
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে নারী ও পুরুষের অনুপাত ১০০ঃ১০৪. পূর্বে এ অনুপাতের তারতম্য আরও অধিক ছিলো।সে হিসেবে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই নারী। কিন্তু নারীদের অবস্থান আমাদের সমাজে খুব একটা সুখকর ছিলো না।সুদুর অতীতকাল থেকেই নারীরা শিক্ষা,পেশা, স্বাস্থসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অবহেলিত ছিলো।তাদের গৃহ বন্দি জীবন যাপন করতে হতো।পরিবার ও পরিবারের বাইরে উভয়ক্ষেত্রে তারা নির্যাতিত হতো,উপেক্ষিত হতো। তারা ছিলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের হাতের পুতুল। ১০০-২০০ বছর আগেও আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থান খুবই দুর্বল ছিল।সামাজিক,রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক - সকল ক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে ছিলো।
তার কিছু কিছু প্রমাণ বেগম রোকেয়া,সুফিয়া কামেলের মতো বিখ্যাত লোকের লেখনির মাধ্যমে জানতে পারি। নারীদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে যেসকল কারণ গুলোকে দায়ী করা যায় তা হচ্ছে---
১. দরিদ্রতা।
২. শিক্ষার অভাব।
৩. পুরিষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা।
৪. পুরিষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
৫. সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোড়ামী
৬. কৃষিভিত্তিক অর্থব্যবস্থা।
৭. দুর্বল অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো।
৮. সচেতনতার অভাব ইত্যাদি।
নারীদের এই পিছিয়ে থাকার প্রভাব আমাদের সমাজে যথেষ্ঠ। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে দেশ ও সমাজ কখনও এগিয়ে যেতে পারে না।সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেমে আসে স্থবিরতা।ফলে, হয় দেশের সামাজিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে,নতুবা তা পিছিয়ে পড়ে।
নারীদের পাশাপাশি অবস্থানের কারণেই আমেরিকা,রাশিয়া,জার্মানি,ব্রিটেইন, চাইনাসহ কিছু দেশ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নত। আর নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণেই এশিয়া,আফ্রিকা,ল্যাটিন আমেরিকার মতো দেশ অনুন্নত।
এদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে নারীদের পিছিয়ে পড়াকেই অনেকাংশে দায়ী করা হয়। কিন্তু কালক্রমে নারীদের সে অবস্থা আজ আর নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা তাদের সেসকল বাধাকে অতিক্রম করতে সচেষ্ট হয়েছে। শিক্ষা,স্বাস্ত্য, পেশাসহ সকল ক্ষেত্রে তারা উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে নারী শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।দুই দশক আগেও যেখানে নারীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে পিছিয়েছিল,সে অবস্থা আর নেই। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র ও ছাত্রীদের অনুপাত ৫১ঃ ৪৯. মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মেয়েরা ছেলে শিক্ষার্থীদের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে গেছে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে নয় মাধ্যমিক স্তরেও মেয়েরা অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে।দেশে এখন মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে ও ছেলে শিক্ষার্থীর অনুপাত ৫৩ঃ৪৭। বিশ্ব সূচকে প্রাথমিক নারী শিক্ষায় এবছর ৩ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১ তম। যদিও উচ্চ শিক্ষায় মেয়েরা কিছুটা পিছিয়ে, তবুও এর ব্যবধান খুব নয়।উচ্চ শিক্ষায় নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর অনুপাত ৪৫ঃ ৫৫।
অদূর ভবিষ্যতে নারীরা যে পুরুষদের ছাড়িয়ে যাবে এটা তারই ইঙ্গিত। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমাদের কলেজের প্রথম ১০ জনে আমি আর আমার দুই বন্ধু ছাড়া সবাই মেয়েছিলো।আর বিশ্ববিদ্যালয়েও সেই একই চিত্র। প্রথম ১০ জনে আমার দুই বন্ধু ছাড়া বাকি ৮ জনই বান্ধবী।
নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কারণ সরাসরি জড়িত-
১. অর্থনৈতি উন্নয়ন।
২. তথ্য ও শিল্প বিপ্লব।
৩. শিক্ষার ব্যাপক অগ্রগতি।
৪. সচেতনতাবোধ ইত্যাদি।
তবে একথাও সত্ব যে নারীদের এ সাফল্য কেবল সংখ্যায়। বাস্তবে তাদের কার্যক্রম খুবই কম। দেশে মাত্র ১০% নারী কর্মক্ষেত্রে জড়িত।তার মধ্যে ৮% ই গার্মেন্টস কর্মী বা দিনমজুরের কাজ করে।স্ট্যান্ডার্ড পেশায় মাত্র ২% নারী জড়িত।এটি খুবই দুঃখজনক। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করার পরে নিজের ইচ্ছা থাকার পরেও পারিবারিক নতুবা সামাজিক কারণে নারী কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে না।
তাই দেশ ও সমাজকে এগিয়ে নিতে আমাদের সকলের উচিত হবে নারীদেরকে পুরুষের পাশাপাশি নিয়ে আসতে।তাদের সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করতে।নারীদেরও এক্ষেত্রে স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।তবেই ভবিষ্যতে আমাদের উন্নত সমাজ কাঠামো গড়ে উঠবে।
সানবিডি/ঢাকা/আহো