গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন। তবে অনেক সময় দেখা যায়, প্রচলিত ভোটপদ্ধতিতে একটি দল সীমিত ভোট পেলেও অধিকাংশ আসনে জয়ী হয়ে যায়, আর বহু ভোট পাওয়া দলের কোনো আসনই থাকে না। এমন বৈষম্য থেকে উত্তরণে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দল বা জোট যে পরিমাণ ভোট পায়, তার আনুপাতিক হারে সংসদে বা পরিষদে আসন পায়—ফলে গড়ে ওঠে এক ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নির্বাচনপদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ বিদ্যমান পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবর্তে ভোটের আনুপাতিক হারে বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে।
বর্তমানে রাজনৈতিক মাঠে পিআর পদ্ধতি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আজকের প্রতিবেদনে জানার চেষ্টা করবো বিশ্বে কত ধরণের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, পিআর পদ্ধতি কী, কেন প্রয়োজন, বিশ্বের কত শতাংশ দেশে এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। তাহলে চলুন আর দেরি নয়।
ভিডিও প্রতিবেদনটি দেখতে ভিজিট করুন- পিআর পদ্ধতি কী, কেন প্রয়োজন, বিশ্বের কোথায় আছে এই ব্যবস্থা?
পিআর পদ্ধতি কী?
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা বলতে এমন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নির্বাচকমণ্ডলির উপগোষ্ঠীরা উপযুক্ত নির্বাচিত সংগঠনে আনুপাতিক হারে প্রতিফলিত হয়। এই ধরনের ব্যবস্থার সারকথা হলো যে, এই পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হয় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে। এখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোন দল মোট প্রদত্ত ভোটের শতকরা ১০ শতাংশ পায়, তাহলে সেই দল আনুপাতিক হারে সংসদের ১০ শতাংশ বা ৩০টি আসন পাবেন।
এবার দেখবো ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে কী ঘটেছিলো
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের ৪০.৮৬ শতাংশ পেয়ে বিএনপি জাতীয় সংসদে আসন পেয়েছিল ১৯৩টি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ৪০.২১ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় মাত্র ৬২টি। কিন্তু দেশে বিদ্যমান ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতির বদলে পিআর পদ্ধতি চালু থাকলে ওই নির্বাচনে বিএনপি ১২২টির কাছাকাছি আর আওয়ামী লীগ অন্তত ১২০টি আসন পেত।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দলগুলোর আসনপ্রাপ্তিতে সামঞ্জস্য ছিল না। ওই নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়েছিল, অন্যদিকে বিএনপি ৩২.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় মাত্র ৩০টি। পিআর বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি থাকলে ওই নির্বাচনে বিএনপি পেত অন্তত ৫৭টি আসন।
প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার সাথে পার্থক্য কী?
বর্তমান বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ৩০০টি আসনে আলাদা আলাদা প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলো। ধরা যাক, বর্তমান পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে মোট চারজন প্রার্থী চারটি দল থেকে নির্বাচন করছে। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তিনজন প্রার্থীই ২০ শতাংশ করে ভোট পেল। আর চতুর্থ প্রার্থী পেলো ২৫ শতাংশ ভোট।
বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী চতুর্থ প্রার্থীই এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। আর ওই তিনটি দলের ৬০ শতাংশ ভোট তেমন কোন কাজে আসছে না। একই ভাবে সারাদেশের অন্তত ২৯০ আসনে যদি একই হারে ভোট পেয়ে চতুর্থ দলটির প্রার্থীরা জয়লাভ করে, তাহলে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তারা সরকার গঠনসহ সংসদে একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য করবে। অথচ বাকি তিন দল মিলে ৬০ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকলো না সংসদে। এতে সংসদে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকে না।
বিশ্বের কতটি দেশে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়?
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামে সর্বপ্রথম সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিটি প্রবর্তিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থার অর্ধেকের মতো রাষ্ট্রে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনী ব্যবস্থার সর্বাধিক ব্যবহৃত তিনটি ভোটদান পদ্ধতিগুলো হলো: মুক্ত তালিকা, বদ্ধ তালিকা ও মিশ্র পদ্ধতি।
মুক্ত তালিকায় নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সময়ের মধ্যে দলগুলো প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। ফল প্রকাশের পর প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী আনুপাতিক হারে তালিকার ক্রমানুযায়ী আসন বণ্টন হয়। বদ্ধ পদ্ধতিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয় না। আর মিশ্র পদ্ধতিতে কিছু আসনে সমানুপাতিক ও কিছু আসনে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়। আবার কোনো কোনো দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রচলন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোথাও এক কক্ষে সমানুপাতিক আবার অন্য কক্ষে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়।
তালিকাভিত্তিক সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যা ৮৫টি দেশে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়ত মিশ্র সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যা ৭টি দেশে ব্যবহৃত হয় এবং তৃতীয়ত একক স্থানান্তরযোগ্য ভোটদান, যা আয়ারল্যান্ড,মাল্টা, অস্ট্রেলিয়ার সিনেট ও ভারতের রাজ্যসভা সদস্য নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকরা কী বলেন: এ বিষয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাকে নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান করা হয়েছে। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। পিআর পদ্ধতি দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে বলেই অনেকের ধারণা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে কমিশন থেকে সুপারিশ করা হবে। কমিশনের প্রধান হিসেবে এ বিষয়ে আমি আমার ব্যক্তিগত মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে চাই।’
নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে ভোট হলে নিজস্ব ভোট ব্যাংকে কাজে লাগিয়ে জিতে সরকার গঠন করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় মেজরিটি ভোটারে মতের প্রতিফলন হয় না। আর আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিতে ভোটের আগে প্রতিটি দল ক্রম ভিত্তিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার প্রাপ্ত ভোটের হার অনুসারে আসন সংখ্যা পাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল সারা দেশে গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোট পেলেও সংসদে তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকে না আসনভিত্তিক একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হওয়ার কারণে। এই পদ্ধতিতে ভোট হলে সে সব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরাচারী হওয়ার পথ ঠেকানোর একমাত্র রাস্তা হলো সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি। কারণ, এই পদ্ধতিতে ভোট হলে কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে অপরিচিত হলেও বিশ্বের ১৭০টি দেশের মধ্যে ৯১টি, অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ দেশে আনুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থা প্রচলিত। উন্নত দেশগুলোর সংস্থা অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো–অপারেশনভুক্ত (ওইসিডি) ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ দেশই আনুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থা অনুসরণ করে।
পিআর পদ্ধিত কী নতুন দাবি?
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আনুপাতিক পদ্ধতি চালু করার দাবি নতুন কিছু নয়। কিছু রাজনৈতিক দল অনেক দিন ধরেই এই দাবি জানিয়ে আসছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৭ সালে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেই আলোচনায় জাতীয় পার্টি, সিপিবি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলসহ (বাসদ) কিছু দল এই পদ্ধতিতে নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাবিবুল আউয়াল কমিশনের ডাকা সংলাপেও জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনব্যবস্থা একটি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি গ্রহণ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এ বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, যাতে সকল শ্রেণি, মত ও দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় এবং গণতন্ত্র হয় সত্যিকার অর্থেই জনগণের।