

জাতীয় পার্টি পরিচালনায় বরাবরই মূল কাণ্ডারি হলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অনেকে এরশাদের একক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে দলটিতে বিভক্তি আনার চেষ্টা করেছেন বহুবার। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে দল থেকে চলে গিয়ে নতুন দল গঠন করেছেন। কিন্তু মূল ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি এখনও স্বমহিমায় বহাল তবিয়তে টিকে আছে।
এই শক্ত অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মঙ্গলবার বনানীস্থ দলীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে আসা নেতাকর্মীদের অনেকে বলেন, ‘দলের প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ যেখানে জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব সেখানে। এর বাইরে কিছু নেই। আর যারা নেতিবাচক কিছু করার চেষ্টা করেছেন তারা সবাই আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।’ তারা আরও বলেন, পার্টির গঠনতন্ত্রেই চেয়ারম্যানকে নীতিনির্ধারণী যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়েছে। তাই তাদের নেতার সব সিদ্ধান্ত বৈধ এবং দলের জন্য কল্যাণকর। এর বাইরে তারা ভিন্ন কিছু ভাবতে চান না।
এদিকে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী মঙ্গলবার বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সময় অনেকেই জাতীয় পার্টি ভাঙার চেষ্টা করেছেন। আলাদা দল গড়েছেন। কিন্তু যারা এ কাজ করেছেন তারাই হারিয়ে গেছেন। এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি টিকে আছে। ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দল পরিচালনায় নানা সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদকে। তবে এসব সিদ্ধান্ত যাদের বিরুদ্ধে গেছে তারাই দল ভাঙার বা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পার্টির একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, নাজিউর রহমান মঞ্জু, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সর্বশেষ মরহুম কাজী জাফর আহমদসহ অনেকেই দল ভাঙার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় পার্টির নাম লাগিয়ে কেউ কেউ নতুন দলও গড়েছেন। কিন্তু তা জনপ্রিয়তা পায়নি। কালের স্রোতে দলছুটরা হারিয়ে গেছেন। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে টিকে আছেন এরশাদ ও তার নিজ হাতে গড়া দল জাতীয় পার্টি।
আর সারা দেশের অসংখ্য নেতাকর্মী ও সমর্থকরা নানা সংকটেও এরশাদের সঙ্গেই রয়েছেন। এখনও আছেন, এমনকি ভবিষ্যতেও থাকবেন। গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালনার স্বার্থে চেয়ারম্যান যে কোনো পদে যে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ, অপসারণ বা স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন। পার্টির শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রয়োজন মনে করলে নতুন পদও সৃষ্টি করতে পারেন। শুধু জাতীয় পার্টি নয়, দেশের বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির গঠনতন্ত্রেও দলের প্রধানের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারায় চেয়ারম্যানকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- ‘চেয়ারম্যান প্রয়োজনবোধে প্রতিটি স্তরের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন, বাতিল, বিলোপ করতে পারবেন। চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির যে কোনো পদে যে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ, যে কোনো পদ থেকে যে কোনো ব্যক্তিকে অপসারণ ও যে কোনো ব্যক্তিকে তাহার স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন। তিনি এই ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে পার্টির পার্লামেন্টারি বোর্ডের দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন করতে পারবেন।’ এছাড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পার্টির ঐক্য, সংহতি ও মর্যাদার প্রতীক। এ বিষয়ে ধারা ২০-এর উপধারা-১-এ বলা হয়েছে- পার্টির চেয়ারম্যান পার্টির সর্বপ্রধান কর্মকর্তা গণ্য হবেন। তিনি পার্টির ঐক্য, সংহতি ও মর্যাদার প্রতীক।
পার্টির প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে চেয়ারম্যান সব কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ, তদারক ও সমন্বয় সাধন করবেন এবং এই উদ্দেশ্যে জাতীয় কাউন্সিল, প্রেসিডিয়াম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বিশেষ কমিটিসমূহ, পার্লামেন্টারি বোর্ড, পার্লামেন্টারি পার্টি ও চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত অন্যান্য কমিটিসমূহের কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ, তদারক ও সমন্বয় সাধন করবেন। প্রয়োজনবোধে প্রেসিডিয়ামের সাথে পরামর্শক্রমে চেয়ারম্যান এসব কমিটিসমূহের সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এদিকে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র কমিশন অনুমোদন করেই দলটির নিবন্ধন দিয়েছে। তাই দলের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে সেখানে গঠনতন্ত্রই প্রাধান্য পাবে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেয়া সিদ্ধান্তই কমিশনের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে।
বরং এক্ষেত্রে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষাকারী সংসদ সদস্যরা পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে এক কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দলের বিষয়ে কমিশন হস্তক্ষেপ করবে না। তবে দলের নিবন্ধন ও প্রতীকের বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে সে বিষয়ে আইন অনুযায়ী সমাধান করা হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে জাতীয় পার্টিতে মাঝেমধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ওই সময়ে যারা জাতীয় পার্টিতে বিভেদ সৃষ্টি করেছিলেন তাদের অনেকেই মূল রাজনীতির ধারা থেকে ছিটকে পড়েছেন।
এছাড়া নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টির এখনও রিজার্ভ ভোট ব্যাংক রয়েছে। নির্বাচন কমিশনেও দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম উল্লেখ করে নিবন্ধন আছে। এছাড়া আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) বাইসাইকেল প্রতীক, নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (বিজেপি) গরুর গাড়ি প্রতীক নিয়ে ইসিতে নিবন্ধিত হলেও ভোটের রাজনীতিকে বরাবরের মতো এগিয়ে রয়েছে লাঙ্গল প্রতীকে এরশাদের জাতীয় পার্টি।
তারা মনে করেন, এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে। বারবার ভাঙনেও এরশাদ যেখানে দল সেখানে : জাতীয় পার্টিতে বারবার ভাঙনের চেষ্টা হলেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যেখানে, দলের নেতাকর্মীরা সেখানেই অবস্থান করেছেন। এ বিষয়ে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা মঙ্গলবার বলেন, জাতীয় পার্টিতে প্রথম বড় ধরনের ভাঙন ধরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বের হয়ে আলাদা জাতীয় পার্টি ঘোষণা করলে।
১৯৯৬ সালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নতুন দল গঠন করেন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন ধরে। নাজিউর রহমান মঞ্জু জাতীয় পার্টি নামে আরেকটি দল গঠন করে এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে যায়। বর্তমানে এই অংশের নেতৃত্বে আছেন আন্দালিব রহমান পার্থ। এই অংশটির ভেতরও আরেকটি ভাঙন ধরে। সর্বশেষ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরান তার পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মী কাজী জাফর আহমেদ।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে কাজী জাফর এরশাদকে ছেড়ে আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করে যোগ দেন বিএনপি জোটে। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে দলের বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন জাতীয় পার্টির ঘোষণা দেন কাজী জাফর। একই সঙ্গে তিনি এইচএম এরশাদকে বহিষ্কারেরও ঘোষণা দেন। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীরা দলের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। সূত্র: যুগান্তর
সানবিডি/ঢাকা/এসএস