

করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর অর্থনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও গত বছরের তুলনায় ২০২১ সালের জুন শেষে অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দিন ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার (১ জুলাই)। এদিন ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফার হিসাব কষেছে। এতে দেখা গেছে, অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ, করপোরেট কর পরিশোধের পর নিট মুনাফার হিসাব হবে। নিট মুনাফাই ব্যাংকের সঠিক মুনাফা। কোনো কোনো সময় পরিচালন মুনাফা বেশি থাকলেও নিট মুনাফা কমে যায়। তবে, এবার নানা ব্যয় করার পর বোঝা যাবে, প্রকৃত মুনাফা কী দাঁড়ায়।
জুন শেষে ব্যাংকগুলোর তাদের অর্ধবার্ষিক আর্থিক হিসাব শেষ করলেও তা পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন করা হবে। পরে তা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) জমা দেবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সুদহার কম থাকা, ঋণের কিস্তি আদায়ের সুবিধা, খেলাপি আদায়ের ধীর গতি, বিপরীত দিকে ব্যয় কমার কারণে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।
যেসব ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার তথ্য পাওয়ার গেছে, সেগুলো অধিকাংশই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। পরিচালন মুনাফা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এবার সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের। গত ছয় মাসে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ২০ কোটি টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে পরিচালন মুনাফা হয়েছিল ১ হাজার ৭ কোটি টাকা।
এরপরেই রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার পরিমাণ ৪৭২ কোটি। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৪২ কোটি টাকা।
এছাড়া প্রাইম ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটিতে। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির ২৭০ কোটি টাকা ছিল এই মুনাফার পরিমাণ। কর অপরিশোধিত মুনাফার তালিকার পরের অবস্থানে রয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এবছর মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৩৫৮ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। তবে গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৪৩ কোটি।
একইসময়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে লাভ হয়েছে ২২৭ কোটি, তবে আগের বছর ছিল ১৭৫ কোটি। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। আগের বছরে এর পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি টাকা। চতুর্থ প্রজন্মের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। যা আগের াবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ কোটি টাকা বেশি। এছাড়াও বিদেশি খাতের মৃতপ্রায় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের মুনাফা হয়েছে ২১ কোটি টাকা। গত বছরের পরিমাণ ছিল ২২ কোটি টাকা।
এবার ৩৪০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে এক্সিম ব্যাংক। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩২৭ কোটি টাকা। আল আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক মুনাফা করেছে ৩১০ কোটি টাকা, যা গতবছরের প্রথম ছয় মাসে ছিল ৩০৫ কোটি টাকা। এবার ঢাকা ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৩১০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফার পরিমাণ ছিল ২৬৩ কোটি টাকা। এ সময়ে যমুনা ব্যাংক মুনাফা করেছে ৩০১ কোটি টাকা। গতবার ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ২৬২ কোটি টাকা। এবার প্রিমিয়ার ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। গত বছর যা ছিল ১৮৬ কোটি টাকা। এবার প্রথম ছয় মাসে ৩৫৮ কোটি টাকার মুনাফা করেছে ব্যাংক এশিয়া। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফার পরিমাণ ছিল ৪৬৫ কোটি টাকা।
মহামারী করোনার কারণে বছরের শেষ সময়ে এসে ব্যাংকগুলোকেও বড় ধরনের ছাড় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গ্রাহকদের বিশেষ ছাড় দেয়ার কারণে ৩০ জুন পর্যন্ত যেসব ঋণ অশ্রেণিকৃত অবস্থায় রয়েছে, সেসব ঋণের বিপরীতে আরোপিত সুদ ব্যাংকগুলো আয় খাতে নিতে পারবে। তবে নগদ আদায় ছাড়া এই সুদ আয় খাতে স্থানান্তরে ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনামহ বেশ কিছু নির্দেশনা পরিপালনের কথা বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের ঋণের কিস্তির ন্যূনতম ২০ শতাংশ ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এ বছর ৩১ আগস্টের মধ্যে পরিশোধ করলে ওই সময়ে ঋণ বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না।
এবিষয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আশানুরূপ ঋণ বিতরণ না হলেও প্রবৃদ্ধ কমেছে তেমন নয়। ফলে ঋণ বিতরণ থেকে উল্লেখযোগ্য একটি আয় ব্যাংকগুলোর এসেছে। এবারের পরিস্থিতি গতবছরের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো। তাছাড়া এবছর গ্রাহক টাকা পরিশোধ না করেও নিয়মিত রয়েছেন। কোনো খেলাপি হয়নি। এখানে অনেক সাশ্রয় হয়েছে। তাছাড়া সুদের ইনকামও ভালো হয়েছে এবার। তিনি আরও বলেন, আমদানি-রপ্তানির প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে আমাদের দেশ। এখানেও ভালো কমিশন এসেছে বলে জানান তিনি।
সানবিডি/এএ