নিজেকে ‘সবল’ ভাবে খেলাপিতে জর্জরিত এক্সিম ব্যাংক
::জাহাঙ্গীর আলম আনসারী প্রকাশ: ২০২৫-০৭-১৫ ১৪:৪৫:১৪

- মোট ঋণের অর্ধেকই খেলাপি
- কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার প্রায় ১০ হাজার কোটি
এক্সিম ব্যাংকের এ্যাসেট ভাল না। তারল্য সংকট আছে। আমানতকারীদের টাকা দিতে পারছে না। এই অবস্থায় ব্যাংকটিকে মার্জারেই আসতে হবে: মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক
বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম-লুটপাটের কারণে যে কয়েকটি ব্যাংক অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে গেছে তারমধ্যে অন্যতম হল ইসলামী ধারার এক্সিম ব্যাংক। বিগত সরকারের আমলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতোই ব্যাংকটির প্রকৃত চিত্র আড়াল করে রেখেছিল। গত বছরের ৫ আগস্টে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বেড়িয়ে আসতে শুরু করে ব্যাংকটির প্রকৃত চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বার-বার তারল্য সহযোগিতা নেওয়ার পরও সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছে না। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল থাকেন এবং লম্বা সময় ধরে ব্যাংকগুলোতে তিনি অঘোষিত কর্তৃত্ব চালান। পট পরিবর্তনের পর সেই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিকট আত্মীয় নজরুল ইসলাম স্বপন।
সম্প্রতি ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ৫টি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে একটি শক্তিশালী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শেষে সম্প্রতি ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স পাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবশেষে গভর্নর ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণের ঘোষণা দিলে বাকিদের আপত্তি না থাকলেও রহস্যজনকভাবে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন দ্বিমত পোষণ করে নিজেদেরকে ভালো ব্যাংক দাবি করেন। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে বাস্তবতা ভিন্ন দেখা যায়। এমনকি (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) একিউআর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ব্যাংকটির বিভিন্ন সূচকে তথ্য গোপনের বিষয়টিও উঠে আসে।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে এক্সিম ব্যাংক তাদের মোট খেলাপির পরিমাণ দেখায় ৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণ ৫২ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ের একিউআর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকটির খেলাপির পরিমাণ ২৫ হাজার ১০১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপির ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। এমনকি এই খেলাপি ডিসেম্বর নাগাদ ৫১ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলেও মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এক্সিম ব্যাংকে বর্তমানে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৯১০ কোটি টাকা। অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে। ১৫৫ শাখার ব্যাংকটি বিগত বছরে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে ব্যাংকটির শেয়ারদর কমে ৫ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে চালু হলেও ব্যাংকটি এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী এর কার্যক্রম চালু করতে পারেনি। সারাদেশে মাত্র ১৫৫টি শাখা নিয়ে কার্যক্রম চালানো ব্যাংকটির গ্রাহক সংখ্যা মাত্র ১৫ লাখের কাছাকাছি। ব্যাংকটির অধিকাংশ শাখা শহর কেন্দ্রীক হওয়াতে প্রান্তিক মানুষ সেবা পায়না যা, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারন নীতি ও শরীয়াহ নীতি-পরিপন্থী। এক্সিম ব্যাংক কর্পোরেট গ্রাহক নির্ভর হওয়ায় সাধারণ লোকজন এ ব্যাংক থেকে ব্যাংকিং সুবিধা খুব কমই পায়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি এই নিয়ম অনুসরণ করে আসছে। নারী উদ্দোক্তা, এসএমই ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে।
এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপনের ফোন নাম্বারে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা হলেও রিপ্লাই দেননি। তবে সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, এক্সিম ব্যাংকের যতটা ক্ষতি গত সরকারের সময়ে হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে গত ১০ মাসে। কয়েক দফায় বলা হয়েছে, এক্সিম ব্যাংক দুর্বল, এক্সিম ব্যাংক একীভূত হবে। এর ফলে দফায় দফায় আমাদের ব্যাংকের গ্রাহকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যাতে ব্যাংকের তারল্য–সংকটে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়। এ ছাড়া বিদেশিদের দিয়ে ঋণের মান পরীক্ষায় প্রায় অর্ধেক ঋণ খেলাপি হওয়ার যোগ্য বলে জানিয়েছে, যা পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর।
ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ মতে, কোনো তফসিলি ব্যাংক অকার্যকর হয়ে গেলে বা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক উক্ত ব্যাংককে রেজল্যুশন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ব্যাংক নীতিমালায় কোনো ব্যাংকে ৩ শতাংশের বেশি খেলাপী ঋণ গ্রহণযোগ্য নয় এবং খেলাপী ঋণ ৩০ শতাংশের উপরে হলে বাধ্যতামূলকভাবে ঐ ব্যাংককে অবসায়ন করতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এক্সিম ব্যাংকের বিষয়ে বলেন, আমরা তো জানি তাদের অবস্থা কেমন। তারা যদি মার্জারে যেতে না চায় তবে আমাদের কাছ থেকে যেসব টাকা নিয়েছে তা ফেরৎ দিক, তাদের লোকশান প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করুক। অনেক খেলাপি হয়েছে, সেগুলো রিকোভার করুক।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, তাদের ইচ্ছামত তো আর সব কিছু হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিবে ফরেনসিক প্রতিবেদনের আলোকে। তাদের এ্যাসেট ভাল না। তারপরও তারল্য সংকট আছে। আমানতকারীদের টাকা দিতে পারছে না। এই অবস্থায় মার্জারেই আসতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এক্সিম ব্যাংকের এখন যে অবস্থা তাতে নিজেদের ঘুরে দাড়ানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মার্জারের মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংক মিলে একটি শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হলে গ্রাহক ও আমানতকারী সকলেই নিরাপদ হবে। একীভূতকরণের ফলে ব্যাংকগুলোতে বিদ্যমান ১৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী, ৭৭৯টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫০০ এজেন্ট আউটলেট, ১ হাজারের বেশি এটিএম বুথ ও প্রায় ১কোটি গ্রাহক নিয়ে বিশাল আকারে চালু হবে নতুন ইসলামী ব্যাংক। যার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভূক্তিতে আসবে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ঋণের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ হবে স্বাবলম্বী এবং স্বনির্ভর। অগ্রসর হবে দেশ ও দেশের অর্থনীতি।
গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই একীভূতকরণ উদ্যোগটি সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা ও খেলাপি ঋণে জর্জরিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর পৃথকভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন তাদের একত্রিত করে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর অধীনে আনলে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষতা বাড়বে। দ্রুত দূর্বল ব্যাংকসমুহ একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। যেসকল ব্যাংক এক্ষেত্রে অসহযোগীতা করবে তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এএ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













