সম্ভাবনাময় সিরামিক শিল্পখাত ধুকছে নানাবিধ সংকটে
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৫-০৪-১৩ ২১:০৪:১২

“নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে ব্যাহত সিরামিক খাতের শিল্পের অগ্রযাত্রা। ফলে উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। এতে কার্যাদেশ হারাচ্ছে আমদানি-বিকল্প এই সম্ভাবনাময় রপ্তানিখাত। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে।” এমনটি জানালেন বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফেকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিসিএমইএ)-এর সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মামুনুর রশীদ এফসিএমএ। তিনি এক্স সিরামিক্স-এর এডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও আইসিএমএবি’র সাবেক প্রেসিডেন্ট।
সম্প্রতি বিসিএমইএ’র নেতৃবৃন্দ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এই শিল্প খাতের সুরক্ষায় শুল্ক প্রত্যাহার’সহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন শিল্পমালিকগণ। সম্ভাবনাময় সিরামিক শিল্পখাতের সংকটময় পরিস্থিতিতে এক সাক্ষাৎকার মামুনুর রশীদ জানালেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশকে।
প্রশ্ন : কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সিরামিক শিল্প। অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছে আপনাদের দাবি কি?
মামুনুর রশীদ এফসিএমএ : দেশীয় সিরামিক শিল্প রক্ষায় সিরামিক ও স্যানিটারি পণ্যে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ৩ দফা জানিয়েছি আমরা বাংলাদেশ সিরামিক উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতি (বিসিএমইএ)-এর পক্ষ থেকে। আমাদের অন্য ২টি দাবি হচ্ছে, সিরামিক শিল্পে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য পুনরায় বৃদ্ধি না করা এবং গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে আমরা সরকারের কাছে এই ৩ দফা দাবি জানান।
প্রশ্ন : কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সিরামিক শিল্প?
মামুনুর রশীদ : সিরামিক খাতটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং আমদানি-বিকল্প পণ্যের যোগানে দিয়ে যাচ্ছে এই শিল্পখাত। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে উদ্যোক্তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানির মাধ্যমে দেশে বয়ে আনছে বৈদেশিক মুদ্রা এবং এ খাতটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চরম বেকারত্বের দেশে কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় দিগন্ত হিসেবে বিরাজ করছে সিরামিক শিল্প খাত। ইতোমধ্যে আপনারা অবগত হয়েছেন যে, দেশে বর্তমানে টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার মিলিয়ে মোট ৮০টির অধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এসব কোম্পানিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে সিরামিক পণ্যের বাজার ৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার। দেশের সিরামিক টাইলস ও স্যানিটারি পণ্যের চাহিদা শতকরা ৮৬ ভাগ এবং টেবিলওয়্যার পণ্যের শতকরা ৯৮ ভাগ চাহিদা দেশীয় কোম্পানিগুলো পূরণ করেছে।
প্রশ্ন : সিরামিক শিল্পের কাচামাল ও উপকরণ সম্পর্কে বলুন।
মামুনুর রশীদ : সিরামিক একটি গ্যাসনির্ভর প্রসেস ইন্ডাষ্ট্রি। সিরামিক শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস কাঁচামালের উপকরণ হিসাবে গণ্য হয়। এই শিল্পে গ্যাসের বিকল্প কোন জ্বালানী ব্যবহারের সুযোগ নাই। পণ্য প্রস্তুত করতে নির্দিষ্ট মাত্রার চাপে কারখানায় ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ থাকতে হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার চাপে গ্যাসের সরবরাহের ঘাটতি হলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা সকল পণ্য তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কোম্পানির বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়। এর পরেও কারখানায় নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ না থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে গ্যাসের বিল প্রদান করতে হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপের অভাবে সময়মত পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিশ্ববাজারে নামী-দামী কোম্পানি আমাদের থেকে অর্ডার বাতিল করেছে।
প্রশ্ন : এ খাতের শিল্প কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হবার খবর পাচ্ছি। পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করবেন কি?
মামুনুর রশীদ : অবস্থাটা সুখকর নয় বরং ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। তিলে তিলে গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে চলছে চরম বিরূপ পরিস্থিতি। বিগত প্রায় ১ বছর যাবৎ ২২ থেকে ২৫টি সিরামিক তৈজসপত্র, টাইলস্, স্যানিটারিওয়্যার সিরামিক ব্রিকস্ কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উৎপাদকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ।
গ্যাসের কারণে নিবন্ধিত প্রায় ৫০টিও অধিক সিরামিক কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছে এবং নতুন স্থাপিত ৫টি কারখানা শুধুমাত্র গ্যাসের অপ্রতুল সরবরাহের কারণে উৎপাদন শুরু করতে পারছে না। ফলে এই সেক্টরের বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, সেইসাথে বিপুল পরিমাণে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের বেকার জনগণ।
প্রশ্ন : এ খাতের মূল সমস্যাটি কোথায়?
মামুনুর রশীদ : গ্যাসনির্ভর এই শিল্পে ক্রমাগত গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া একটি প্রধান সমস্যা। বিগত ০৯ (২০১৫ থেকে ২০২৩) বছরে শিল্পখাতে প্রায় ৩৪৫ শতাংশ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০২৩ সালে শিল্পখাতে প্রায় ১৫০ শতাংশ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কেজি-প্রতি সিরামিক পণ্যের গড় উৎপাদন ব্যয় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তৈরি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বিদেশী পণ্যের সাথে মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে দেশীয় তৈরি পণ্যের মূল্য ইচ্ছেমতো বৃদ্ধি করা যায় না। ফলে প্রতিযোগী বাজারে উৎপাদককে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
প্রশ্ন : সিরামিকে দেশীয় কাঁচামাল কতটুকু এবং আমদানি করতে হয় কতটুকু? এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কোনো জটিলতার মধ্যে পড়তে হয় কি?
মামুনুর রশীদ : সিরামিক পণ্য উৎপাদনে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার হয়, তার চাহিদা দেশীয় উৎস থেকে শতকরা অনূর্ধ্ব ১০ ভাগ পূরণ করা সম্ভব। বাকি ৯০ ভাগ কাঁচামাল আমদানি করে আনতে হয়। তিন-চার বছরে দেশের অভ্যন্তরে ডলারের জোগান কম থাকায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার দর ওঠানামা করার জন্য দেশীয় কোম্পানিগুলো কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে। এ কারণে কাঁচামাল আমদানিতেও এর প্রভাব পড়ছে।
প্রশ্ন : বিগত বাজেটগুলোয় আপনাদের দাবি কতটা পূরণ হয়েছে? এবারের বাজেটেই বা প্রত্যাশা কী?
মামুনুর রশীদ : গত দুই অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় আমাদের দাবি ছিল সিরামিক টাইলসের ওপর সম্পূরক কর মওকুফ করার ব্যাপারে। আগেও বলেছি সিরামিক টাইলস এখন আর বিলাসবহুল পণ্য নয়, প্রয়োজনীয় পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি। এছাড়া এর আগে বলেছি, সিরামিক টাইলসের কাঁচামাল আমদানিতে কাঁচামালে থাকা পানি ও ময়েশ্চারের ওপরও আমাদের ট্যাক্স ডিউটি দিতে হয়। সরকারের কাছে বরাবরের মতো এবারো প্রত্যাশা থাকবে এ ট্যাক্স ডিউটি যেন সমন্বয় করা হয়।
প্রশ্ন : সিরামিক খাতে জ্বালানি সংকট আগেও ছিল, সেটি কতটা সমাধান হয়েছে?
মামুনুর রশীদ : এই শিল্পখাতে বিকাশের যে ধারা অব্যাহত ছিল তা হুমকির মুখে পড়েছে গ্যাসের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকটের কারণে এবং সেই সাথে আছে দফায় দফায় মূল্য বৃদ্ধি তো আছেই। পর্যাপ্ত নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ যেমন নেই, তেমনি নেই একটি স্থির শুল্ক কাঠামো। যা এ খাতের বিকাশে বহুল প্রত্যাশিত। দুঃখজনক হলো যে, তা আজও মিলছে না। ফলে বলতে পারেন, চরম একটি ঝুঁকির মধ্যদিয়ে যাচ্ছি আমরা। প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে বাজার দখলে নিচ্ছে। দ্রুত উপরোক্ত বিষয়ের সমাধান না হলে সম্ভাবনাময় এ খাত মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। তবে আমরা আশা রাখছি, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর আস্থা রাখি। এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে দ্রুত যথোপযুক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন এই প্রত্যাশা আমাদের।
এএ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













