
সকাল বেলা প্রথম কেউ একজন তার দেয়ালে শেয়ার করে খবরটি। সেই থেকে মানসিক শান্তি নষ্ট। কিছু সময় নিজের দায়দায়িত্ব পালনেও অপ্রীতিকর প্রভাব ফেলেছে খবরটি। খবরটি ছিলো কোন এক মা তার সন্তানদের মেরে ফেলেছে।
কেবল খবরই না, সাথে তার মতামতও দিয়েছেন খবর পোস্টকারী- 'এই মহিলাকে কোমর অবধি মাটিতে পুতে পাথর মেরে মেরে ফেলতে হবে।'
প্রথমেই মনে হতে পারে যে মানুষটি এই ঘটনায় এতবড় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সে কতবড় মাপের কোমল মনের মানুষ! মহিলার অপরাধ সে তার সন্তানদের হত্যা করে কোন এক অচেনা মানুষের বুক ভেঙ্গে দিয়েছে। তাই তার অপরাধের একমাত্র বিচার কোমরমাটিতে তাকে পাথর মারা।
তারপরেই তো সমস্যার শুরু। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে কে মাটিতে পুঁততে যাবে? কেইবা তাকে পাথর মারবে? কার এতবড় সীমারের বুক যে একজন জীবিত মানুষকে একটু একটু করে মারতে মারতে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিবে? আপনাদের কি মনে হয় কোন মানুষ আসলেই পাওয়া যাবে এই কাজের জন্য?
যদি মনে করেন হ্যাঁ পাওয়া যাবে, এবং মানুষের অভাব হবে না, তাহলে মহিলা শুধু একাই হত্যা করেনি তার সন্তান, এদেশের সকল মানুষই এই সন্তান হত্যায় দায়ী। যেদিন সিলেটে এতগুলো শিশুদের মেরে ফেলা হলো সেদিন কোন মহিলা বা মা এ কাজ করেননি। সেদিন যখন এক মা পুড়তে পুড়তে প্রতিবেশীদের কাছে আকুতি জানিয়েছিলো একটা সামান্য বিছানার চাদর দেয়ার জন্য যা দিয়ে তার সন্তানদের গায়ের আগুন নেভাতে পারেন, সেদিন পুড়ে যাবে বলে কেউ তাকে একটা পুরানো কাপড়ও ছুড়ে মারেনি। সেই মায়ের স্বামী এবং সন্তান মারা যায় আগুনে পুড়ে এবং তারও ৯০ ভাগ শরীর পুড়ে গেছে আগুনে। সেদিন কি সত্যিই সবাই মানবিক ছিলেন? তাদের মধ্যে কেউই কি এই মহিলাকে ছি ছি করবেন না?
আমরা প্রায়ই দেখি কোন একটা ঘটনা ঘটলে সবাই দোষী ব্যক্তিকে 'লাত্থি মারো, জ্যান্ত মারো, গুলি করো' টাইপ কথা বলে স্ট্যাটাসের বন্যা বইয়ে দেন। আমি পড়ি আর দেখি মানুষের মানবিকতা। কে যে কতবড় মানবিক বোঝা কঠিন।
ইংরেজীতে একটা কথা আছে, 'কিক অন দ্যা গ্রোইন এন্ড নো টেইক জেইল।' এই কথা বলা হয় স্যোসাল আনরেস্ট সময়ে। কারণ তখন এত মানুষ আনরেস্টের শিকার হয় যে কতজনকে আর জেলে নিবে- বাধ্য হয়ে অফিসাররা লাত্থি দুইটা দিয়ে শাসায়ে চলে যায়।কিন্তু একটি সভ্য সমাজে এসব মানায় না। একটা অপরাধ হলে আসল অপরাধিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর একটি সত্যিকার অর্থে ভালো দেশের উচিত আরো গভীরে যাওয়া। অন্যায়ের মূলসহ দূর করার চেষ্টা করা।
মহিলা যদি আসলেই সন্তান হত্যা করে থাকেন, তাহলে মহিলাকে শাস্তি দিন। কিন্তু শাস্তি দেয়ার আগে ভালো ভাবে বোঝার চেষ্টা করুন কোথায় এ অপরাধের উৎস। যতদূর জেনেছি মহিলাটি একজন শিক্ষিকা। দুই সন্তানের জননী মহিলা কি যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছিলেন তার জীবনে? সন্তান লালন করতে অনেক ধৈর্য্য এবং পরিশ্রমের প্রয়োজন। এই কাজের জন্য তিনি কি ফিট ছিলেন? নাকি তার উপরে সন্তান লালন একটা বোঝা হিসাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো? যদি তার জন্য সন্তানের লালন কঠিন হয়ে থাকে, কে তাকে সাহায্য করেছিলো? বাবা কি আগে থেকেই মায়ের এই অপারগতা বুঝতে পেরেছিলেন? যদি বুঝে থাকেন তিনি কি কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এই সন্তানদের নিরাপত্তায়, নাকি সেই অপারগ মায়ের উপরই বোঝা চেপে নিশ্চিন্তে কাটিয়েছিলেন? মহিলাটির জীবন নিয়েও স্টাডি করতে হবে। কোথায় কিভাবে তিনি বড় হয়েছেন, কোন টিজিংয়ের শিকার হয়েছেন কি না, সন্তানদের ব্যবহার করে কেউ তাকে অত্যাচার করেছে কি না, তার সাথে তার স্বামীর সম্পর্ক কেমন ছিলো, শশুড়বাড়ির সম্পর্ক কেমন ছিলো, তার বাবা মা আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক কেমন ছিলো, তার নিজের বাবা এবং মায়ের বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন ছিলো ইত্যাদি। এসব না জেনে কেবল একজন মা তার সন্তানদের মেরে ফেলেছে বলে চিৎকার করাটা কোন সমাধান নয়।
সেদিন একটা হোম কেয়ার অফিসে যাই। জেসিকা নামে একজন কর্মকর্তা বলেন, 'কেউ সন্তান বা বৃদ্ধদের লালনে অসীকৃতি জানলে বা অপারগতা স্বীকার করলে সে খারাপ নয়। তাকে খারাপ ভাবার কোন কারন নেই। কিন্তু কেউ যদি বুঝতে পারে যে সে শিশু বা বৃদ্ধ লালনের অযোগ্য এবং তা সত্ত্বেও সে তাদের দায়িত্ব নিয়ে তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে, বা তাদের প্রতি নির্মম আচরণ করে বা উপেক্ষা করে, সে অপরাধি।' কথাগুলো আমার মনে ধরে। মহিলা হলে বা গর্ভ ধারন করতে পারলে বা পুরুষ মানুষ সন্তানের জনক হলেইযে মা বা বাবা হতে পারবে তার কোন গ্যারন্টি নেই। তারা জোর করে মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের নামে সন্তানদের উপেক্ষা করে বা অত্যাচার করতে পারে। তাই তাদের জন্য অপসন থাকা প্রয়োজন যে যদি তারা সন্তান লালনে অযোগ্য মনে করে নিজেকে, সেই সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে?
বাংলাদেশ সরকার শিশুদের নিরাপত্তায় কি এমন কোন ব্যবস্থা নিয়েছে? যদি না নিয়ে থাকে, আর যে আইন আদালত করুক না কেন, এই মহিলাকে কোন শাস্তি অন্তত দিতে পারে না এই নির্মম কাজের জন্য। শিশুরা যদি বাংলাদেশে বোঝাই হয় তবে মহিলাকে ক্রেডিট দেয়া উচিত যে দুজন সে কমিয়ে দিয়েছে।
প্লিজ! শিশুদের রক্ষায় মায়েদের শারিরিক মানসিক ফিটনেস টেস্ট করা হোক। বাবাদের আচার আচরণ নিরীক্ষা করা হোক। এবং অানফিট বাবা মাদের সন্তানদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজে শান্তির ব্যবস্থ্যা করা হোক। এই নৈরাজ্য এবং বিদ্বেষ আর কত!
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখিকা