বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নামের 'স্বপ্নের দৈর্ঘ্য' ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। তবে এর সুফল পাবে পুরো দেশ। এটি দেশের অর্থনীতিকেও দেবে নতুন রূপ। নদীর তলদেশ থেকে ১৮ থেকে ৩৬ মিটার গভীরে ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি সুড়ঙ্গ করে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে স্বপ্নের পথ। এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে সুড়ঙ্গের ভেতর তৈরি হয়েছে দুটি টিউবও। নদীর বুক চিরে সেই দুটি টিউবের ভেতর করা হয়েছে চার লেন সড়ক। আসছে ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলে দেবেন এই স্বপ্নের দরজা। এখন প্রায় দেড় হাজার শ্রমিকের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই টানেলের প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, 'অর্থনীতি সুদৃঢ় করতে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই টানেল। টানেল ঘিরে মিরসরাই থেকে মেরিন ড্রাইভ চলে যাবে কক্সবাজার পর্যন্ত। তখন রাস্তার দুই ধারে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমও নদীর ওপারে সম্প্রসারিত করার সুযোগ তৈরি হবে।'
এর অগ্রগতি বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, 'নদী ভেদ করা দেশের প্রথম টানেল এটি; তাই চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। আছে নানা বাধাও। তার পরও আমরা সবকিছু শেষ করছি সুন্দরভাবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে। প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯১ শতাংশ শেষ। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আমরা শেষ করতে পারব শতভাগ কাজ।' টানেলে পুরকৌশল, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক- তিন ধরনের কাজ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ তিন পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার পরই পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু করতে চান তাঁরা। তিনি বলেন, 'সুড়ঙ্গ খনন, রাস্তা নির্মাণ, সংযোগ পথ তৈরির পুরকৌশলের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলছে টানেলের ভেতরে বিকল্প পথ তৈরির কাজ। একটি টিউবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে বিকল্প পথে গাড়ি চালানো যায়, সেটি নিয়ে কাজ করছি আমরা। বাতি ও পাম্প স্থাপন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরির কাজও সমানতালে চলছে।' বাংলাদেশ সেতু কর্তৃৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে টানেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)।
স্বপ্নের নাম 'ওয়ান সিটি টু টাউন': কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের চীনের সাংহাই শহরের মতো চট্টগ্রামেও নগর থাকবে একটি। তবে নদীর দু'তীরে থাকবে দুটি টাউন। এই মর্ম কথা বুকে নিয়ে টানেলের স্লোগান 'ওয়ান সিটি টু টাউন'। শুরুতে এই প্রকল্পের খরচ ধরা হয় ৮ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। পরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা টাকা বেড়ে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার অর্থ সহায়তা দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা সহায়তা দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাংলাদেশকে ২ শতাংশ সুদহারে এই টাকা পরিশোধ করতে হবে ডলারে।
নির্মাণের শুরু থেকেই যুক্ত ছিল দেশি-বিদেশি ১২০০ মানুষ। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩০০ চীনা শ্রমিক। এখানে রাত-দিন নিয়মিত কাজ করছেন অন্তত ৮০০ জন। এর বাইরে প্রতিদিন ৩০০ শ্রমিক দৈনিক হিসেবে কাজ করেন। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করছেন অন্তত ৪০ সেতু প্রকৌশলী। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ২০ থেকে ২৫ জন।
ডিসেম্বরের অপেক্ষা: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, অক্টোবরে টানেলের একটি সুড়ঙ্গ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে; অন্যটি চালু করা হবে নভেম্বরে। টানেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ডিসেম্বরে হবে। তবে প্রকল্প পরিচালক বলছেন, দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত বলতে পারব না আমরা। কারণ ট্রায়াল দিতে গেলে হয়তো নতুন নতুন জটিলতা বের হয়ে আসতে পারে। প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
এনজে