ঢাকা, , শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক || প্রকাশ: ২০১৮-০৯-১৩ ২০:১১:০৭ || আপডেট: ২০১৮-০৯-১৩ ২০:১১:০৭

সরকার পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে ৮ হাজার টাকা। আগামী ডিসেম্বর থেকেই তা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। অন্যদিকে, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছেন, গেজেট প্রকাশের পরই বেতন কার্যকর হবে।

বৃহস্পতিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) মজুরি বোর্ডের বৈঠকের পর সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তারা এ কথা বলেন। বৈঠকে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, শ্রমিক প্রতিনিধি ফজলুল হক মন্টু ও বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।

শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি ৫ বছর পর পর মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করতে হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মজুরি কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন মজুর কাঠামো ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সে হিসাবে, আগামী ডিসেম্বরে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করা মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, এর আগে চারটি বৈঠকে একমত হতে না পারায় উভয়পক্ষ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান। প্রধানমন্ত্রী উভয়পক্ষের কথা শুনে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেন। এর অাগের বৈঠকে মালিকপক্ষ ন্যূনতম মজুরি ৬ হাজার ৩৬০ টাকা, আর শ্রমিকপক্ষ  ১২ হাজার ২০ টাকা করার দাবি করে।

মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ আসে গামের্ন্টস সেক্টর থেকে। এই সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য আমরা ৭ মাস আগে সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠন করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শ্রম বান্ধব সরকার। শ্রমিকদের বিষয়ে তিনি সহানুভুতিশীল। ২০১০ সালের আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ছিল ১৬০০ টাকা। ২০১০ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় এসে শ্রমিকদের বেতন ৩৩০০ টাকা করেন। পরে ২০১৩ সালে পুনরায় গামের্ন্টস শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ৫৩০০ টাকা করেন। যদিও শ্রম আইনে আছে প্রতি ৫ বছর পর পর মজুরির বিষয়টা পুন:নির্ধারন করতে হবে।
তিনি বলেন,  এই সরকার ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দুইবার মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে। ২০১৩ সালের আগে ৫ বছর হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা মজুরি বোর্ড গঠন করি। আগামী ডিসেম্বরে ৫ বছর হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা অনেকগুলো মিটিং করে, বাজার বিশ্লেষণ করে আজকের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর আগে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবে ১২২০ টাকা এবং মালিক পক্ষ সাত হাজার টাকা প্রস্তাব দিয়ে উভয় পক্ষই অনড় অবস্থানে থাকে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে নন্যূতম মজুরি ৮ হাজার টাকা নির্ধারন করে। এই সেক্টরে মোট ৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করে।
এই নির্দেশনা কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যে গেজেট করবো। গেজেটের পরই এই মজুরি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে আমাদের এখনও অনেক কাজ বাকি। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করবো।
তবে বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জানান, আগামী ডিসেম্বর মাসের বেতন এই মজুরী কাঠামোতে পাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নির্ধারন করেছেন। আমরা মেনে নিয়েছি।

নতুন এই মজুরিতে মূল বেতন ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১শ টাকা, বাড়ি ভাড়া-২০৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা-৬শ টাকা, যাতায়াত-৬৫০ টাকা ও অন্যান্য টাকা ধরা হয়েছে খাদ্য কিনতে। চলতি থেকে নতুন বেতন ৫১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়েছে।

এর আগে, রাজধানীর তোপখানা রোডে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডের পঞ্চম সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেখানে দুই পক্ষই সর্বনিম্ন মজুরি ৮ হাজার টাকা করার পক্ষে সম্মত হয়। বৈঠক শেষে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আমিনুল ইসলাম সচিবালয়ে গিয়ে বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জমা দেয়। পরে শ্রম প্রতিমন্ত্রী সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন।

মজুরি বোর্ডের বৈঠকে চার সদস্য বিশিষ্ট স্থায়ী নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি কাজী সাইফুদ্দীন আহমদ, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ফজলুল হক মন্টু ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে মালিকপক্ষের অস্থায়ী প্রতিনিধি বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি জাতীয় শ্রমিক লীগের নারী বিষয়ক সম্পাদিকা বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।

 

এর আগে, গত ১৬ জুলাই তৃতীয় বৈঠকে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ তাদের প্রস্তাবনা জমা দেয়। ওই বৈঠকে শ্রমিকপক্ষ সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ২০ টাকা করার দাবি জানায়। বিদ্যমান মজুরি ১২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় তারা। বিপরীতে মালিকপক্ষ ৬ হাজার ৩৬০ টাকা ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাব দেয়। পরে বোর্ডের চতুর্থ বৈঠকে বোর্ড চেয়ারম্যান দুই পক্ষকেই কিছুটা ছাড় দিয়ে ভারসাম্যে আসার আহ্বান জানান।

এদিকে, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক জরুরি সম্মেলনে নতুন মজুরি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে মালিক প্রতিনিধিরা দাবি করেন, তাদের পক্ষে শ্রমিকদের ৬ হাজার টাকা বেতন দেওয়াও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। বারবার মজুরি বোর্ডের ঝামেলা এড়াতে প্রতিবছর মূল্যস্ফীতির সমন্বয়ে মজুরি বাড়ানোর চিন্তার কথা জানান পোশাক মালিকরা।

সর্বশেষ ২০১৩ সালে দেশে পোশাক শিল্পের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়। সে বছর নূন্যতম মজুরি হার ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর করা হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর পর পর মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করতে হবে। তবে গত কয়েক বছর ধরেই শ্রমিক সংগঠনগুলো ১৬ হাজার টাকা বেতনের দাবি জানিয়ে আসছিল। আর নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করতে এ বছরের ১৪ জানুয়ারি নতুন মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠন করে সরকার।

এদিকে, বৃহস্পতিবার মজুরি বোর্ডের বৈঠক চলাকালে অন্যান্য দিনের মতো আজও বিক্ষোভ দেখিয়েছে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন। ১৬ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে এসব সংগঠনের নেতারা এখনও অটল রয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ নামের দু’টি সংগঠনের নেতারা বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, মাছের বাজারের মতো মজুরি নিয়ে এখন দরদাম কষা হচ্ছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে। বোর্ডে থেকে তিনি এটা বলতে পারেন না।

আর্কাইভ