আলতাদিঘির পদ্মফুল

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০২১-০৬-২২ ১৪:৫২:১৬


নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার উত্তর ভারতীয় সীমান্তের কোল ঘেঁষে এবং জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার পশ্চিমে নির্জন বনের গভীরে জাতীয় উদ্যান আলতাদিঘির অবস্থান।

নিরিবিলি, প্রচুর গাছপালা, সর্পিল পথ, গহিন বন-অজানা এক পরিবেশে গা-ছমছম করে উঠবে। বিশেষ করে শালগাছকে আলিঙ্গন করে গড়ে ওঠা উঁই পোকার ঢিবিগুলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। মাঝেমধ্যে চেনা-অচেনা পাখির আচমকা ডাক, শালপাতার ফাঁকে ফাঁকে আলোছায়ার লুকোচুরি আর বাতাসের দোলায় মন মাতাল হওয়ার জোগাড় হবে।

জেলার সর্ববৃহৎ ও সুপ্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ এ দিঘি এ সময়ে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বিষয় পদ্মফুল। স্বচ্ছ পানিতে ফুটে ওঠা হাজারো পদ্মফুল যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে করছে বিমোহিত। শীতকালে পরিযায়ী পাখি, ডাহুক, পানকৌড়ির ওড়াউড়িতে মুগ্ধকর সব দৃশ্য যেকোনো বয়সের মানুষের হৃদয়কে করে চঞ্চল।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মধ্যে আলতাদিঘি অন্যতম। প্রায় ২৬৪.১২ হেক্টর এই বনভূমির মধ্যে দিঘিটির আয়তন ৪৩ একর। এটি দৈর্ঘ্যে ১১০০ মিটার এবং প্রস্থে ৫০০ মিটার। পাহাড়ের মতো পাড়গুলো উঁচু এবং দক্ষিণ পাড় শালবনে ঢাকা। পুরো জায়গায় শোভা পাচ্ছে রাশি রাশি পদ্মফুল। প্রাচীন দিঘিগুলোর মধ্যে এটিই বোধ হয় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সচল দিঘি।

ধামইরহাট উপজেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ ১৪০১.৬৯ একর। ভারতের কোল ঘেঁষে আলতাদিঘি ও তৎসংলগ্ন বন এলাকার ২৬৪.১২ (৬৫২.৩৭ একর) হেক্টর জায়গাকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালে ‘‘আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান’ ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশাল দিঘি রামসাগরের দৈর্ঘ্য এটির চেয়ে ১৫০ মিটার বেশি হলেও চওড়ায় ১৫০ মিটারের কম। আর রামসাগর ১৭৫০ সালের দিকে খনন করা হয়। কিন্তু আলতাদিঘি পাল রাজ্য শাসনের যুগের দিঘি।

আলতাদিঘির নাম করন
জনশ্রুতি আছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে একসময় প্রবল খরার কারণে মাঠ-ঘাট সব পুড়ছিল চরম পানীয় সংকটে। প্রজাদের দাবির কারণে স্থানীয় জগদল বিহারের (১০৭৭-১১২০ খ্রিষ্টাব্দে) রাজা রামপাল ও সদর পালের রাজ্য শাসনের সময় রাজমাতা পূত্রের কাছে বর চাইলেন। ওয়াদা করিয়ে নেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠে আমি যতদূর পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যেতে পারব, ততদূর পর্যন্ত একটি দিঘি খনন করে দিতে হবে। মায়ের কথায় বৃদ্ধ মা হেঁটে চলেছেন তো চলেছেন আর থামেন না। রাজা, উজির, নাজির পড়লেন বেকায়দায়। এত লম্বা দিঘি খনন করবেন কী করে? তাই কৌশলে মায়ের পায়ে আলতা ঢেলে দিয়ে পা কেটে গেছে বলে তার চলার পথ বন্ধ করে দেন। সেই থেকে এই দিঘির নামকরণ করা হয় আলতাদিঘি।

পার্শ্ববর্তী উপজেলা পত্নীতলা থেকে বনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী কামাল হোসেন বলেন, পরিবার নিয়ে করোনা ঝুঁকির মধ্য ঘুরতে এসেছি। বিশাল আলতাদিঘি এত সুন্দর, মুখে বলে বোঝানো যাবে না।

জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে শালবন বনাঞ্চল ও আলতাদিঘি পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাস, মাইক্রোবাস, ভটভটি ও রিকশা-ভ্যানযোগে ধামইরহাট থেকে আলতাদিঘি পর্যন্ত চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ অনায়াসে পাড়ি জমানো সম্ভব। প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা শালবাগানে বন বিভাগের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ঔষধিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, বাঁশ ও বেত লাগিয়ে বন্য প্রাণী ও পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। আবদুল মান্নান, বনবিট কর্মকর্তা
এ বনাঞ্চলে অজগর, হুনুমান, বানর, গন্ধগোকুল, বেজি, সজারু, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, শিয়ালসহ প্রায় ২০ প্রজাতির পাখি অবমুক্ত করা হয়েছে। একদিকে পর্যটক ও দর্শকদের আনন্দ ও বিনোদন যেমন বেড়েছে, তেমনি এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজার রাখার জন্য এ বনাঞ্চল যথেষ্ট অবদান রাখছে।

কোলাহল, বনভূমি সংকোচন ও বন্য প্রাণী হত্যার ফলে ধামইরহাট শালবন এলাকার জীববৈচিত্র্যি এখন হুমকির মুখে। প্রাকৃতিকভাবে শাল এখানকার প্রধান বৃক্ষ হলেও আজ তা ক্ষয়িষ্ণু প্রজাতীর বৃক্ষ। সহযোগী প্রজাতি যেমন আমলকী, হরীতকী বহেরা, শিমুল, কুম্ভি, তেন্ডু ইত্যাদি এখন আর নেই বললেই চলে। খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে এলাকাটি এখন বন্য প্রাণীশূন্য। অথচ একদা এলাকাটি প্রচুর শিয়াল, বেজি, বনবিড়াল, খেঁকশিয়াল, গুইসাপ ও হরেক রকমের পাখির কলকালিতে পরিপূর্ণ ছিল।