
চার দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলার মাটিকে রক্ত দিয়ে পবিত্র করে যাকে সপরিবারে শহীদ হতে হয়েছিলো তার সম্পর্কে দুটি বাক্য লিখতে আর কার কি হয় জানিনা, আমারতো হাত কাঁপে। এতো বড় মাপের মানুষ তাকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার মতো নগন্য একজনের থাকতেই পারে না। আমি তার ভক্ত-সৈনিক। আমার চারপাশে তার সাথে তুলনীয় কোন রাজনীতিককে দেখিনা। আমার পাঠ করা ইতিহাসের পাতাতেও নেই।
বাংলাদেশতো দূরের কথা সারা দুনিয়াতেই তিনি একজন। তিনি কেবল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নন। তাকে আমি মনে করি একজনই বাঙালি, যার মাঝে বাঙালিত্বের পুরোটা আছে এবং সেজন্য তিনি সকল বাঙালির, সকল বাংলা ভাষাভাষীর অনুসরণীয়। অথচ চারপাশে তাকে নিয়ে কোটি কোটি হরফ দেখি। যিনি যেভাবে চান তাকে সেভাবেই উপস্থাপন করছেন। কেন জানি মনে হচ্ছে তার নীতি, আদর্শ বা কর্মপন্থাকে আমরা এখনও সেইভাবে মূল্যায়ন করিনা যেভাবে সেটি করা দরকার। অনেক ভাবনা থেকে তার সম্পর্কে একটি দুই পাতার নিবন্ধ লেখার সাহসও এতোদিন পাইনি। এবার যখন ৬৮ বছরে পা দিলাম তখন মনে হলো এই মাহমানব সম্পর্কে নিজের ভাবনাটা প্রকাশ করে যাওয়াটা নিজের কাছে জবাবদিহি করার মতো একটি বিষয়। নইলে এক সময়ে মনে হবে আমি তাকে যেমনটি ভাবি সেটিতো কাউকে বলিনি।
তার নাম শুনেছি ৬৬ সালে, যখন ঢাকা কলেজে পড়ার সময়ে ছাত্রলীগ করা শুরু করি। সেখানেই ছয় দফা নামক একটি লিফলেট বিলাতে গিয়ে প্রথম জেনেছি যে বাঙালিরা তাদের প্রাপ্য পায় না। তারপর ১১ দফায় সেই ছয় দফা যুক্ত হয় আর রাজপথে তার মুক্তির দাবিতে মিছিল করা দিয়ে নিজের শ্লোগান দেবার ক্ষমতাকে শাণিত করি। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগন্য একজন কর্মী হিসেবে তার সামনে যাবার কোন কারণই ছিলো না। তবে যারা তার কাছে থাকতেন তাদের সাথে আমরা দিন-রাত কাটাতাম বলে তার ব্যক্তিগত ভাবনা-জীবনাচার বা রাজনৈতিক দর্শন জানতে পারতাম। সেই মানুষটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তার জীবন নিয়ে ইতিহাস লেখার কোন ইচ্ছাই আমার নাই। অনেকে লিখেছেন, লিখবেন এবং সারা বিশ্ব তাকে নিয়ে গবেষণা করবেন, বর্তমানের প্রেক্ষিতে এটাই স্বাভাবিক। গত কয়েক বছরে তার কন্যা বাংলার স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে যেখানে স্থাপন করেছেন তাতে সারা বিশ্বকে জানতেই হবে, কে এই দেশের জনক এই শেখ মুজিবুর রহমান। এক সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের তলাহীন ঝুড়ির দেশ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সামনে আদর্শ দেশ।
আমাদের এই দেশটির জনক প্রথম আমাকে আকৃষ্ট করেন তার অতি সাধারণ জীবন যাপন, সহজ সরল অভিব্যক্তি এবং স্পষ্টবাদিতায়। ঢাকা কলেজ থেকেই তার বড় ছেলে শেখ কামালকে চিনতাম। শেখ কামালের মাঝে তার পারিবারিক ধারার প্রতিপলন ছিলো। ৭০ সালে সারা বাংলাদেশে তিনি যখন অবিসংবাদিত নেতা তখন তার জ্যেষ্ঠ্য কন্যা শেখ হাসিনার সাথে পরিচয় হয়। তিনি তখন বিবাহিতা। তাকে দেখে আমি আরও অভিভূত হই। যার অঙ্গুলি হেলনে পাকিস্তান কেঁপে ওঠে সেই মানুষটির বড় মেয়ে তাতের শাড়ি পরে সহপাঠীদের সাথে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই মিশে, এটি শেখ হাসিনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
শেখ কামালও তাই ছিলো। আমাদের সাথে নাটক করতো। তাকে দেখেও কেউ ভাবতে পারতো না যে তার পিতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য জনগণের রায় পেয়ে আছেন। আমি স্মরণ করতে পারি তখন তিনি কেবল তার রাজনৈতিক দল নয়, ছাত্র বা শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদেরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। এমনকি তাদের পারিবারিক তথ্যও মনে রাখতেন। সেই মানুষটির সাধারণ মূল্যায়ন যখন আমরা করি তখন কেবল তার বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টিকে প্রাধ্যান্য দিই। যে সময়ে ব্রিটিশরা পুরা উপমহাদেশটিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে কলঙ্কিত করে দুটি অদ্ভুত রাষ্ট্র বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো এবং পুরো উপ-মহাদেশের তাবত বড় বড় রাজনীতিবিদরা সেই সাম্প্রদায়িকতাকেই মাথায় তুলে নিয়েছিলেন তখন তিনি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের বিপরীতে একটি ভাষাভিত্তিক আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের দূরদর্শী স্বপ্ন দেখেন। এই অঞ্চলে ভাষারাষ্ট্র ধারণা তখন মোটেই গুরুত্ব পায়নাই।
ভারত বহুভাষিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। খুব সঙ্গত কারণেই ভারতের ধর্ম রাষ্ট্র হবারও খুব সুযোগ ছিলো না। তবুও ব্রিটিশরা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করেছিলো। ভারতের নেতারাও সেটি প্রচ্ছন্নভাবে মেনে নিয়েছিলেন। তবে পাকিস্তান হয়ে ওঠে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু সেই মানুষটি যিনি বাংলাদেশের অন্তরকে অনুভব করেন এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং বাঙালি যে তার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সবার ওপরে ঠাঁই দেয় এবং তার এই জীবনধারায় ধর্ম যে প্রধান শক্তি নয় সেটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। আমি নিজে অভিভূত হই যখন দেখি যে তিনি পাকিস্তানের কাঠামোতে থেকে তার রাজনৈতিক সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি উপড়ে ফেলে দিতে পারেন।
যে মানুষটি নিজেকে স্পষ্ট করে দুনিয়ার কাছে তুলে ধরতে পারেন যে তিনি বাঙালি এবং মুসলমান সেই মানুষটি পাকিস্তানের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের চোখের সামনে পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক সংগঠনকে ধর্ম নিরপেক্ষ করতে পারেন! আজ তার মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পর আমাদের আইন মন্ত্রীকে বলতে হয় যে আমরা অবশ্যই ৭২ সালের সংবিধানে ফেরৎ যাবো। ভাবুন দেখি, তিনি কেবল মুসলিম শব্দ বর্জন করেননি, মুসলমানদের রাষ্ট্র পাকিস্তানকে টুকরো করে সেখানে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। আমার জানা মতে তার হাতে তৈরি ৭২ সালের সংবিধানটি হচ্ছে দুনিয়ার অন্যতম সেরা সংবিধান যার সাথে তুলনা করার মতো কোন সংবিধান অন্তত এই অঞ্চলে পাওয়া যায় না। এই সংবিধানকে ছিন্নভিন্ন করে জিয়া ও এরশাদ কেবল যে সাম্প্রদায়িকতা যুক্ত করে তাই নয় এর গণতান্ত্রিক চরিত্রও বিনষ্ট করে। আমাদের জন্য দুঃখজনক যে ৭৫ থেকে ৯৬ অবধি দেশে এমন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি গড়ে তোলা হয় যে বঙ্গবন্ধুর কন্যার পক্ষেও এখন ৭২-এর সংবিধানের মূল চরিত্রে ফেরৎ যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখন যদি তিনি সেই কাজটি করেন তবে রাজনীতির ছকটাকে উল্টানোর অপচেষ্টা করা হবে এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক, জঙ্গী ও একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার রাজনীতি প্রবলভাবে জোরদার করা হবে।
বঙ্গবন্ধুর বাঙালিত্ব, তার প্রতি একনিষ্ঠতা এবং জাতিস্বত্ত্বা বিষয়ে অত্যন্ত ষ্পষ্ট নীতিমালা আমার মতো লাখো লাখো তরুণকে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠনে জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যারা এখন মনে করেন যে, পাকিস্তান আমাদেরকে ঠকিয়েছে, ন্যায্য পাওনা দেয়নি এবং বনিবনা হয়নি বলে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে তারা বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শকে বুঝতেই পারেন না। তার ৭২ সালের সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিলো চারটি। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপক্ষেতা ও জাতীয়তাবাদ। ধীরে ধীরে আমরা সেই চার নীতির গণতন্ত্র ছাড়া বাকি সবগুলোকেই এড়িয়ে চলেছি। আজকের বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র শব্দটি কেউ উচ্চারণ করে না। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে সমাজতন্ত্র ছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই। হয়তো কার্লমার্ক্সের সমাজতন্ত্র ডিজিটাল যুগে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, কিন্তু ধনী গরীবের বৈষম্য দূর করতে ডিজিটাল যুগের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই। এক সময়ে কায়িকশ্রম নির্ভর মালিক শ্রমিক কাঠামোটি দিনে দিনে মেধাশ্রম ভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে শ্রেণিচরিত্র বা শ্রেণি সংগ্রামের সংজ্ঞা বদলাবে। কোন এক মার্ক্সকে নতুন করে সমাজতন্ত্রের কথা বর্ণনা করতে হবে-ব্যাখ্যা করতে হবে। তবে সমাজতন্ত্র যে বৈষম্যহীনতার ধারণাকে জন্ম দিয়েছে সেটি দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে না। বরং সমাজতন্ত্রের ডিজিটাল ধারাটির জন্য সারা দুনিয়ায় নতুন করে লড়াই চলবে।
অন্যদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য বাংলাদেশকে আবার লড়াই করতে হচ্ছে। জিয়া-এরশাদ-খালেদা বাংলাদেশকে যেভাবে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার অপচেষ্টা করেছে এবং সারা দুনিয়ার ধর্ম পরিস্থিতি যেমনটা তাতে বাংলাদেশের জন্য ধর্মনিরপেক্ষেতা বজায় রাখাকেই একটি বড় চ্যারেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। একই কারণে বাঙালির জাতিস্বত্ত্বা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের মূল কথাগুলো তুলে ধরা হয়নি বলে এখন তরুণরা ইসলামি জঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুকেতো বটেই পুরো বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানিরা অমুসলিম বানাতে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। একাত্তরে তারা স্পষ্ট করেই বলেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা মুসলমান নয়।
বঙ্গবন্ধুর জন্য আমার চোখের পানি আসে আরও একটি বিশাল কারণে। তাকে ছাড়া আমি নিজেকে অসহায় মনে করছি। আমার নিজের মতে বঙ্গবন্ধুর মতো আর কোন রাষ্ট্রনায়ক বাঙালির মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেননি। আমি সেই মুজিবের কথা ভাবি যে, মুজিব অপটিমা মুনীর টাইপরাইটার বানিয়েছিলেন। আমি সেই মুজিবের কথা ভাবি যিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার আগেই বলেছিলেন, ভুল হোক শুদ্ধ হোক আমরা সরকারি কাজে বাংলাই লিখবো। কালক্রমে সেই মুজিবের আদর্শ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সরে গেছে। বাংলাদেশের বেসরকারি অফিসে বাংলা বর্ণমালাই নেই। সরকারের কাজে-কর্মে ডিজিটাল করার নামে বাংলা হরফকে বিদায় করা হয়। উচ্চ আদালতে ও উচ্চ শিক্ষায় বাংলা নেই।
যে মানুষটি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছিলেন সেই মানুষটির দেশে এখন চারপাশে রোমান হরফের রাজত্ব দেখি। আমি চাইনা আমার অনুমান সত্য হোক, কিন্তু মনে হচ্ছে এক সময়ে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বা গ্রামের মানুষ ছাড়া বাংলা হরফই আমরা দেখবো না। যে ভাষা রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন সেখানে থেকে সরে গিয়ে আমরা কোন জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলছি সেটি আমি মোটেই বুঝিনা। আসুন না সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষারাষ্ট্রটাকেই বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করি। আসুন সকল ক্ষেত্রে সেই একজন বাঙালিকেই অনুসরণ করি।
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক