
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর আছে। এ কারণে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই।
রোববার (৭ আগস্ট) রাজধানীতে এফবিসিসিআইর কার্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি ও বাণিজ্য ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন—প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম মাহফুজুর রহমান, বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম, এফবিসিআই’র সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, এমসিসিআই’র সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির, ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান, সাবেক সিনিয়র সচিব শুভাশীস বসু প্রমুখ।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে হয়তো কিছু মানুষের কষ্ট হবে। তবে, কিছু কষ্ট সামনের দিকে নিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী সাধারণ জনগণের সমস্যা বোঝেন। তিনি সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিতে চান না। তাদের ভালোর জন্যই এটা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অনেকেই নানা মন্তব্য করছেন। আমাদের এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। গত ১৪ বছরে আমাদের দেশ এগিয়েছে, উন্নয়ন হয়েছে। ভালো কিছুর জন্যই প্রধানমন্ত্রী কিছু সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্যবিহীন সিদ্ধান্ত তিনি নেন না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কারণে দেশের রপ্তানিখাতে বৈচিত্র্য এসেছে। সদ্যস্বাধীন দেশে আমদানি-রপ্তানিতে বার্টার প্রথা চালু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বেসরকারিখাতে এই পদ্ধতিতে ৪০ শতাংশ অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানি করার শর্ত দিয়েছিলেন তিনি। ওই সিদ্ধান্তের কারণেই রপ্তানিখাতে চিংড়ি ও চা যুক্ত হয়েছিল। পরে সরকারি বার্টারেও বিদেশি দেশগুলোকে এসব অপ্রচলিত পণ্য কিনতে বাধ্য করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, পরিত্যক্ত শিল্প রাষ্ট্রীয়করণ না করলে, স্থিতিশীলতা আসতো না। রাষ্ট্রীয়করণ করলেও, প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল ব্যক্তিখাতে। ১৯৭৫ সালে বিরাষ্ট্রীকরণের নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা বাস্তবায়নের আগেই তাকে হত্যা করা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কৃষি উন্নয়ন, শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সংস্কৃতি, নারী জাগরণ, গ্রামীন প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে ধারণ করে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে বাণিজ্য খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এরই অংশ হিসেবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কারিগরি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সরকারের পাশাপাশি ব্যাক্তিখাতেরও ব্যাপক অবদান রয়েছে। করোনা মহামারি ও ইউক্রেন সংকটের কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের জন্য সবসময়ের মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি ও সহযোগিতা দিলে, এ সংকট শিগগির কাটিয়ে ওঠা যাবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। যুদ্ধোত্তর বাস্তবতার নিরিখে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে আপসহীন অভিযাত্রা, রাষ্ট্রনির্ভরতা থেকে ব্যক্তিখাতের বিকাশসহ বিভিন্ন দিকে বঙ্গবন্ধুর অবদান তুলে ধরেন ড. আতিউর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ও স্বাধীনতার আগে বাঙ্গালীদের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম বলেন, পাকিস্তান আমলে পাট, চা ও চামড়া রপ্তানি হতো, কিন্তু সবগুলোই ছিল অবাঙালিদের হাতে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশের অগ্রগতি সহ্য হয়নি দেশবিরোধী চক্রান্তদের। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারও সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মহাকাশে স্যাটেলাইট, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, অসংখ্য ব্রীজ কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। চলমান সাময়িক ইউক্রেন সংকটে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর রক্তের মধ্যেই ছিলো মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির চেতনা। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা অনুযায়ী তার সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে দেশে অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাম্য এসেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবাখাত নির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ।
এর আগে প্যানেল আলোচনায় এফবিসিসিআইয়ের প্যানেল উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ট্রেড ও ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান জানান, স্বাধীনতা পরবর্তী বৈষম্য কমাতে রাষ্ট্রীয়করণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর আমলে এলডিসিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের রপ্তানি বানিজ্য আজকের পর্যায়ে এসেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দেশে ব্যক্তিখাতের বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বার্টার পদ্ধতির কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল।অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও বিশাল ভূমিকা রেখেছেন বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম মাহফুজুর রহমান জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফেরার ৫৪ দিন পর নতুন নোট বাজারে ছেড়েছিলেন। দেশে অবৈধ অর্থ শনাক্ত ও বিনাশ করতে ১৯৭৫ সালে ১০০ টাকার নোট বাতিলের মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
এএ