
পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চালু করে ফ্লোর প্রাইস বা শেয়ার দরের সর্বনিম্ন সীমা। ২০২০ সাল থেকে কয়েক দফায় পুঁজিবাজারে এই ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। কৃত্রিমভাবে শেয়ারবাজারে পতন ঠেকাতে বিএসইসির এই পদ্ধতি ব্যাপক সমালেচিত হয়।
গত বছর থেকে একে একে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সকল কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেয় বিএসইসি।
সর্বেশেষ গত বছরের ২৮ আগস্ট বিএসইসির ৯১৬ তম জরুরী কমিশন সভায় ৪ টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়। এতে ২টি কোম্পানির শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস অবশিষ্ট থাকে। কোম্পানি দুটির মধ্যে একটি একটি বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো) এবং অপরটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
সাবেক স্বৈরাচার সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান। অপরদিকে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় আছে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ সালে একপ্রকার জোরজবরদস্তি করে ইসলামী ব্যাংকের কর্তৃত্ব নেয় ব্যবসায়ীক এ গোষ্ঠীটি।
সব কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়া হলেও দুটি কোম্পানিতে ফ্লোর প্রাইস থাকা নিয়ে শেয়ার বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নির্দিষ্ট ওই দুই কোম্পানি থেকে ফ্লোর প্রাইস না উঠানোয় বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের সাথে বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠতার গুঞ্জন আরও জোরালো হতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বিশেষ কোন ব্যক্তি বা পক্ষকে সুযোগ দিতেই দুই কোম্পানিতে ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্যাপিট্যাল মার্কেট ইনভেস্টর্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, রাশেদ মাকসুদ যে স্বৈরাচারী সরকারের ষড়যন্ত্রকারী তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ এটা যে, সব শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয় এই শেয়ার দুটোয় তুলে দেওয়া হয় না। যদি সুবিচার হয় সবার হবে। এতোগুলো শেয়ার কোনটায় ফ্লোর প্রাইস থাকবে না বেক্সিমকো আর ইসলামী ব্যাংকে থাকবে। এটা কেন থাকবে? নিশ্চই কোন পক্ষকে সেভ করে রাখা হচ্ছে।
তবে বিএসইসি বলছে ভিন্ন কথা। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় এই দুই কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া হয়নি বলে জানান বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম।
তিনি বলেন, কিছু বিষয় বিবেচনা করে এটা তুলে দেওয়া হয়নি। বড় শেয়ার হোল্ডারা বের হয়ে যেতে পারেন। বড় শেয়ার হোল্ডাররা চলে গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় এটা করা হয়নি। কমিশন যখন সিচুয়েশন নরমাল বিবেচনা করবে তখন এ বিষয়ে বিবেচনা করবে।
গত বছরের ১৮ আগস্ট বিএসইসির দ্বায়িত্বে আসেন বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। দ্বায়িত্বে এসেই একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ডে বাজারে শুরু হয় অস্থিতিশীলতা। ডিএসইতে নিয়ম ভঙ্গ করে পরিচালক নিয়োগ, ঢালাওভাবে বিভিন্ন কোম্পানিকে জরিমানা, আইপিও আসা বন্ধ করা ও বিএসইসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মতো বিতর্কিত পদক্ষেপে পুঁজিবাজারে আস্থা হারিয়ে ফেলেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে ক্রমাগতভাবে পতনের মুখোমুখি হয় এই খাত।
পুঁজিবাজারে চলমান এই অস্থিরতায় যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জোলালো ভূমিকা রাখার কথা ছিল সেই বিএসইসিতেই শুরু হয় অভ্যন্তরীন কোন্দল। বর্তমান চেয়ারম্যানের একের পর এক কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ বর্তমান কর্মকর্তারা। তাঁর একক হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ৫ মার্চ চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন কর্মকর্তারা-কর্মচারিরা। পরে ৬ মার্চ ১৬ কর্মকর্তার নামে মামলা করেন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের গানম্যান আশিকুর রহমান।
এরপর থেকেই বিএসইসিতে এক ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছিল। চলমান এই অবস্থায় গত ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় ২২ জনকে সাময়ীক বরখাস্ত ও ২ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় কমিশন। এতে বিএসইসিতে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে রাশেদ মাকসুদ নেতৃত্বাধীন কমিশন। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য যা কোনভাবেই সহায়ক নয়। তাই পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারে বসানোর দাবি বিনিয়োগকারীদের।
এম জি