‘মেট্রোরেল’ নিয়ে মুখোমুখি

প্রকাশ: ২০১৬-০১-১৯ ১১:৩৫:৪৪


মেট্রোঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে প্রস্তাবিত মেট্রোরেলের রুট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আলাদা-আলাদা কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা। এসব কর্মসূচি থেকে মেট্রোরেলের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হয়। আগামী ২০ জানুয়ারি দুই পক্ষই একই স্থানে একই সময়ে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করে।

রাজধানীর যানজট নিরসনের জন্য সরকার মেট্রোরেল তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খুব শিগগিরই এই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেলের একটি রুট প্রস্তাব করা হয়েছে। রুটটি শাহবাগ থেকে চারুকলা হয়ে টিএসসি রাজু ভাস্কর্য ঘুরে দোয়েল চত্বর হয়ে প্রেসক্লাবের দিকে যাবে। টিএসসি এবং দোয়েল চত্বরের মাঝে একটি স্টেশন থাকবে।

প্রস্তাবিত মেট্রোরেলের উচ্চতা হবে ৩০ মিটার। এছাড়া প্রতিটি স্টেশনের দৈর্ঘ্য হবে ১৮০ মিটার ও প্রস্থ ২০-২৬ মিটার। মেট্রো রেল প্রকল্পের জন্য এইসিএল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এইচ হক এর নের্তৃত্বে ১২জন গবেষক একটি আর্কিলজিক্যাল সার্ভে করে।

গত বছরের মাঝামাঝিতে এই হিস্টোরিকাল ইমপরট্যান্স বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের খসড়া রিপোর্ট পেশ করেছিলেন গবেষক দল। সার্ভেতে ঢাকা শহরের বুদ্ধিজীবী, স্থপতি, ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিকদের ইন্টারভিউ নেয়া হয়। তারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, ন্যাশনাল রেকর্ড প্রত্নতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনায় টিএসসি-দোয়েল চত্বর দিয়ে রুট না নিয়ে শাহবাগ মৎস্যভবন দিয়ে নেয়ার জন্য।

‘মেট্রো রেলের রুট বদলাও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয বাঁচাও’ ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে প্রস্তাবিত রুট বদলের আন্দোলন শুরু করে। গত ৭ই জানুয়ারি তারা রাজু ভাস্কর্যে একটি মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে বেশ কয়েজন শিক্ষকসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।

১১ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগ আয়োজিত রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মেট্রোরেলের রুট বদলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রজেক্ট আমরা শুরু করেছি-সেটা বাধাগ্রস্ত করা মানে সেটার কাজ সেখানে মুখ থুবড়ে পড়বে। যাদের কাছ থেকে আমরা অর্থ ধার নিচ্ছি, তারা অর্থ দেয়া বন্ধ করে দেবে। আর উন্নয়নটাও হবে না। এই উন্নয়নটা বন্ধ করা উদ্দেশ্য কিনা।’

এর প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ১৪ই জানুয়ারি মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি পাঠ করেন। আন্দোলনের সমন্বয়ক তাইশা তাশরীন খোলা চিঠিতে বলেন, আন্দোলনের সামগ্রিক দিক কোন অবস্থাতেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের বিপক্ষে নয়। আমরা মেট্রোরেলের বিপক্ষে নই। তবে সেটা যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুক ছিরে না হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের বিষয়ে খণ্ডিত বক্তব্য পৌঁছেছে।’

এসময় তিনি আরও বলেন, ‘ঐতিহাসিক মোঘল স্থাপনা মীর জুমলা গেটের (ঢাকা গেট) উপর দিয়ে এবং সন্ত্রাসবিরাধী রাজু ভাস্কর্যের একেবারে গা ঘেঁষে মেট্রোরেলের লাইন যাবে। তিন নেতার মাজারও সেখানে রয়েছে। এতে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ত্রিমাত্রিক সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হবে, তেমনি প্রতি সাড়ে তিন মিনিট অন্তর মেট্রোরেলের যাতায়াতে সৃষ্ট কম্পনে স্থপানাগুলোর স্থায়িত্বও হুমকির মুখে পড়বে।’

রুট বদলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘মেট্রোরেলের স্টেশন ক্যাম্পাসের ভেতর করলে এর নীচের অংশ অনেক সংকীর্ণ হয়ে যাবে। ফলে যানজট তৈরি হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে মেট্রোরেলের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। অন্যদিকে রুট বদলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো।

এদিকে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় মেট্রোরেলের পক্ষে মানববন্ধন শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে ক্ষণিকা, চৈতালি ও বৈশাখি রুটে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা জানান, মেট্রোরেল ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হলে উত্তরা, টঙ্গী থেকে আসতে তাদের ১০ মিনিট লাগবে। অনেক সময়ও বেঁচে যাবে।

বেলা ১২টার দিকে ছাত্র ইউনিয়ন মেট্রোরেলের রুট বদলের দাবিতে ক্যাম্পাসে মিছিল করে। তারাও রুট বদলের দাবিতে উপাচার্যকে স্মারকলিপি প্রদান করে।  মেট্রোরেলের কারণে ঐতিহাসিক স্থপানাগুলোর কোন সমস্যা হবে না বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল। তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেলের ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো কোন এফেক্টটেড হবে না। আমি কলকাতায় দেখেছি মেট্রোরেলের পাশেই অনেক অফিস রয়েছে। এতে ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধা হবে।’

স্টেশন হলে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের ক্যাম্পাসে তো বহিরাগত প্রবেশে কোনো সীমাবদ্ধতা নাই। দোয়েল চত্ত্বর এলাকায় আগে থেকেই জ্যাম লেগে থাকে দোকান থাকার কারণে। আর মেট্রো রেল রাস্তার উপর দিয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা যা একবার বিমান বাহিনীর বিরোধিতার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার নতুন করে রুট পরিবর্তন করা হলে এটা অনেক দূর পিছিয়ে যাবে। এটা এমন কোন বড় বিষয় নয় যে রুট পরিবর্তন করতে হবে।’

তবে এর বিরোধিতাও করছেন অনেকে। সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, ‘মেট্রো রেল ঢাকাবাসীর জন্য খুব ভালো উদ্যোগ। ঢাকার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি ঐতিহাসিক স্থাপনা অবস্থিত। এর ফলে এই ঐতিহাসিক স্থপনা গুলো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে এক্সপার্টদের রিপোর্টে। ক্ষতিটা শব্দ দূষণের জন্য নয়, কম্পনের জন্য। যখন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবা উচিত ছিল।’ সেই হিসেবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. দেলওয়ার হোসেন খান মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এর ভালো-মন্দ দুই দিক রয়েছে। ছাত্ররা কম সময়ে ট্রেনে যেতে পারবে, তাদের জ্যামে পড়তে হবে না। তবে অসুবিধাও হতে পারে। স্টেশন হলে কারণ তখন অনেক লোকের আনাগোনা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে থাকা ভাল।’

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘মেট্রারেলের পক্ষে ছাত্রছাত্রীরা মানববন্ধন করেছে, পরে তারা স্মারকলিপি দিয়েছে। তারা মেট্রো রেল চাই, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীদের সস্তায় সহজে গণপরিবহনের সুযোগ দিতে হবে। এই বিষয়গুলো তারা বলে গেছে।’

রুট বদলানোর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা কতগুলো সমস্যার কথা উল্লেখ করে স্মারকলিপি দিয়েছে। আমরা সেইগুলো কর্তৃপক্ষের নিকট জানাবো। এই প্রকল্পে উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যা পরিবেশের ক্ষতি করবে না।’

সানবিডি/ঢাকা/আহো