রাশেদ মাকসুদে ভরসা অর্থ উপদেষ্টার

ধ্বংসের পথে পুঁজিবাজার

সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-০৫-২৯ ১২:০৪:৫৫


চরম স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। ধারাবাহিক পতনে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি। ডিএসইতে ধারাবাহিকভাবে নিম্নগামী সূচক ৪ হাজার ৬১৫ তে নেমেছে। লেনদেনও নেমেছে তিনশো কোটির নিচে। গত ১০ মাস ধরে পুঁজিবাজারে বন্ধ আইপিও সরবরাহ। বাজারের উন্নয়ন, সংস্কারে টাস্কফোর্স হলেও তাতে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি। পুঁজিবাজারের এমন চিত্র অর্থনীতির গুরুত্বর্পূর্ণ এই খাতে চরম স্থবিরতাই জানান দিচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএসইসির শীর্ষ কর্তাদের বাজার সম্পর্কে ধারণা না থাকায় বিভিন্ন সময় কিছু অপরিপক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বাজার প্রতি আস্থা হাড়াচ্ছে বিনিয়োগকারীরা। এমন বাস্তবতায় তারা বলছেন, অন্তবর্তীকালীন সরকারে আমলে অন্য সব জায়গায় সংস্কারে ছোয়া পেলেও পুঁজিবাজারে কোন অগ্রগতি নেই। বাজারের এই স্থবিরতায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের অপসারণের দাবি জানিয়ে একের পর এক কর্মসূচি পালন করছেন বিনিয়োগকারীরা। বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যেও বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। বাজারের স্থবিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্রোকারেজ, হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অংশিজনরা। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার সচল থাকলে সবাই সচল থাকবে। কিন্তু যে স্থবিরতা চলছে তাতে সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

এদিকে পুঁজিবাজারের অস্থিরতা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, অর্থ উপদেষ্টা এবং সব শেষ প্রধান উপদেষ্টা পুঁজিবাজার নিয়ে গত ১১ মে বৈঠক করে। সেখানে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে পাঁচটি নির্দেশনা দেয় প্রধান উপদেষ্টা। এর পরও কয়েকবার এই বাজার নিয়ে কথা বলছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, অর্থ উপদেষ্টা। এর পরও বাজারে আস্থা ফিরছে না বিনিয়োগকারীদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার পুঁজিবাজারের অভিভাবক হিসেবে এমন একজনকে দিয়ে, জিনি নিজের ঘর সামলাতে পারছেন না। বাজার কি করে সামাল দিবেন। এমন বাস্তবতায় তারা মনে করছেন বিএসইসির বর্তমান কমিশনা বাতিল করে নতুন কমিশন নিয়োগ দিলে বাজারে আস্থা আসতে পারে। এর বিকল্প অন্য কোনভাবে পুঁজিবাজারে আস্থা আসবে না।

বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, বিএসইসির বর্তমান প্রশাসনের পুঁজিবাজার নিয়ে জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব বাজারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি রাজপথে নেমেও বিনিয়োগকারীরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং রাশেদ মাকসুদের অপসারণ দাবি করছেন। তবে অর্থ উপদেষ্টা আস্থা রাখতে চান রাশেদ মাকসুদ কমিশনের উপর। তিনি মনে করেন বর্তমান চেয়ারম্যান অনেক যোগ্যতা সম্পূর্ণ। তাই তাকে দিয়েই বাজার উন্নয়ন হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও বিএসইসির কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে অসন্তুষ্টি। তাঁরা বলছেন আদতে বিএসইসিতে কোন কাজ হচ্ছে না। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের ব্যক্তব্যেও উঠে এসেছে এমন কথা। তাঁরা বলছেন, বাজারে সংস্কার হলে তার ফলাফল দীর্ঘমেয়াদী। কিন্তু বাজারের সমস্যা তো তাৎক্ষণিক। বাজারকে যেভাবে স্থবির করে রাখা হয়েছে তা ধংসাত্মক।

গত ২৭ মে ধানমণ্ডিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছর অবস্থান অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার করা হচ্ছে। পুঁজিবাজার সংস্কারে একটা টাস্কফোর্স করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

গত ২৭ মে এনটিভি আয়োজিত কেমন বাজেট চাই অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, পুঁজিবাজার জীর্ণদশা। এটা আসলেই মৃত প্রায়। ওটা আইসিইউর ভেতরে। জিডিপিতে অবদান ছিল ২৭ শতাংশ, কিন্তু এখনও জিডিপির ভ্যালু হিসেবে আছে ৯ শতাংশ। এটাকে চালু করার জন্য যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তাহলে স্টক মার্কেটে যারা অংশীদার রয়েছেন, তাদের সঙ্গে যদি আলোচনা না করে সিকিউরিটি অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন একা করতে যায়, তাহলে কোনোদিনই সম্ভব না।

একই অনুষ্ঠানে ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, বিএসইসির বর্তমানে জরিমানা করা ছাড়া কোন কাজ নেই। এই কমিশন বিগত নয় মাসে কিছু করতে পারেনি। বিএসইর যোগ্যতা সম্পূর্ণ লোকগুলো কাজে লাগাচ্ছে না। বিদেশি কোন প্রতিনিধি দিয়েও বাজারে কাজ হবে না।

এ বিষয়ে সাংবাদিক মনির হোসেন বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সুনজর আছে। তবে বর্তমান কমিশনের অ,আ,ক,খ বিষয়ে জ্ঞান নেই। এই কমিশন দিয়ে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাজারের এমন পরিস্থিতিতে যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা রাখারএ কথা, বর্তমান চেয়ারম্যানের পদক্ষেপে সেই সংস্থাতেই দেখা দিয়েছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবি নিয়ে গত মার্চে সংস্থাটিতে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সূচনা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বিএসইসির সাবেক নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় বর্তমান কমিশন। পূর্ব থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সাথে কমিশনারদের অসদাচরণের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকান্ডে ক্ষিপ্ত ছিলেন কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। তাতে ঘি ঢালে সাইফুর রহমানকে অবসরে পাঠানোর এ ঘটনা। এতে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা কর্মচারিরা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদেরে পদত্যাগ দাবি করে কর্মবিরতিতে যান। পরে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে ফিরলেও চেয়াম্যানের কার্যক্রমে সংস্থাটিতে চলতে থাকে অস্থিরতা।

প্রথমে ১৬ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে গানম্যানকে দিয়ে মামলা দেয় খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। এরপর গত ২৯শে এপ্রিল ২ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিসসহ সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ২২জন কর্মকর্তাকে। কমিশনের এমন কর্মকান্ডে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিতেও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। ফলে বাজারের সুসাশন নিশ্চিত ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এতোকিছুর পরও বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের ওপরে আস্থা রাখেন অর্থ উপদেষ্টা। গণমাধ্যমে তিনি একাধিকবার ব্যক্ত করেছেন রাশেদ মাকসুদের প্রতি সমর্থনের কথা। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, মাকসুদ খুব ভালো ব্যাংকার, সেরাদের একজন। তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। কিন্তু এখন অনেকেই তার অপসারণ চায়, এমনকি আমারও।
পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটে যখন বাজার সংশ্লিষ্টরা বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করছেন, তখন তাঁর প্রতি অর্থ উপদেষ্টার এ সমর্থনে হতাশা প্রকাশ করেছেন অংশীজনরা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে রাশেদ মাকসুদকে অপসারণ করতে হবে।