
আত্মজার শোকে হু হু করে কাঁদছিলেন এক কবি। টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে চুপ করে শুনছিলাম সেই কান্না। মনের তলদেশ থেকে উঠে-আসা কান্না। পৃথিবীতে কোনও বেহালা নেই, ঐ কান্নার সুর তোলে। শুনছিলাম আর কত কী ভাবছিলাম। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে পথে-পথে যখন কঙ্কালসার মানুষ কুকুরের সঙ্গে ডাস্টবিনের খাদ্য ভাগাভাগি করে খাচ্ছে, তখন ফোনের কবি ’ভাত দে হারামজাদা, তা না- হ’লে মানচিত্র খাব’ বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। কবি রফিক আজাদ। আমার অতিপ্রিয় অগ্রজ। মায়ের মৃত্যুশোকে আমি যখন পাথর, গভীর স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন তিনি। বাইরে থেকে যা-ই মনে হোক না কেন, আসলে রফিক আজাদ পালকনরম মনের একজন মানুষ। জানেন-- ‘পাখি উড়ে চ‘লে গেলে পাখির পালক পড়ে থাকে।’
তাকে ঘিরে আমার মধুর স্মৃতি অনেক। তরুণবেলা থেকে তাকে দেখছি। দেখা হলেই কখনও ‘বেটা’ কখনো ‘ভাই’ সম্বোধনে বুকে টেনে নিয়েছেন। কখনও ‘তুই’ কখনও ’তুমি'। প্রায় দেড় বছরকাল তাকে খুব কাছে পেয়েছিলাম ‘দৈনিক আমাদের সময়’-এ সহকর্মী থাকার সুবাদে। এ প্রাপ্তি কোটি টাকার বিনিময়েও মেলে না।
তার সঙ্গে আমার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা গত শতকের মধ্যসত্তরে। রফিক ভাই তখন বাংলা একাডেমিতে দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পাশাপাশি বহিরাগত অনুজদেরও সময় দেন, চা খাওয়ান। তার কক্ষে সারাদিনই তরুণ কবি-লেখকদের আনাগোনা। ইত্তেফাক হাউস থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘রোববার’-এও সম্পাদকমণ্ডলীর একজন হিসেবে কাজ করেছে তিনি। সেখানেও তারুণ্যের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল। জীবিকা-পরম্পরায় বিরিশিরি কালচালার একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। যখন যেখানে, সেখানেই ভিড় জমিয়েছে তারুণ্য। কেন? বয়স বাড়লেও মনের শিলাস্তরে থাকা নবীন কবিটিকে রফিক আজাদ সবসময় লালন করেছেন যত্নে।
বয়স কাউকেই ছাড় দেয় না। জীবন বাঁচাতে জীবিকার কাছে সবাইকেই কম-বেশি যেতে হয়। তাই, নিজেরও পেশাগত ব্যস্ততা বাড়ায় একসময় রফিক ভাইয়ের মধুর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকলাম। তবে কখনোই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। সময় পেলেই তার ধানমণ্ডির বাড়িতে যেতাম। তিনিও ডেকে নিতেন। তো, এরকমই এক দূরত্বকালে কবি রনজু রাইমের মুখে একদিন শুনলাম, রফিক আজাদ আর জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে নেই। আমি তখন ‘আমাদের সময়’-এর সম্পাদক। প্রিয় কবির বেকারত্বের কথা শুনে খুব খারাপ লাগল। রফিক আজাদের কথা ভাবতে-ভাবতেই মনে পড়ল এজরা পাউন্ডের কথা। এজরা পাউণ্ড বলতেন, সমাজের কিছু মানুষ ভাষাকে নিয়ত দূষিত করে। কবির একটি বড় কাজ হল, এই দূষণ রোধ করার পাশাপাশি ভাষাকে নতুন অগ্রসরতা দেওয়া। একই বোধ আমি রফিক আজাদের মধ্যেও লক্ষ করেছি। শব্দের ব্যবহার ও বাক্যের গঠনশৈলী নিয়ে তাকে সবসময় ভাবতে দেখেছি। ভুল-বানান দেখলে বিরক্ত হতে দেখেছি। বাংলা ছাপা-হরফের জনক পঞ্চানন কর্মকারকে নিয়ে একটি বিখ্যাত কবিতাও আছে তার। রাজনৈতিক কারণে পাউন্ড বিলেত ত্যাগ করে মুসোলিনির দেশ ইতালি চলে যান ১৯২৪ সালে। চাকরি নেন ঐ দেশের জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রে। ভাষা-সম্পাদকের চাকরি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে এই সম্প্রচার কেন্দ্র হিটলার-মুসোলিনির হাতিয়ার হয়ে ওঠায় পাউন্ডকে কড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে পাউন্ড অবশ্য বলেছিলেন, ”দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই আমি ইতালিতে যাই এবং ওদের জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রে কাজ শুরু করি। যুদ্ধকালে ঐ সম্প্রচার কেন্দ্র হিটলার-মুসোলিনিকে সমর্থন দিলে তার দায় আমার ওপর যতটুকু বর্তাবার ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি বর্তেছে।”-- পাউন্ড প্রসঙ্গ এই জন্য এনেছি যে, এর সঙ্গে বাংলা ভাষার গণমাধ্যমে ভাষা-সম্পাদক পদে প্রথম কারও যোগ দেওয়ার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আর কেউ নন-- কবি রফিক আজাদ।
রনজু রাইমের মুখে রফিক আজাদের গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বিদায় নেওয়ার খবরটি শোনামাত্র ’আমাদের সময়’-এ ভাষা-সম্পাদকের একটি পদ সৃষ্টি করে ঐ পদে কবিকে নিয়োগ দিই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পাউন্ড ছিলেন ফ্যাসিস্টদের পক্ষে; কিন্তু বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে রফিক আজাদ ছিলেন একজন মাঠের যোদ্ধা। এটা ছিল তার বাড়তি যোগ্যতা। রফিক ভাই আমাকে নিরাশ করেননি। অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি অধুনা লুপ্তপ্রায় 'আমাদের সময়' দৈনিকটির জন্য।
আমি সম্পাদক থাকাকালীন ‘আমাদের সময়’-এ শিল্প-সাহিত্যের যত অনুষ্ঠান হয়েছে, তার সবগুলোরই অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন কবি রফিক আজাদ। তার অভিভাবকত্বে ‘বাংলা সাহিত্যের এপার-ওপার’ ব্যানারে একটি অপরূপ ভাবনাবিনিময়মূলক অনুষ্ঠান হয়েছিল পত্রিকাটিতে। ল্যাব এইডের স্পন্সরশিপে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্বশীল কবি-লেখকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি একটি-স্মৃতিসম্মেলনের রূপ নিয়েছিল। ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে চৌদ্দ আনা মিল থাকার পরও একসময় (পাকিস্তান আমলে) দুই বাংলার বাঙালির মধ্যে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল, বলা যায়। সাহিত্যের আদান-প্রদানে ছিল বিস্তর বাধা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যোগাযোগ তেমন নিবিড় হয়ে ওঠেনি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দেশ’ পত্রিকার অল্প কিছু কপি আসত তখন বাংলাদেশে। স্টেডিয়াম মার্কেটের ‘ম্যারিয়েটা’ আর নিউমোর্কেটের ‘নলেজ হোম’-এর মতো দু-একটি বুকস্টলে পাওয়া যেত। ঐ সময় বাংলাদেশের কবি বেলাল চৌধুরী ছিলেন দুই বঙ্গেরই দূত। নাগাড়ে কয়েক বছর কলকাতায় ছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবি-লেখকের সঙ্গেই ছিল তার নিবিড় সখ্য। শ্রুতি কাব্য-আন্দোলনের বরপুত্র কবি মৃণাল বসুচৌধুরী তাদেরই একজন। ‘আমাদের সময়’-এর সেই অনুষ্ঠানে দুই কবিই উপস্থিত ছিলেন। ‘একসময় দুই কবি’ ব্যানারে দুজনকে সম্মাননা জানানো হয়েছিল সেদিন। কবি মৃণাল বসুচৌধুরীর হাতে সম্মাননা-ক্রেস্ট তুলে দিয়েছিলেন কবি রফিক আজাদ এবং কবি বেলাল চৌধুরীর হাতে আমি। পোষায়নি বলে ‘আমাদের সময়’ ছেড়ে দিলেও সেদিনের প্রতিটি ঘটনা আমাকে আজও আলোড়িত করে। ঐ অনুষ্ঠানে ওপারের কবি মৃণাল বসুচৌধুরীর এবং এপারের কবি কামাল চৌধুরীর দুটি বইয়ের পাঠোন্মোচন হয়। ওপারের বইটি বাংলাদেশ থেকে এবং এপারের কবির বইটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত। মৃণাল বসুচৌধুরী ছাড়াও ওপারের আরও দুই গুণীজনকে সম্মাননা জানানো হয়েছিল সে-অনুষ্ঠানে-- কবি শ্যামলকান্তি দাশ ও ভাষাচিত্রী শচীন দাশ। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার নামগন্ধ লক্ষ করা যাচ্ছিল না। এদিকে প্রিন্ট মিডিয়ায় সন্ধ্যার পর থেকেই নিউজ পিক আওয়ার। আমি ছিলাম নিউজপাগল সম্পাদক। বার্তাকক্ষ ডাকলে অন্য সব মনোযোগ শিকেয় তুলে রাখতাম। ফলে দুই বাংলার দায়িত্ব রফিক ভাইয়ের কাঁধে চাপিয়ে আমি চুপিসারে সরে পড়েছিলাম।
শুধু ’আমাদের সময়’ পত্রিকাতেই কবি রফিক আজাদের সঙ্গে এমন অসংখ্য মধুর স্মৃতি আছে আমার। কাজ করতে-করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমি রফিক ভাইয়ের ঘরে গিয়ে তার স্নেহছায়া কুড়াতাম। চা খেতে-খেতে হালকা কোনও বিষয়ে কথা বলতাম। কখনও-কখনও দেশের চলমান রাজনীতি নিয়েও কথা হত। বাদ যেত না কবিতা-প্রসঙ্গও। সবসময়ই তিনি অভিবাবকের মতো বলতেন-- “এত পরিশ্রম করলে হঠাৎ বিছানায় পড়ে যেতে পারো, শাহরিয়ার; শরীরের যত্ন নাও।” নিজেও তিনি সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসতেন আমার ঘরে। অামি তাকে আমার চেয়ার ছেড়ে দিয়ে সম্মান জানাতাম। তিনি বসতে চাইতেন না সম্পাদকের চেয়ারে। আমি জোর করে বসাতাম। তো, অামি পদত্যাগ করার পর রফিক আজাদও আর ঐ পত্রিকার পথ মাড়াননি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি অফিসে গিয়েছিলেন। কাজও শুরু করেছিলেন নিজের ঘরে বসে। এইসময় কেউ একজন সম্পাদকের পদত্যাগের খবরটা দিতেই তিনি পত্রপাঠ চেয়ার থেকে উঠে ’ছিঃ ছিঃ, আমার ভাই পদত্যাগ করেছে আর আমি অফিস করছি’ বলে ৫ মিনিটের মধ্যে ঐ এলাকাই ত্যাগ করেন। পূর্ণ-অবসরে যাওয়ার আগে কবি রফিক আজাদের শেষ কর্মস্থল আমারও কর্মস্থল ছিল-- একথা ভাবতে অন্যরকম ভালো লাগে আমার।
প্রাসঙ্গিক একটি দুঃখের কথাও না-বললে এই স্মৃতিখণ্ড অসমাপ্ত থেকে যাবে। আমি থাকতেই পত্রিকাটিতে উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ’প্রথম আলো’ থেকে অব্যাহতি-নেওয়া কবি আবুল মোমেন। তার সঙ্গেও আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল। তিনি আমার ঘরে ঢুকলে তাকেও নিজের চেয়ার অফার করতাম। তবে তার আচরণ রফিক ভাইয়ের মতো ছিল না। ঘরে ঢুকে তিনি ঐ অফারটিরই প্রতীক্ষা করতেন। সাংবাদিক-ছাঁটাই নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার বিরোধ যখন চরমে, তখন একদিন আবুল মোমেন বিনিয়োগকারীদের দপ্তর ঘুরে এসে ছাঁটাই সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষীয় একটি প্রস্তাবের কথা জানান আমাকে। সম্পাদককে অবগত না-করেই তিনি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় আমার একটু খটকা লেগেছিল। কিন্তু তখনও আমার হোঁচট খাওয়া বাকি। ছাঁটাইয়ের সংখ্যা জানিয়ে মুখে যে ক’জনের নাম নিয়েছিলেন আবুল মোমেন, সেখানে ভাষা সম্পাদক রফিক আজাদও ছিলেন। মিষ্টি গলায় বলেছিলেন -- “রফিক ভাইকে না-হয় আমরা সুন্দর একটি সংবর্ধনার মাধ্যমে বিদায় জানাব।” শুনে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি! হাঁ করে দেখছিলাম আবুল মোমেনকে আর ভাবছিলাম-- এমন একটা লোক কী করে কবি হন?
‘আমাদের সময়’-এ এখন কবি রফিক আজাদ নেই, আমি নেই, আরও অনেকে নেই-- কিন্তু একই বিনিয়োগকারীদের চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত অন্য একটি দৈনিকে (সুপ্রভাত) আবুল মোমেন এখন আগের চেয়েও বেশি সুযোগ-সুবিধাসহ চাকরি করছেন ভাস্কর চক্রবর্তীর সেই বিখ্যাত পংক্তিটির মতো-- “ভেতরে শরীর নেই, কার জামা কার জামা ঝুলছে বারান্দায়?”
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’
(লেখাটি পাক্ষিক ‘মত ও পথ’-এর জুলাই-২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত )