আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপন

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের প্রতারণা

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৫-০৮-১৩ ১৭:০৪:১৪


মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি প্রকাশিত অর্ধ-বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে প্রকৃত লোকসান আড়াল করা, প্রভিশন ঘাটতি রেখে মুনাফা দেখানো এবং পরিচালকদের শেয়ার ধারণ সংক্রান্ত বিএসইসির নির্দেশনা উপেক্ষা করার মতো অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকটির স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে অন্যদিকে তথ্য গোপন থাকায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ। তারা বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষেই প্রভিশনিং করা হয়নি।

এদিকে, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন; একটি ব্যাংকে অনেকগুলো স্টেইকহোল্ডার জড়িত থাকে। যদি কোন কারণে আর্থিক প্রতিবেদন অস্বচ্ছ হয়; তাহলে তারা সবাই অন্ধকারে থাকেন। এতে করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না স্টেইকহোল্ডারা। অন্ধকারে থেকে কোন সিদ্ধান্ত নিলেও এক সময় সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনা ঘটলে সেটি আরও বেশি বিপদজনক। কারণ প্রভিশনিং না করে আয় বেশি দেখিয়ে শেয়ারহোল্ডারদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়েছে। তারা বলছেন, নতুন পর্ষদ কোন ব্যক্তির কাছে দায়বদ্ধ নয়। যদি তারা ফ্যাসিস্টদের মতো জালিয়াতি করে; তাহলে তা হবে নতুন বোতলে পুরাতন মদ রাখার মতো।

লোকসানকে মুনাফা দেখানো

তথ্য গোপনের মাধ্যমে প্রকৃত লোকসান আড়াল করে আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা দেখানোর অভিযোগ উঠেছে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ব্যাংকটির গত অর্ধ-বার্ষিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ জুন সমাপ্ত অর্ধবার্ষিকে কর পরবর্তী নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ৯৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এ সময়ে শেয়ার প্রতি মুনাফা দেখানো হয়েছে ৮৩ পয়সা। যেখানে ব্যাংকটির প্রকৃত লোকসানের পরিমাণ ৭০৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং শেয়ার প্রতি লোকসানের পরিমাণ ৬ টাকা ১২ পয়সা।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারী থেকে ৩০শে জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশনের প্রয়োজন ছিল ৯৯১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে ব্যাংকটি প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে ১০০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রভিশন ঘাটতি বা প্রভিশন কম করা হয়েছে ৮৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত ব্যাংকগুলো তাদের প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট থেকে ডেফারেল সুবিধা নিয়ে থাকে। তবে এই সময়ে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক হতে কোন ডেফারেল সুবিধাও নেয়নি।

মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করায় শেয়ার দর বৃদ্ধি

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দর ছিল ১৭ টাকা ৪ পয়সা। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে গত ৩১ জুলাই শেয়ার দর বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ টাকা ৮ পয়সায়। অর্থাৎ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন রাখার কারনে গত ৩১ জুলাই শেয়ার মূল্য ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্ষদীয় অডিট কমিটির এ ধরনের জালিয়াতি কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ পালনে ব্যর্থ, জরিমানা আরোপ

নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক। এজন্য জরিমানার মুখোমুখিও হয়েছে ব্যাংকটি। এদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের বিভিন্ন তারিখে নগদ জমা বা প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে ব্যাংকটির ওপর দন্ড সুদ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নগদ জমা সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা দন্ড সুদ আরোপ করেছে। গত ২৩ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ তদারকি শাখা থেকে এই আদেশ সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে চিঠির তারিখ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উল্লেখিত পরিমাণ টাকা প্রধান কার্যালয়ের সাধারণ হিসাব খাতে জমা দিত নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সময়ের মধ্যে জরিমানার টাকা জমা না দিলে ব্যাংকটির চলতি হিসাব বিকলনের মাধ্যমে আরোপিত জরিমানা আদায়ের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।

তবে জরিমানার এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) কামাল হোসাইন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে একটু ঝামেলা ছিল। তখন সিআরআর রাখা সম্ভব হয়নি। এই জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরিমানা করেছিল। তবে আমরা এটা পরিশোধ করেছি।

বিএসইসির নির্দেশনা অমান্য

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে পুঁজিবাজারের ব্যাংক খাতে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের শেয়ার মাত্র ১৫ শতাংশ। যেখানে বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশ শেয়ার স্পন্সর ও পরিচালকদের অধীনে থাকতে হবে। বিএসইসির এই নির্দেশনা বাস্তবায়নেও ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি। তাই তাৎক্ষণিকভাবে স্পন্সর ও পরিচালকদের শেয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে আদেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত ২৮ মে পাঠানো চিঠিতে এই আদেশ পালনে ব্যর্থ হলে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছে সংস্থাটি।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যক্তব্য

এসব বিষয়ে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) কামাল হোসাইন বলেন, আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে বলেছি আমাদের আরও বেশি ডেফার সুবিধা নিতে হবে। এটা বলেই আমরা চাহিদা দিয়েছি যে আরও তিন হাজার কোটি টাকা প্রভিশন আসবে। আমরা হয়তো বছরে ৩০০ কোটি টাকা প্রভিশন করব আর যা প্রফিট হবে পুরোটাই প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করে ফেলব। আমরা ডেফার্ড ট্যাক্স দিয়ে প্রভিশন ও ইপিএস টা ঠিক করেছি। কিন্তু নরমালি ওই প্রফিট দিয়ে আমরা কোন অ্যাকাউন্টস করিনি। ওইভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নেওয়া আছে।

কিন্তু বাড়তি ডেফারেল সুবিধার কথা আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ না থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা হয়তো ওভাবে উল্লেখ করা হয়নি। আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা না থাকলে কি এটা বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো আমাদের নোট আকারে দেওয়া আছে, তবে এটা আরও ক্লিয়ার করে দেওয়া যেত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যক্তব্য

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আমরা এটা খতিয়ে দেখব। কেন এমন করা হলো এ বিষয়ে দেখে প্রাইমারি রেগুলেটর বাংলাদেশ ব্যাংককে পদক্ষেপ নিতে বলব।

৩০ শতাংশের নিচে পরিচালকদের শেয়ার থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যক্তব্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি।

এম জি