
গল্পের শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা নয়। এ যেন একেবারে বাস্তবের শকুন্তলার নিজগৃহে যাত্রা। আর সেই বিদায় যাত্রায় উপস্থিত ছিলেন গত ৯ বছরের চেষ্টায় মানসিক ভারসাম্যহীন শকুন্তলাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলেছিলেন যে চিকিৎসক, তিনি।
হাসপাতালের যে নার্সরা এতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমে সুস্থ করে তুলেছিল তরুণীকে, যে দুই পুলিশ অফিসার হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হারিয়ে যাওয়া শকুন্তলার বাড়ি খুঁজে বের করে পরিজনদের জানিয়েছিলেন— হাজির ছিলেন সকলেই। এর পরেই আর অপেক্ষা করেননি শকুন্তলার বাড়ির লোকজন। হারিয়ে যাওয়া বোনকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সোমবার হরিয়ানা থেকে ছুটে আসেন শকুন্তলার দুই দাদা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭-এর ১৩ মার্চ জগাছা থানা এলাকায় গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণী। তার বাঁ হাত ভেঙে গিয়েছিল। জগাছা থানার পুলিশ ওই তরুণীকে অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে হাওড়া জেলা হাসপাতালে ভর্তি করে।
হাওড়া জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই তরুণী প্রথমে ফিমেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। পরে তাকে মানসিক ভারমাস্যহীনদের ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। প্রথমে নাম বললেও দীর্ঘ দিন জানা যায়নি ওই তরুণীর সঠিক পরিচয়। শেষে দীর্ঘ চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। নিজেই জানান, তার নাম শকুন্তলা ভরদ্বাজ। বাড়ি হরিয়ানার বরোদা এলাকার গোহানা গ্রামে।
কিন্তু কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল তরুণীর ঠিকানা? হাওড়া জেলা হাসপাতালের মানসিক রোগের চিকিৎসক মুক্তানন্দ কুণ্ডু বলেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চিকিৎসা করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম তরুণী শিক্ষিত। তিনি স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় ভুগছিলেন। চিকিৎসায় সাড়াও মিলছিল। সপ্তাহ দুয়েক আগে বুঝতে পারি উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর পরেই পুলিশকে জানাতে তারাই শকুন্তলার পরিজনদের খবর দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঠিকানা পেলেও ওই প্রত্যন্ত গ্রামের খোঁজ পাওয়া সম্ভব ছিল না। বিশেষভাবে তার দায়িত্ব দেয়া হয় দুই এসআই সৌম্যজিৎ মল্লিক ও আশুতোষ রাইকে। তাদের হরিয়ানাতেও পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। শেষে গুগল ম্যাপ ঘেঁটে প্রথমে উদ্ধার হয় হরিয়ানার গোহানা এলাকা। সেখানকার পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই দুই এসআইয়ের চেষ্টাতেই খোঁজ মেলে শকুন্তলার বাড়ির। গোহানা থানার পুলিশের মাধ্যমে খবর পেয়ে হাওড়ায় ছুটে আসেন তার দুই দাদা রাজেন্দ্র ও জয়পাল ভরদ্বাজ।
দীর্ঘ ৯ বছর পরে বোনকে খুঁজে পেয়ে আপ্লুত দাদারাও। এ দিন রাজেন্দ্র বলেন, ভেবেছিলাম ওকে আর ফিরে পাব না। কারণ ও তো মানসিক ভাবে সুস্থ ছিল না। এ যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। সব থেকে বড় কথা ও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। এখানকার চিকিৎসকদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
হাসপাতাল থেকে খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে যেন আরও খুশি শকুন্তলা। বললেন, খুব ভালো লাগছে। এখানকার মানুষজন সত্যিই খুব ভালো। ডাক্তারবাবু, নার্সদিদিরা আমার চিকিৎসা করেছেন। সালোয়ার কিনে দিয়েছেন। খেতে দিয়েছেন। ওদের কথা ভুলবো না।
হাওড়া হাসপাতালের সুপার নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় বলেন, এ রকম অনেক রোগীকেই আমরা সুস্থ করে তাদের বাড়ি পাঠাতে পেরেছি। এই কাজে সাফল্য পেলে চিকিৎসকরা সত্যিই উৎসাহিত হন।
সূত্র: আনন্দবাজার