নাবিল গ্রুপের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি; মামলায় যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক
::জাহাঙ্গীর আলম আনসারী আপডেট: ২০২৫-০৫-২০ ১৯:০৬:১৯

- কর্মচারীদের নামে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে অস্বীকার
- বাতিল হতে পারে ঋণ সুবিধা
- এসব ঋণের সাথে নাবিল গ্রুপের কোনো সম্পর্ক নাই: এমডি, নাবিল গ্রুপ
- তদন্ত হচ্ছে, বেরিয়ে আসবে কে ঋণের সুবিধাভোগী: এমডি, ইসলামী ব্যাংক
- ঋণ দেয়ায় অনিয়ম হলে ব্যাংককে জবাব দিতে হবে: মুখপাত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্থিক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে ব্যাংক খাতে। বিশেষ করে দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি পরিণত হয়েছিল লুটেরাদের লক্ষ্য বস্তুতে। তারা নামে বেনামে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে ব্যাংকটি থেকে। ইসলামী ব্যাংক থেকে বেনামে ঋণ গ্রহীতার মধ্যে অন্যতম হল নাবিল গ্রুপ। এই গ্রুপের কিছু কর্মচারী ও সুবিধাভোগীদের নামে কোম্পানি খুলে ঋণের নামে বের করে নিয়েছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। ঋণের নামে নেয়া এসব টাকা এখন আর ফেরত দিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা।
যদিও নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম স্বপন দাবি করছেন যে, এসব ঋণের দায় তার নয়। এসব ঋণের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। নাবিল গ্রুপ এসব ঋণ নেয়নি।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণগুলো নাবিল গ্রুপের কর্মচারী ও তার স্বজনদের নামে গেলেও এগুলোর প্রকৃত সুবিধাভোগী হল নাবিল গ্রুপ।
ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এসব ঋণের পেছনে নাবিল গ্রুপের হাত রয়েছে। একক গ্রাহক সীমা লঙ্ঘন হওয়ায় নাবিল গ্রুপ আর ঋণ নিতে পারছিল না। এজন্য তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও তার বাবার নামে কোম্পানি খুলে ঋণ নিয়েছে। কর্মচারীদের নামে গেলেও এসব ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী নাবিল গ্রুপ।
মামলায় যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক
এদিকে, নাবিল গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিষয়ে তদন্ত করছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি। এমনকি নাবিল গ্রুপের ঋণ সুবিধা বাতিল হতে পারে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র।
এ বিষয়ে কথা বললে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ওমর ফারুক খান বলেন, আমরা বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করছি। তদন্তের পর বেরিয়ে আসবে আসলে কে এসব ঋণর প্রকৃত সুবিধাভোগী। তিনি আরো বলেন, নাবিল গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আমরা মামলা করবো। ইতিমধ্যে মামলার বিষয়টি আমাদের বোর্ড সভায় অনুমোদন হয়েছে।
জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনার পরিবার এবং ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপের ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে চারটি সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে ১১টি কমিটি করা হয়। এই ১০ কোম্পানির তালিকায়ও নাবিল গ্রুপের নাম আছে।
আবার সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে গত সেপ্টেম্বরে নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম, স্ত্রী মোছা. ইসরাত জাহান, পিতা নাবিল গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহান বক্স ম-ল, মা ও গ্রুপের পরিচালক আনোয়ারা বেগম, দুই সন্তান এজাজ আবরার ও আফরা ইবনাথের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
কর্মচারীদের নামে নেওয়া হয় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ
জানা যায়, একক গ্রাহক সীমা লঙ্ঘন হওয়ায় নাবিল গ্রুপ ঋণ নেওয়ার অযোগ্য হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মচারী ও সুবিধাভোগীদের নামে কোম্পানি খুলে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এজে ট্রেড ইন্টারন্যাশনানের নামে ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ৩৮২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হলেন নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম স্বপনের বাবা জাহান বক্স। আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ৯৪০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এটার পরিচালক হলেন নাবিল গ্রুপের কর্মচারী আনোয়ারুল ইসলাম। ইন্টারন্যাশনাল প্রডাক্ট প্যালেসের নামে ৯৭০ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এটার পরিচালক হলেন নাবিল গ্রুপের কর্মচারী মুখলেছুর রহমান।
আরেক বেনামি প্রতিষ্ঠান জামান সিন্ডিকেট ইসলামী ব্যাংকের পাবনা শাখার গ্রাহক। প্রতিষ্ঠানটির ৯৭৩ কোটি টাকার অনুমোদিত সীমার বিপরীতে ঋণ স্থিতি রয়েছে ১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত মো. রোকনুজ্জামান মিঠুর নামে। তিনিও নাবিল গ্রুপের কর্মচারী।
ইসলামী ব্যাংকের ঢাকার গুলশান করপোরেট শাখা থেকে নাবিল গ্রেইন ক্রপস নামে ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। অনুমোদিত ঋণসীমা অবশ্য ৯৬৬ কোটি টাকা। ব্যাংকের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা বনানীর ডি ব্লকের ৯ নম্বর প্লটের ১৭ নম্বর রোডের নাবিল হাউস। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় রয়েছেন শাকিল হোসেন, মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম স্বপন।
ব্যাংকের রাজশাহী শাখার আরেক গ্রাহক আনোয়ার ফিড মিলস। ব্যাংকের নথিতে এই প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে নাম রয়েছে নজরুল ইসলাম ও নাজমুল হাসানের। তারা দু’জনই নাবিল গ্রুপের কর্মচারী। আনোয়ার ফিড মিলসের ঋণ স্থিতি এখন ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের গুলশান সার্কেল-১ শাখায় মার্কেট মাস্টার এনালাইজার নামে নাবিলের আরেকটি বেনামি প্রতিষ্ঠানের ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। ৯৫০ কোটি টাকা ঋণসীমার বিপরীতে এ অর্থ দেওয়া হয়। ব্যাংকের নথিতে মার্কেট মাস্টার এনালাইজারের অফিসের ঠিকানা উল্লেখ আছে ঢাকার বনানীর ১৭ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়ি। নাবিল গ্রুপের ঢাকার অফিসও এ বাড়িতে। এই কোম্পানি নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে শফিকুল ইসলাম ও শাহ আলমের নামে।
সুলতান অ্যাসোসিয়েটসের নামে ব্যাংকের রাজশাহী নিউমার্কেট শাখায় ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। নাবিলের কর্মচারী সুলতান আহমাদের নামে এই কোম্পানিটির নিবন্ধন। সম্প্রতি একে লিমিটেড কোম্পানি করা হয়েছে। এতে পরিচালক হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আতাবুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী শাহিনুরকে।
ঋণ অস্বীকার নাবিলের এমডির
এসব ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, এসব ঋণের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ব্যাংক কেন তাদেরকে ঋণ দিয়েছে সেটা ব্যাংক জানে। তাদের ঋণের দায়ভার নাবিল গ্রুপ নিবে কেন?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির ঋণ পাওয়ার অধিকার আছে। এখন দেখতে হবে ঋণগুলো সকল নিয়ম মেনে দেয়া হয়েছে কিনা। যদি নিয়ম মেনে ঋণ দেয়া না হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জবাব দিতে হবে।
এএ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













