

বছর পাঁচেক আগেও ছিল রমরমা; বিনিয়োগকারীদের আস্থা ছিল, সুনাম ছিল ‘ভালো’ শেয়ার হিসেবে। আর এখন এ খাতে টাকা খাটানো অনেকেরই পথে বসার দশা।
২০১০ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার যখন ফুলে ফেঁপে চূড়ায় উঠেছে, এক্সিম ব্যাংকের শেয়ার তখন ১০০ টাকা দর নিয়ে উড়ছিল।
অথচ গত প্রায় একবছর ধরে অভিহিত মূল্যের (১০ টাকা) নিচে ঘোরাফেরা করছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই বেসরকারি ব্যাংকের শেয়ারের দাম। রোববার লেনদেন হয়েছে আট টাকা ৭০ পয়সায়।
চাঙ্গা সময়ে যারা এই শেয়ারে টাকা ঢেলেছেন, তাদের অবস্থা এখন কেমন- তা অনুমান করা কঠিন নয়।
আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ারের অবস্থা আরও করুণ। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের এই শেয়ার লেনদেন হচ্ছে পাঁচ টাকারও নিচে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ছয়টিরই এ দশা। ‘ফেইস ভ্যালুও’ ধরে রাখতে পারেনি এসব কোম্পানির শেয়ার। একটি ব্যাংকের শেয়ারের দাম সামন্য বেড়ে রোববার ‘ফেইস ভ্যালুতে’ এসেছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেসব বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা-মালিকরা নানাভাবে ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকছি রয়েছেন, ক্ষমতাসীন দলের কৃপা দৃষ্টি পেয়ে আসছেন, তাদের শেয়ারই সবচেয়ে বেশি দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় ভাবমূর্তি ও আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আর টাকা খাটানোর সাহস পাচ্ছেন না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) রোববার আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ার ৪ টাকা ৩০ পয়সা, এক্সিম বাংক আট টাকা ৭০ পয়সা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৮ টাকা ৮০ পয়সা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৯ টাকা, এনসিসি ব্যাংক ৯ টাকা ৩০ পয়সা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৯ টাকা ৫০ পয়সায় হাতবদল হয়েছে। বৃহস্পতিবারের ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ার রোববার বিক্রি হয়েছে ১০ টাকায়।
২০১০ সালে ধ্বসের আগে এসব কোম্পানির বেশিরভাগের শেয়ারের দাম ছিল ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি।
অন্য খাতের কিছু শেয়ার এখন সেই চাঙ্গা সময়ের বাজারের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকের শেয়ারের দর পড়ছেই। গত বছর ব্যাংকগুলোর ‘ভালো’ মুনাফার খবরেও অবস্থা পাল্টায়নি।
ব্যাংক খাতকে ‘স্থিতিশীল’ জেনে যারা এই খাতে টাকা ঢেলেছেন, তারা প্রায় সবাই এখন কম-বেশি হতাশ। তবে অবহিত মূল্যের নিচে থাকা সাত ব্যাংকের শেয়ারে টাকা খাটানো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বান্ত্বনারও জায়গা নেই।
শিহাব সুমন নামের এক বিনিয়োগকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ব্যাংকের শেয়ারের দাম বাড়বে ভেবে বছর দুই আগে ১৫ টাকা দরে এনবিএল (ন্যাশনাল ব্যাংক) কিনেছিলাম। আশা করেছিলাম আগের ক্ষতি কিছুটা পোষানো যাবে। কিন্তু আবার সেই লোকসান!”
উল্টোরথ
২০১০ সালের ধসের আগে পুঁজিবাজরে তালিকাভুক্ত সব শেয়ারের বাজার মূল্য ১০০ টাকা ধরলে তার মধ্যে ব্যাংকের শেয়ারের বাজার মূল্য হতো প্রায় ৩০ টাকা। সেই জায়গা হারিয়েছে ব্যাংক খাত।
৩০টি ব্যাংকের শেয়ারের মধ্যে রোববার আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের দাম ছিল সর্বনিম্ন ৪ টাকা ৩০ পয়সা; এবং সর্বোচ্চ ১০২ টাকা ৬০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে ডাচবাংলা ব্যাংক।
৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে রয়েছে কেবল দুটি ব্যাংকের শেয়ারের দাম। নয়টি হাতবদল হয়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। আর ১০ থেকে ২০ টাকার মধ্যে রয়েছে ১২টির দাম। বাকি পাঁচটি ৫ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।
২০১৪ সালেও মোট বাজার মূলধনের ২০ শতাংশ ছিল ব্যাংকের শেয়ারের। ২০১৬ সালে তা ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে নেমে আসে।
এখন পুঁজিবাজারে ওষুধ খাতের প্রাধান্য বেশি। বাজারের ১৬.২১ শতাংশ মূলধন এই খাতের অবদান।
২০০৭ সালে যখন পুরো বাজারের শেয়ার দাম ও শেয়ার প্রতি আয়ের অনুপাত (প্রাইস আর্নিং রেশিও) ছিল ২৩.৫৮, তখন ব্যাংক খাতের পিই রেশিও ছিল ২৬ এর মতো। এখন পুরো বাজারের পিই রেশিও ১৫.৯৩; আর ব্যাংক খাতের পিই মাত্র ৮.০৬।
এই পিই রেশিও থেকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের দিকটি বোঝা যায়। পুঁজিবাজরে তালিকাভুক্ত সব শেয়ারে গড়ে ১ টাকা মুনাফার জন্য বিনিয়োগকারীরা যখন ১৬ টাকা বিনিয়োগ করছেন, তখন ব্যাংক খাতের শেয়ারে ১ টাকার মুনাফার জন্য বিনিয়োগকারীরা বাজারে খাটাচ্ছেন ৮ টাকা।

সুশাসনের সংকট?
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ারকে বলা হয় ‘ফান্ডামেন্টাল’ শেয়ার। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন বিশ্লেষকরাও ‘ভালো’ শেয়ার হিসেবে ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিতেন।
কিন্তু টানা কয়েক বছর ধরে লোকসান গুণতে গুণতে বিনিয়োগকারীরা এ খাতের শেয়ারের প্রতি ‘আগ্রহ’ হারিয়েছেন বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, “নানা কারণে ব্যাংকের শেয়ারের ইমেজ সংকট দেখা দিয়েছে। নানা প্রণোদনার পরও ব্যাংকের শেয়ারের দাম বাড়ছে না। ব্যাংকগুলোর সম্পদ এর মান নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অনেক অনাদায়ী ঋণ পরে আছে ব্যাংকগুলোতে।”
সব মিলিয়ে এ খাতে আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এই বাজার বিশেষজ্ঞ।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, দেশে ব্যবসার পরিধি যতোটা বেড়েছে, তার তুলনায় ব্যাংক বেড়েছে অনেক বেশি। এ কারণেই এ খাতে সুশাসন ‘অনুপস্থিত’।
“অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো রুলস-রেজুলেশন্স এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো লিস্টিং রেজুলেশন্স মেনে কাজ করছে না। স্টেক হোল্ডারদের সততা নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে।”
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারীদের সব তথ্য জানায় না। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে না পারলে এ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনও নিশ্চিত করা যাবে না।
“গত কয়েক বছর ব্যাংকগুলো যৎসামান্য যে লভ্যাংশ দিয়েছে, তাতে শেয়ার হোল্ডারদের বিশাল ক্ষতির কিছুই পূরণ হয়নি,” বলেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
ক্ষমতার ছায়ায়
অভিহিত মূল্যের নিচে থাকা সাত ব্যাংকের মধ্যে ছয়টিরই উদ্যোক্তা-মালিকের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সরাসরি যোগাযোগ অথবা ‘ঘনিষ্ঠতা’ রয়েছে।
১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এক সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ছিলেন। এখন তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ‘কাছের লোক’ হিসেবে পরিচিত। সংবাদপত্রে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার ছবিও ছাপা হয়।
নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-বিএবি’র চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করে আসছেন।
এক্সিম ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন বগুড়া থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান। পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যরাও আওয়ামী ‘ঘরানার’ বলে বাজারে কথা আছে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি তিনি।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এইচ বি এম ইকবাল একজন সাবেক সংসদ সদস্য। অন্য পরিচালকরাও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলে শোনা যায়।
ন্যাশনাল ব্যাংকের বেশিরভাগ শেয়ার রয়েছে ‘শিকদার পরিবারের’ হাতে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান- জয়নুল হক শিকদার, স্ত্রী মনোয়ারা শিকদার, মেয়ে পারভিন শিকদারসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন।
‘শিকদার’ গ্রুপ বা ‘শিকদার’ পরিবারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সুসম্পর্কের’ কথাও বাজারে প্রচলিত আছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি এ কে এম এনামুল হক এই ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে তারও বেশ ভালো সম্পর্ক বলে শোনা যায়।
সেই সম্পর্কের জোরেই সম্প্রতি তিনি একুশে টিভির মালিকানা কিনে নিয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন বলে মিডিয়া পাড়ায় গুঞ্জন আছে।
এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এস এম আবু মহসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সরকারের মন্ত্রী-নেতাদের ‘ভালো যোগাযোগের’ কথা শোনা যায়।
সবচেয়ে খারাপ দশায় থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের সঙ্গে সরকার বা আওয়ামী লীগের কারও সম্পৃক্ততা নেই।
এক সময় নাম ছিল ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। ২০০৮ সালে সুইজারল্যান্ডে নিবন্ধিত মালয়েশিয়াভিত্তিক ‘আইসিবি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিংস এজি’ তৎকালীন ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ৫০ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার ৩৫১ কোটি টাকায় কিনে নেয়। তখন নামও বদলে যায়। তবে দুর্নীতি-অনিয়মে জর্জরিত এই ব্যাংকটির অবস্থার খুব একটা বদলায়নি।
সানবিডি/ঢাকা/রাআ