
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার এক যুগ পার হলো। এখনো বিচারের অপেক্ষায় আছেন ওই ঘটনায় হতাহতের স্বজনরা। কিন্তু তারিখের পর তারিখ পার হলেও, শেষ হচ্ছে না মামলার বিচারকাজ। ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলাকারী ১৮ আসামি এখনো পলাতক। পুলিশ তাদের ঠিকানাই খুঁজে পাচ্ছে না। এ অবস্থায় মামলার বিচারকাজ এ বছরও শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। মামলাটি এখন আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। মোট ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। ২২৪ নম্বর সাক্ষী সিআইডির এএসপি মো. ফজলুল কবিরের জেরা চলছে। মামলার পরবর্তী সাক্ষীকে জেরা করার জন্য বিচারক মো. শাহেদ নূর উদ্দিন আগামী ২২ ও ২৩ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অবস্থিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ এজলাসে মামলার বিচারকাজ চলছে।
এ মামলার মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার চলছে। ইতিমধ্যে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চারজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যারা জোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই) ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘এ মামলার বিচারিক কাজ শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। নিয়মানুযায়ী সব আইন-কানুন মেনে এ মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।
আমাদের উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসন কায়েম করা।’ পুলিশ বলছে, আসামিরা তাদের ঠিকানা ও নাম পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় বসবাস করছে। সেজন্য তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়ানো আসামিদের বিরুদ্ধে এখনই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ এ আসামিরা যদি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাদের আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, পলাতক আসামিদের পক্ষে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাভাবিক গতিতে মামলার বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে যেসব বাধা ছিল, তার সমাধান করা হয়েছে। এখন অভিযোগ প্রমাণের জন্য যতজনের প্রয়োজন, কেবল ততজনের সাক্ষ্য নেওয়া হবে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতা-কর্মী। এদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন।
আহতরাসহ নিহতদের স্বজনরা বিচারের অপেক্ষায় আছেন। সাজানো তদন্ত : গ্রেনেড হামলার দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শুরু থেকেই তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। তদন্তের নামে বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ একটি মহলের প্রভাব ছিল বলে শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল। পরে একাধিক তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন : ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে চারদলীয় জোট সরকার। সেই কমিশনও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অপপ্রচারের পথ ধরেই চলেছিল। এক মাস ১০ দিনের মাথায় কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে বলে, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে বিদেশি শক্তি বলতে কোনো দেশের নাম বলা হয়নি। জজ মিয়া নাটক : ঘটনার ১০ মাসের মাথায় নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে সিআইডি আটক করে।
১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে সিআইডি সাজানো জবানবন্দি নেয়। এই জজ মিয়াকে দিয়েই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে তদন্তের নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ প্রচার করেছিলেন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। সিআইডির এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও এই সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান।
এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন বলে পরে তদন্তে জানা গেছে। এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেফতারের পর থেকেই সিআইডি তার পরিবারকে মাসে মাসে ভরণ-পোষণের টাকা দিয়ে আসছে।
জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি। সত্য উদ্ঘাটনের শুরু : ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এ মামলা তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তাতে বেরিয়ে আসে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল। তদন্ত শেষে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন।
তাতে হুজির নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। পিন্টু ছাড়া বাকি সবাই হুজির জঙ্গি। অধিকতর তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম : ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়।
উভয় অভিযোগপত্র মিলে মোট আসামির সংখ্যা ৫২। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ হত্যা মামলায় ৫২ ও বিস্ফোরক মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্যে বিস্ফোরক মামলায় সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের সাবেক ১১ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয় আদালত। মামলার পলাতক আসামিরা হলেন : বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক এমপি শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, লিটন, হানিফ পরিবহনের হানিফ, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, এ টি এম আমিন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, রাতুল বাবু, খান সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান খান।
জামিনে থাকা আসামিরা হলেন : লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক, খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সাবেক সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, এএসপি আবদুর রশিদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম। এ ছাড়া বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন জোট সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ মোট ২৫ জন।
তদন্ত কর্মকর্তা ছয়জন : সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ এই মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা। অন্য কর্মকর্তারা হলেন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই মো. আমির হোসেন, গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. শামছুল ইসলাম, সিআইডির সাবেক এএসপি মো. আবদুর রশিদ এবং এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও সিআইডির সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির। ভুল পথে তদন্ত চালিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে রাখার অভিযোগে সিআইডির সাবেক এএসপি মো. আবদুর রশিদ এবং এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও সিআইডিতে মামলার সুপারভিশন কর্মকর্তা সিআইডির সাবেক পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মামলা করেন পঞ্চম তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি ফজলুল কবির। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন