তের জন্যও অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই না।
ইতোপূর্বে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ‘জ্ঞানের অভাব রয়েছে’ এমন অভিযোগ উত্থাপন করে পরে ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে পার পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার কোনো ক্ষমা প্রার্থনা নয়, পে স্কেল নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্তি করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়ে অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান করায় অনতিবিলম্বে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি।
অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সরকারের কাছে দয়া ভিক্ষা করছেন! অবশ্যই প্রথম থেকে শিক্ষকদের দাবি দাওয়া নিয়ে শিক্ষক ফেডারেশনের শীর্ষ নেতাদের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র আন্দোলনই এর জন্য দায়ী।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছেন এবং তারা আমলা বা অন্যকারোর সাথে নিজেদের তুলনা করতে চান না। তাদের একমাত্র চাওয়া সরকার প্রতিশ্রুত স্বতন্ত্র পে স্কেল বাস্তবায়ণ। কিন্তু প্রথম থেকেই দেখেছি, শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের আন্দোলন ও বক্তৃতা বিবৃতির মধ্যে এক ধরণের গোঁজামিল রয়েছে। তারা একদিকে বলছেন, আমরা আমলা বা অন্য কারোর সাথে নিজেদের তুলনা করতে চাই না।
অন্যদিকে আবার তারা স্বতন্ত্র পে স্কেলের দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে ‘ঝেড়ে কাশতে’ পারেননি। ফলে সরকার শিক্ষক নেতাদের এ অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েছে। সরকার আমলাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের তুলনা করেই অষ্টম পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ করেছে। মাননীয় প্রধাণমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতা-বিবৃতিতেও সেই তুলনা এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তাই একজন তরুণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের কাছে বিনীতভাবে বলতে চাই, অষ্টম পে স্কেলে কি বৈষম্য আছে তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে স্কেলের দাবি উত্থাপণ করুন। অন্যথায় অষ্টম পে স্কেলের ছকে বন্দী থেকে কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্ন রাখা সম্ভব হবে না।
আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে স্কেলের দাবি নতুন কোনো বিষয় নয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারই একাধিকবার এমন প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। ‘সংকটমোচন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আওয়ামী লীগের রূপকল্প ২০২১ সাল কেমন বাংলাদেশ দেখতে চাই’ শীর্ষক প্রবন্ধে ‘শিক্ষা’ উপ-শিরোনামে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে স্কেল প্রণয়ণের বিষয়টি বলা হয়েছে।
প্রবন্ধটিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে: ‘২০১৪ সালে নিরক্ষরতা সম্পূর্ণ দূর, শিক্ষার মানোন্নয়ণে, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং শিক্ষকদের উচ্চতর বেতন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে’ (‘ভিশন ২০২১’, ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা: ২০০৯, পৃ. ৫১)। ২০০৮ ও ১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ও জাতীয় শিক্ষানীতিতেও ওই ধরণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ণের লক্ষ্যে স্থায়ী পে-কমিশন, শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বতন্ত্র কমিশন গঠন ও সম্মানজনক সম্মানী প্রদানের কথা বলা হয়। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতেও বলা হয়েছে: “আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে” (পৃ. ৫৮)। শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের এখন উচিত হবে সব কিছু ভুলে জাতির সামনে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেয়া প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা এবং সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ণের লক্ষ্যে আন্দোলন করা।
অবশ্য শিক্ষক নেতারা কতটুকু তা পারবেন তা নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে! কারণ সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়ণের জন্য শেষপর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হতে পারে। কিন্তু দলীয় রাজনীতির শিকলে বন্দী শিক্ষক নেতাদের পক্ষে কি আদৌও তা সম্ভব হবে!
দুই.
বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আর একটি প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালোভাবে উত্থাপিত হচ্ছে: ইতোপূর্বে যে অর্থমন্ত্রী তার অশালীন বক্তৃতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, সেই অর্থমন্ত্রী আবারও কি করে শিক্ষকদের হেয় প্রতিপন্ন করে বক্তব্য প্রদান করেন? অবশ্যই গত কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায় পাতায় ঘুরাঘুরি করা একটি ছবির মধ্যেই এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে।অর্থমন্ত্রীর সাথে শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের সেলফি উৎসবই সেই সাহসের প্রধান উৎস।
অর্থমন্ত্রীর সাথে শিক্ষক নেতাদের সেলফির ছবিটি পোষ্ট করে সালেহ হাসান নকিব নামে এক শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, “বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একটি মারাত্মক জিনিস। কে দাস আর কে প্রভু তা সুস্পষ্ট। আবুল মালের বেপরোয়া বক্তব্যের উৎসটি এখানেই। পরোয়া করে না, কারণ পরোয়া করবার প্রয়োজন নেই।” নকিব কি সত্যি ভুল লিখেছেন? সেদিন যদি শিক্ষক নেতারা সেলফি উৎসবে না মেতে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে পারতেন তাহলে হয়ত অর্থমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং নতুন করে শিক্ষকদের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য প্রদানে সাহস করতেন না। আমরা চাইব আগামী দিনে আমাদের শিক্ষক নেতারা আর সেলফি উৎসবে না মেতে দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার সাথে দাবি আদায় করেই তবে ঘরে ফিরবেন।
তিন
আন্দোলনের ধীর গতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরণের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ করছেন যে, শিক্ষক ফেডারেশনের নেতারা সাধারণ শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে নিজের আগামী দিনের ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বলেই আন্দোলনের এমন ধীর গতি।
অব্যশই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষক রাজনীতি করেন তাদের শেষ জীবনে স্বপ্ন থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন। তাই কোনো শিক্ষক নেতাই চাইবেন না তার নেতৃত্বে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক যাতে তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে যাক। আমরা শিক্ষক নেতাদের এ চাওয়াকে ধুলিসাৎ করতে চাই না। অথবা আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে কেউ নতুন কোনো সংকটের সৃষ্টি করুক সেটিও চাই না।
কিন্তু প্রশ্ন রাখতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়াই কি শিক্ষক জীবনের সার্থকতা! একবার কি ভেবে দেখবেন ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ২৭ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদ অলঙ্কৃত করেছেন। কয়জনকে এদেশের মানুষ মেনে রেখেছে! এমনকি ঢাবির ছাত্ররাই বা কয়জনের নাম জানে? আর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। শিক্ষক নেতাদের সেই বিষয়টি ভাবার জন্যও অনুরোধ করছি।
পরিশেষে, শিক্ষক নেতাদের নিকট বিনীত অনুরোধ দয়া করে সময় থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করুন। আর সাধারণ শিক্ষকদের মান অভিমান ভুলে বর্তমান পরিস্থতিতে ফেডারেশন ঘোষিত কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহবান করছি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কঠোর অবস্থানই বলে দিচ্ছে যে, শিক্ষকদের দাবি আদায় খুব সহজে হবে বলে মনে হয়। তাই সব শিক্ষকের মনে রাখা উচিত বিভেদ নয়, দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই।
মোঃ আবুসালেহ সেকেন্দার, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
সানবিডি/ঢাকা/এসএস