পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি সরবরাহ বন্ধ দশ মাস

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৫-০৫-২২ ০০:৩৭:৪৬


দেশের শিল্পায়নের অর্থ সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজার থেকে সহজেই সংগ্রহ করার কথা মুলধন বা পুঁজি। বিশ্বব্যাপী এই প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশ চলছে উল্টো পথে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিগত পরিবর্তন সংক্রান্ত জটিলতা, পুঁজিবাজারের তুলনায় ব্যাংকঋণ সহজলভ্য হওয়া, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে উদ্যোগের অভাব ও বাজারের সার্বিক অচলাবস্থার কারণে শিল্প গ্রুপ এই বাজারে আসছে না বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূত্র মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে চলতি অর্থবছরে নতুন কোন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও আসেনি। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন করে কোন আইপিও আবেদন জমা পড়েনি। যেখানে গত অর্থবছরেও আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করে চারটি কোম্পানি ৬৪৫ কোটি টাকা অর্থ উত্তোলন করে। এ বছর নতুন আইপিও না আসায় বাজারে এক ধরণের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিসমূহ মূলধন সংগ্রহের জন্য প্রাইমারি মার্কেটে শেয়ার অফার করে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সেই শেয়ার ক্রয়ের জন্য আবেদন করেন। কোন কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার এই প্রক্রিয়াকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও বলা হয়।

পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাজারের পরিধি ও কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইপিও’র মাধ্যমে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে প্রবেশ করে। ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি করে। এর ফলে বাজারে বৈচিত্র্যতা আসে এবং বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, এটি বাজারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে গতিশীল করে, যা সার্বিক অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়তা করে।

কিন্তু চলতি অর্থবছরের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন আইপিও না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এতো দীর্ঘ সময় ধরে বাজার আইপিও আসা বন্ধ থাকা দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই পরিস্থিতি বাজারের জন্য অস্বাভাবিক এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাজারে আইপিও না আসার কারণ কি এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম  বলেন, আইপিও না আসার কারণ হলো বর্তমান রুলস রেগুলেশন। এগুলোকে পরিবর্তন করতে হবে। প্রাইসিং মেথড ঠিক না মূল কারণ। আর প্রক্রিয়াতেও সমস্যা আছে।

আইপিও আনতে বিএসইসির ভূমিকাকে কিভাবে দেখছেন? জানতে চাইলে বলেন, বিএসইসির ভূমিকার চেয়ে বড় বিষয় হলো আইপিও আবেদনই নেই। যে প্রসেসটা আছে সেটা পরিবর্তন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইপিও আসার প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে হবে। ভ্যালুয়েশন চেঞ্জ করতে হবে প্রাইসিং চেঞ্জ করতে হবে প্রসেস টাইম কমাতে হবে। এসবই বিএসইসির কাজ। এগুলো করলেই বাজারে আইপিও আসা শুরু হবে।

পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময়ে আইপিও না আসাটা স্বাভাবিক কিনা জানতে চাইলে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ সিদ্দিকী বলেন, ১০ মাস ধরে বাজারে আইপিও না আসাটা একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় নয়। আইপিও না আসার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই মুহুর্তে বিনিয়োগের পরিবেশ নাই। কোন কোম্পানিই চিন্তা করছে না এই পরিবেশে কোম্পানিকে আরও বড় করবে। বলা যায় যে, বিনিয়োগ খুব সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। সুতরাং কোম্পানিগুলো যদি ব্যবসা সম্প্রসারণ না করে তাহলে তারা আগ্রহী হবে কেন।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়াটা জটিল। অন্যদিকে খুব সহজেই ব্যাংকগুলো থেকে টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আইপিও তে আসতে ইচ্ছুক কোম্পানি কম পাওয়া যাবে। এখানে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক একটা কারন আর দ্বিতীয় কারন হচ্ছে আইপিও নিয়ে আসার যে উদ্যোগ এটার অভাব।

পুঁজিবাজার ২০১০ সালের পর থেকেই অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে এই বাজারকে ঘিরে বড় বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। যেসকল আইপিও এসেছে তার মধ্যে বেশির ভাগ কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দুর্বল। এসব কোম্পানির শেয়ারে লাভের মুখ দেখতে পারেনি বিনিয়োগকারীরা।

পুঁজিবাজারে সর্বশেষ আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয় টেকনো ড্রাগস। ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের জন্য আইপিও অনুমোদন পায় টেকনো ড্রাগস। আর ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফিক্সড প্রাইস পদ্ধিতে সর্বশেষ আইপিও পায় এনআরবি ব্যাংক। এরপর আর কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন হয়নি।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিএসইসির দায়িত্বে আসেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত কমিশন গত আট মাসে কোনো আইপিও অনুমোদন করেনি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আইপিও আসেনি এজন্যই টাস্কফোর্স কাজ করেছে। টাস্কফোর্স চুড়ান্ত সুপারিশও জমা দিয়েছে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী আইনি সংস্কার হবে। সেটা হওয়ার পর আমরা আশা করব যে ভালো কোম্পানিগুলো আইপিওতে আসবে।