
অনেক আগে একবার ভয়াবহ বন্যায় নদীতে বিশাল বড় এক সাপ ভেসে আসে। সাপটি দেখতে ঠিক একটা বড়সড় তাল গাছের মতো হবে। বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর সবাই নদীর পাড়ে এটাকে পড়ে থাকতে দেখে তাল গাছ মনে করে ঘাট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। মাঝে মাঝে কেউ একলা ঘাটে গেলে আর ফিরে আসতো না। একদিন সকালবেলা একজন মহিলা বাসন পরিষ্কার করার জন্য চুলা থেকে গরম ছাঁই নিয়ে আসে। মেসময় আরো অনেকে ঘাটে গোসল করছিলো। গরম ছাইয়ের আঁচে তখন সাপটি নড়েচড়ে ওঠে। এরপর সবাই বুঝতে পারে আসল ঘটনা এবং সাপটিকে কুপিয়ে মেরে ফেলে। এই ঘটনার কোনো সত্যতা নেই। এটা নিছক একটা গল্প। যে ঘটনার সত্যতা আছে সেটা হলো ভারত থেকে ভেসে আসা হাতি ‘বঙ্গ বাহাদুর’।
আমার উপরিক্ত গল্পের তাৎপর্য হলো বর্তমান দেশের পরিস্থিতিতে মিডিয়ার অবস্থান। কোনো দেশের সংবাদ মাধ্যম সেই দেশের আর্থ-সামাজিক চিত্র তুলে ধরার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের সামগ্রিক চিত্র পাল্টাতে মিডিয়ার গুরুত্ব অপরিসিম। কথাই আছে, কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। বিগত কয়েক বছর আগেও যখন এতো সংবাদ-মাধ্যম ছিলো না তখন দেশের খবর জানার জন্য মানুষ রেডিও এবং বিটিভির রাত ৮ টার সংবাদকেই বেছে নিতো। কিন্তু এখন দেশে চ্যানেল এবং বিভিন্ন পত্রিকার অভাব নেই। সাথে আছে শতশত অণলাইন নির্ভর সংবাদ মাধ্যম। এক ঘন্টা পরপর টেলিভিশনের চ্যানেলগুলো সংবাদ প্রচার করে যাতে দেশের মানুষ তাৎক্ষনিক সব খবরাখবর জানতে পারে। কিন্তু ইদানিং তুচ্ছ একটা বিষয়কেও এসব মিডিয়া নিয়ে যাচ্ছে গুরুতর পর্যায়ে। কিছু কিছু মিডিয়ার সাংবাদিকদের কাছ তো আবার একজন সেলিব্রেটি হলে রাত দিন তার খোঁজ খবর নিয়ে সংবাদ বানানো। এখন এমনও শোনা যায় মিডিয়ার কল্যাণে নাকি হিরোও হওয়া যায়। তার বড় প্রমাণ বর্তমানে হিরো আলম।
দেশ যখন জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মধ্যে অস্তিত্বের সংকটে, ভয়াবহ বন্যার কারণে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে বন্যাকবলিত মানুষ, ঠিক তখন খবরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে একটা হাতি। একাট হাতিকে নিয়ে খবরের কাগজগুলো ও অনলাইন মিডিয়াগুলো প্রতিদিন খবর প্রচার করছে। ভারত থেকে বিশেষজ্ঞ দল ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেও বাঙ্গালি বীরের জাতি হাল ছাড়েনি।
বাংলাদেশে একটি ঘটনার নিচে আরেকটি ঘটনা চাপা পড়ার নজির আছে। ফেলানি, সুজন, তনু, মিতু এসবের দৃষ্টান্ত উদাহরণ। তাই কৌশলগতভাবে ভারত বাণের জলে একটি হাতিকে নামাতেই পারে। যাতে ভারতের পানি ছাড়ার খবর নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে হাতি নিয়ে পড়ে থাকে মিডিয়া। এবং এটা যদি সত্যিই ভারতের কোনো চাতুরতা হয় তবে তারা স্বার্থক হয়েছে বলতে হবে। কয়েকদিনে হাতিকে নিয়ে খবরে তা স্পষ্ট। ভারত থেকে আসা হাতিটির নাম বঙ্গ বাহাদুর। বঙ্গ বাহাদুর গত ২৮ জুন ভারতের আসাম থেকে বন্যা পানিতে ভেসে আসে। এরপর ৪৫ দিন ধরে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুরের বিভিন্ন চরাঞ্চলে বন্যার পানিতে ঘুরে বেড়ায়। এবং অবশেষে মারা যায়।
বন্য পশু আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অনিবার্য এটা মানতে হবে। তাই বলে একটা হাতকে নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করার কোনো মানে হয় না। যেখানে হাজার হাজার মানুষের না খেয়ে থাকা ও মানবেতর জীবন-যাপন অপেক্ষা হাতিটির মূল্য মিডিয়ার কাছে বেশি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে অনেকে হাতিটিকে নিয়ে নানারকম স্টাটাস ও কমেন্টস করছে। অনেকে আবার সাংবাদিকদের গালিগালাজও করছে। এর জন্য দায়ি এরা নিজেরাই। সংবাদপত্রের কাজ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করে দেশের মানুষকে সচেতন করা। একটা হাতি না খেয়ে আছে, পায়ের শিকল ছিরে পালালো এই জাতীয় খবরে দেশের মানুষ কি জানকে পারছে বা কতটা সচেতন হবে?
একটা প্রবাদ দিয়ে আমার কথা শেষ করছি, ‘হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা আর মরলেও লাখ টাকা’। সুতরাং একটি হাতি দিয়ে যদি মোড় ঘুরানো যায় তাহলে সেটাই তো ভারতের কাছে উত্তম। বাঁচলে তো ভালো, মরলেও ক্ষতি নেই। না খেয়ে মরুক দেশের মানুষ, দিনশেষে হাতিই হোক খবরের শিরোনাম!
সানবিডি/ঢাকা/আহো