টেরেসা মের উত্থান

প্রকাশ: ২০১৬-০৭-১৪ ১৫:২১:১০


heresa_mayম্যাগারেট থ্যাচার, এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময়। এর মধ্যে আর কোন নারী প্রধানমন্ত্রী পাননি গণতন্ত্রের সূতিকাগার খ্যাত যুক্তরাজ্য।হঠাৎই উদ্ভূত এক পরিস্থিতিতে অনেকটা নাটকীয় ভাবে দ্বিতীয়বারের মতো নারী প্রধানমন্ত্রী পেল ব্রিটেন। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ব্রিটেনের ইতিহাসে মাইলস্টোন গড়বে।

কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী থ্যাচার ১৯৭৯ সাল থেকে ব্রিটেনে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিজয়ী হন। এর মাধ্যমে তিনি ১৮৭২ সাল থেকে চলা ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় এই পদে থাকার গৌরব অর্জন করেন। আপোসহীন রাজনীতি ও নেতৃত্বের ধরনের জন্য তাকে ‘লৌহমানবী’খেতাব দেয়া হয়।

১৯৯০ সালের ১ নভেম্বর লৌহ মানবীর সবচেয়ে পুরনো ক্যাবিনেট মন্ত্রী গফ্রি হয়ি উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করলে থ্যাচারের প্রধানমন্ত্রীত্ব হুমকির মুখে পরে। পরের দিন মাইকেল হাসেলটিন কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন। যদিও থ্যাচার প্রথম ব্যালটে জয় পান কিন্তু মাইকেল যথেষ্ট সমর্থন পাওয়ায় দ্বিতীয় ব্যালট আদায় করে নিতে সক্ষম হন। দ্বিতীয় ব্যালটে থ্যাচার চার ভোট কম পান। প্রাথমিকভাবে তিনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে ক্যাবিনেটের পরামর্শে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন। এসময় তিনি নিজেকে বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হয়ে বিতাড়িত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। থ্যাচারের পর জন মেজর পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী  হন।

থ্যাচারের শাসনামলের প্রায় ২৫ বছর পর কনজারভেটিভ পার্টি দলের এবং দেশের নেতৃত্ব দিতে বেছে নিলেন আরেক নারী টেরেসা মেকে। ডেভিড ক্যামেরনের স্থলাভিষিক্ত হলেন টেরেসা। গত ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গণভোটে হেরে গিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন ক্যামেরন।

যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি না, তা নিয়ে গণভোটের ঘোষণা গত বছর দিয়েই দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসেছিলেন ৪৯ বছর বয়সী ক্যামেরন।

২০১০ সালে কনজারভেটিভ পার্টি ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে নির্বাচন করলেও পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পেতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং কিছুটা বাধ্য হয়েই লিবারেল ডেমোক্রেট দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় যান তিনি। ব্রিটেনের গত ৭০ বছরের ইতিহাসে যা ছিল প্রথম। কিন্তু ২০১৫ সালে ক্যামেরনের দল পার্লামেন্টে সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠা অর্জন করে। যদি ব্রেক্সিট ইস্যুর কারণে তিনি গত ২৩ জুনই পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

১৯০২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ১৬বার মধ্যমেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ পরিবর্তনই হয়েছে কনজারভেটিভ পার্টিতে।

সদ্য ভেঙে যাওয়া যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক নিয়ে দেশের প্রতিনিধি হিসেবে টেরেসা মে-কে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার আগে প্রয়োজন তার দলের মধ্যে একতা। সম্প্রতি ব্রেক্সিট ইস্যুতে মতানৈক্য দেখা গিয়েছে কনজারভেটিভ দলে। এছাড়াও ব্রিটেনবাসী অর্থনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে এই মুহূর্তে দ্বিধাবিভক্ত।

এমকি তার নিজের মুখে বলা ‘অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী’ এই শব্দটি তাকে সবচেয়ে বেশি বিব্রত করছে। ২০০৭ সালে লেবার পার্টির নেতা টনি ব্লেয়ার পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন গর্ডন ব্রাউন। সেই সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন টেরেসা মে। কনজারভেটিভ ওয়েবসাইটে এক ব্লগে ব্রাউন প্রসঙ্গে মে লিখেছিলেন, ‘ব্লেয়ারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য তার কোন গণরায় নেই।’

এছাড়া ২০১০ সালে নির্বাচনী প্রচারণা কনজারভেটিভ দলের মুখ ক্যামেরন বলেছিলেন, কোন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের ছয় মাসের পর স্বয়ংক্রিয় ভাবে পার্লামেন্ট ভেঙে যাবে এমন আইন পাশ করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের দাবিও তুলেছিলেন তিনি।

২০১০ সালে ক্যামেরন যা বলেছিলেন সেটা কি বিরোধী লেবার পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্রেট দল ভুলে গিয়েছে! গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর দৌড় থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন অ্যাড্রিয়া লিডসম। সেই সময়ে বিরোধীরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তুলেছিলেন। এমনকী মের ভাষায় তারা এও দাবি করছে যে, কনজারভেটিভ পার্টিরও মের পক্ষে কোন গণরায় নেই।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন মে। তিনি বলেছেন, জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য ২০২০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এছাড়া টেরেসা মের জন্য রয়েছে আরো সুখবর। কারণ এই মুহূর্তে অন্তর্কোন্দলে জেরবার প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি। জুনে অনুষ্ঠিত গণভোট নিয়ে দলের প্রধান জেরেমি করবিনের ওপর অনাস্থা দেখিয়ে এক ডজনেরও বেশি ছায়ামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।

বলা হচ্ছে, গণভোটের এই রায় ব্রিটেনের দুর্যোগ ডেকে আনবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মের নির্বাচন চলমান রাজনৈতিক সংকট এবং দ্বিধাবিভক্তি কাটিয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক জগতে মে আপোসহীন এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন নেত্রী হিসেবে পরিচিত। ধারনা করা হচ্ছে মে দেশকে সঠিক নেতৃত্বই দেবে। চলমান দ্বিধাবিভক্তি এবং অথনীতিক সংকট দূর করে মের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ‍যুক্তরাজ্যের পরিপক্ক গণতন্ত্র এবং রাজনীতি ধরে রাখবে।

এই সরকারের মেয়াদে মে আরো চার বছর প্রধানমন্ত্রীর আসনে থাকবেন। আশা করা হচ্ছে এরপরেও মের বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব ২০২০ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাকে বিজয়ী করবে।