কমছে সূচক, বাড়ছে হতাশা, দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-০৪-২৭ ০৯:৫৯:১২

দেশের পুঁজিবাজারে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলছে দরপতন। টানা এই দরপতনে ঢালাওভাবে পড়ছে সূচক, কমছে লেনদেন। পুঁজিবাজার থেকে প্রতি সপ্তাহে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ফলে ক্রমেই বাড়ছে হতাশা, পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হচ্ছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী।
সর্বশেষ বিদায়ী সপ্তাহেও লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসেই দরপতন ঘটেছে। সপ্তাহজুড়ে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট উঠে এসেছে দাম কমার তালিকায়। আগের সপ্তাহের তুলণায় কমেছে লেনদেন, মূল্যসূচকেও ঘটেছে পতন। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৭ হাজার কোটি টাকা।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে ৩২৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ৫৭ টি প্রতিষ্ঠানের। অন্যদিকে ১৫টির দর অপরিবর্তিত আছে।
ডিএসইতে আলোচ্য সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৩৪৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে । এর আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৩৯৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন কমেছে ৫৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
এ সপ্তাহে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর ও লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় পতন ঘটেছে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে কমেছে ১২৪ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট। বর্তমানে তা অবস্থান করছে ৪৯৭২ দশমিক ৬০ পয়েন্ট। পাশাপাশি শরিয়াহ্ সূচক ৩৯ দশমিক শূন্য ১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১১০৪ দশমিক ৭০ পয়েন্টে। অন্যদিকে ডিএসই-৩০ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে কমেছে ৩০ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট। বর্তমানে সূচকটির অবস্থান ১৮৪৫ দশমিক ০১ পয়েন্টে।
বৃহস্পতিবারের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এর পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের সপ্তাহের চেয়ে বাজার মূলধন কমেছে ৭ হাজার ৮৬ কোটি টাকা।
সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে টাকার অঙ্কে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে বিচ হ্যাচারির শেয়ার। কোম্পানিটির শেয়ার প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ১৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মিডল্যান্ড ব্যাংকের শেয়ার প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ১০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
এছাড়া লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে-শাহজি বাজার পাওয়ার, শাইন পুকুর সিরামিক, ফাইন ফুড, এসিআই, বেক্সিমকো ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক এবং লাভেলো আইসক্রিম।
অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে ৩১৮ টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৪২ টির দর কমেছে এবং ৫৫টির দর বেড়েছে। এছাড়া ২১ টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অপরিবর্তিত রয়েছে।
সিএসইতে বিদায়ী সপ্তাহে টাকার পরিমাণে লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকার। এতে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩০২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৯৫৭ পয়েন্ট।
গত বছরের ১৮ আগস্টে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দ্বায়িত্ব নেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। ২৮ আগস্ট কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আলী আকবর। পরবর্তীতে ৩ সেপ্টেম্বর কমিশনার পদে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ফারজানা লালারুখ। আগের কমিশনে কমিশনার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করা মোহসিন চৌধুরী স্বপদে বহাল থাকেন।
রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন কাজ শুরুর পর একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এসকল সিদ্ধান্তে আস্থাহীণতায় পড়ে পুঁজিবাজার। দ্বায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ডিএসইতে পরিচালক নিয়োগ দিয়ে বিতর্কের মুখোমুখী হয় কমিশন। এতে চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্তে আইন ভঙ্গ করে ডিএসইতে পরিচালক নিয়োগের অভিযোগ ওঠে। পরপর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে কারসাজি ও অনিয়মে যুক্ত থাকার অপরাধে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। বাজার উন্নয়নে গঠিত হয় পুঁজিবাজার টাস্কফোর্স কমিশন। ১২ টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তবে এসব কার্যক্রমে পুঁজিবাজারে আসেনি স্থিতিশীলতা। বরং অস্থিরতা আর হতাশার চরমে পৌঁছেছে দেশের পুঁজিবাজার। রাশেদ মাকসুদ দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও দিনে দিনে বাজার থেকে চলে যাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের দাবিতে মিছিল সমাবেশ করছেন বিনিয়োগকারীরা। গত বুধবারও বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদকে অপসারণের দাবিতে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ ও কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে বিনিয়োগকারীরা।
আট মাসে মূল্যসূচকে কমেছে ৮০০ পয়েন্ট: ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ১৮ আগস্ট ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫৭৭৮ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট। সর্বশেষ বৃহস্পতিবারের লেনদেন শেষে এই সূচক দাঁড়িয়েছে ৪৯৭২ দশমিক ৫৯ তে। অর্থাৎ খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ৮০০ পয়েন্ট কমে গিয়েছে।
বাজার মূলধন কমেছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা:
গত বছরের আগস্টের পর থেকে বাজার মূলধন কমেছ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ১৮ আগস্ট ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ১ হাজার ৭৮ কোটি ২৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজার মূলধন হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪৫০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ রাশেদ মাকসুদ দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৩৭ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা।
পুঁজিবাজারে ২০১০ সালের পর থেকেই বিরাজ করছে অস্থিরতা। এরপর থেকে বিএসইসির দ্বায়িত্বে একাধিক কমিশন এলেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। বরং বিগত কমিশনগুলোর সময়ে নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়। বর্তমান কমিশন দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর পুঁজিবাজার ঘিরে ইতিবাচক পরিবর্তনের আকাঙ্খা সৃষ্টি হয়। তবে বিএসইসির কার্যক্রমে তার লেশমাত্রও হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে বাড়ছে হতাশা, দিশেহারা বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবি জোরদার হচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টদরে দাবি বর্তমান চেয়ারম্যানকে দিয়ে পুঁজিবাজারের কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই অতি দ্রুতই তাঁর অপসারণ দাবি করেছেন তারা।







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













