কেউ কেউ আবার সুযোগ পেলেই কবি কাজী নেওয়াজের ‘শিক্ষা গুরুর মর্যদা’ কবিতাটির দুই চার লাইন [“... বাদশাহ কহেন, ‘সেদিন প্রভাতে/দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে/নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,/পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।/নিজ হাত খানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে/ধুয়ে দিল না কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।/উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষক তবে দাঁড়ায়ে সগৌরবে,/কুর্ণিশ করি বাদশাহর তরে কহেন উচ্চরবে-/‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষা গুরুর শির/সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।”] প্রতিপক্ষকে শুনিয়ে দিয়ে মুঘল বাদশা আওরঙ্গজেব আলমগীর এর ভূয়সী প্রশংসায় মেতে ওঠেন। আর আফসোস করে বলেন- আহ! সত্যি যদি বাদশাহ আলমগীরের শাসন আবার ফিরে আসত! কিনা ভাল হত!
অবশ্যই আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা বাদশা আলমগীর পর্যন্ত যেতে চান না। তারা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর মধ্যেই সান্ত্বনা খুঁজে পান। আর সময় সুযোগ পেলেই বলেন- ‘একবার বঙ্গবন্ধুর এক গৃহশিক্ষকের গুটি বসন্ত হয়েছিল। ফলে ওই শিক্ষকের ঘরে কেউ যেতে চাইতো না। বঙ্গবন্ধু শিক্ষকের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি গরম পানি করে শিক্ষককে স্নান করান, বিছানার চাদর বদলে দেন।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর যারা বঙ্গবন্ধুকে শত্রুজ্ঞান করেন তারা খলিফা হারুন-আল রশীদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.) তার পুত্র আল আমীনের শিক্ষককে রাজপুত্রকে প্রহারের অনুমতিও দিয়েছিলেন সেই বিষয়টি উল্লেখ করে আনন্দে গদগদ হন।
কিন্তু শিক্ষকরা ভুলে যান- পৃথিবীর সব শাসকই বাদশা আলমগীর নন। আর ইতিহাসের পাতায় পাতায় শাসকরা শিক্ষকদের সব সময় সম্মান করেছেন এমন ইতিহাস লেখা নেই। খলিফা হারুন অর রশিদ পুত্র খলিফা আল মামুনের সময় আদালতে একজন বিচারক শিক্ষকতা করায় এক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণে রাজি হননি। অথবা আব্বাসীয় আমলের প্রচলিত প্রবাদ- ‘শিক্ষক, মেষপালক বা মেয়েদের সঙ্গে বেশি থাকে এমন পুরুষের কাছ থেকে কোনো উপদেশ চেয়ো না।’ অথবা আরবি সাহিত্যে উল্লেখিত- শিক্ষকরা ‘মোটা মাথার লোক’, ‘প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকরা সবচেয়ে মুর্খ লোক’ ইত্যাদিও ইতিহাসে লেখা আছে। আর এদেশে একজন ইংরেজ ম্যজিস্ট্রেটের তিন পা-ওয়ালা কুকুরের জন্য মাসে ২৫ টাকা ব্যয় এবং পণ্ডিত মশায়ের মাসিক ১৭ টাকা বেতনে ৮ সদস্যের পরিবারের জীবন ধারণের পুরোনা গল্প অথবা ‘বোধ হয় একটু বেশি বাড়িয়ে ফেলেছি বেতনটা। সে জন্য এখন প্রেসটিজ নিয়ে টানাটানি। আর একটু ক্ষুধা থাকলে প্রেসটিজের কথা মনে হত না। ক্ষুধার অন্ন জোগানোর কথা মনে হতো।’ ইত্যাদি ইত্যাদি নাই বা বললাম...।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা না জানলেও ইতিহাসের পাতায় লেখা শিক্ষক নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ভাল করেই জানেন। আর জানেন বলেই তারা তাদের ন্যায্য দাবি আদায় নিয়ে প্রথমদিকে কাগুজে বাঘের হুঙ্কার দিলেও এখন শামুকের মতো নিজের খোলসে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সম্মান ও সম্মানীর ন্যায্য দাবির আন্দোলন এখন ডিপ ফ্রিজে চলে গেছে। ভবিষ্যৎতে ওই ডিপ ফ্রিজ থেকে বের হয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দেশের এ বাস্তবতা হয়ত এখনও বুঝতে পারেননি! তাই তারা তাদের সম্মান রক্ষার্থে আন্দোলন করছেন! কোথাকার কোন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার হাওর এলাকার নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সর্বানন্দ তালুকদার ও তার লোকজন ওই বিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষিকাকে মারধর করেছেন তাই নিয়ে তারা হইচই করছেন! সারাদেশে মানববন্ধন করে অভিযুক্তের শাস্তির দাবি করছেন। আরবি প্রবাদের সুরে বলতে হয় প্রাথমিকের শিক্ষকরা সত্যি মুর্খ! কারণ মুর্খ না হলে কি তারা ওই ছোটখাট বিষয় নিয়ে (সম্মান রক্ষার) আন্দোলন করেন!
যে দেশে হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংকি খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। এর মধ্যে মাত্র তিন চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় ধরনের অংশ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই।’ অথবা ঈদের সময়ে যে দেশের (সাবেক) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাড়িতে তালা লাগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বা লঞ্চ ডুবির পর ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’ বলে মৃত ব্যক্তিদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। যে দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের শ্রেষ্ট বিদ্যাপীঠে বারান্দায় ঘুমিয়ে আর শাসক দলের ছাত্রসংগঠনের নির্যাতনে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর দায়িত্বশীল দেশসেরা শিক্ষকরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকেন। শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য হয় লাখ টাকা। অথবা এমপি-মন্ত্রীর সংখ্যালঘুদের জমি দখলের ঘটনা ঘটে অহরহ বা ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়া যায় অনায়াসে। টেন্ডারবাজি করতে যেয়ে দুইপক্ষের গুলাগুলিতে মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হয় অথবা চাঁদাবাজি করতে যেয়ে দুইপক্ষের গুলিতে দিবালোকে শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
যে দেশের মায়েরা অবৈধ প্রেমকে পরিপূর্ণ উপভোগ করতে শিশু সন্তানদের হত্যা করে অথবা ক্রস ফায়ারের নামে নিরীহ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করা হয়। অথবা যে দেশের বুদ্ধিজীবীরা সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে বেশ্যাবৃত্তি করেন। সেই দেশে কোন ধর্মপাশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সাথে অধর্ম হয়েছে তা নিয়ে এত হইচই করার কী আছে!
আর হইচই করেই বা কি হবে! রাষ্ট্র ও সমাজকে যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের মানসিকতার যদি পরিবর্তন না হয়; তবে ওই ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটতে থাকবে। আজ প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে হয়ত বিদ্যালয়ের সভাপতি সর্বানন্দকে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু এক দুইজনকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে না। তাহলে রাজন হত্যার বিচারের পর এদেশে শিশু হত্যার ঘটনা আর একটিও ঘটত না। কিন্তু আমরা কী দেখছি! প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শিশুর উপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তাই মানুষ গড়ার কারিগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনের মাধ্যমে আজ হয়ত একজন সর্বানন্দকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারবে। কিন্তু সমাজের সামগ্রিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব হবে না। ওই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটবে। তাই ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো সর্বানন্দের জন্ম না হয় আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষকরা সেইদিকে মনোযোগী হবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
লেখক : মো. আবুসালেহ সেকেন্দার, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। salah.sakender@gmail.com
সানবিডি/ঢাকা/এসএস

গোবেচারা শিক্ষকরা নিজেদেরকে সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি মনে করে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। অবশ্যই উপযুক্ত সম্মানী বঞ্চিত ও সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত এ সম্প্রদায়ের ওই আত্মতৃপ্তি বেঁচে থাকার রসদ যোগায়। তাই মাঝে মাঝে তাদের ওই সম্মানে একটু আঘাত লাগলেই তারা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। অনেকে আবার প্রায়শই বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা তাদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদান করছেন না বলে অনুযোগ করেন। পূর্ববর্তী সময়ে শিক্ষকদের সম্মান ঈর্ষণীয় পর্যায়ে ছিল বলে দাবি করেন।