

সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করেছেন-এমন অভিযোগ উঠেছে পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে। ফরহাদ হোসেন নামে ব্যাংকটির একজন কর্মকর্তা এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। অভিযোগে এমডি মোহাম্মদ আলী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে বলেও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কারসাজির মাধ্যমে ডলার বাজার অস্থিতিশীল করার যে প্রমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পেয়েছে সেখানে এমডি মোহাম্মদ আলী সরাসরি জড়িত বলেও ব্যাংকটির একটি সূত্রে জানা গেছে।
এত কিছুর পরও মোহাম্মদ আলী এখনো এমডি হিসেবে বহাল থাকায় পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, এমডি সাহেব আওয়ামী লীগের লোক। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে অনিয়ম করে পার পেয়েছেন। কিন্তু এখনো তিনি বহাল তবিয়্যতে আছেন। তার খুঁটির জোর কোথায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) নির্ধারিত দরের বেশিতে ডলার বিক্রি করে ২৪৮ কোটি টাকা আয় করে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। একই সময়ে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে বেশি দরে ডলার ক্রয় করে অতিরিক্ত ২১১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকটি। শুধু তাই নয়, আয় ও ব্যয় করা অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের জন্য কয়েকটি সন্দেহজনক হিসাব খোলা হয়। প্রয়োজনীয় লেনদেন শেষে এই হিসাবগুলো মুছে ফেলার (ডিলিট) পরিকল্পনা ছিল ব্যাংকটির। তবে তার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দল এ অনিয়ম চিহ্নিত করে। এরপর ডলার কেনাবেচা ও সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোর বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পরিদর্শক দলের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। সেই সময় ব্যাংকটিকে এ বিপত্তি থেকে বাঁচতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার শরণাপন্ন হয় পূবালী ব্যাংক। তার হস্তক্ষেপে তদন্ত প্রক্রিয়া সেখানেই থামিয়ে দিতে বাধ্য হন পরিদর্শকরা। মাত্র একটি শাখার এ অনিয়মের সূত্র ধরে পূবালী ব্যাংকের অন্যান্য এডি শাখা পরিদর্শনের উদ্যোগও আর অগ্রসর হতে পারেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম যেসব অনিয়ম পায়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিমের বিশেষ পরিদর্শনে দেখা যায়, পূবালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সেন্ট্রালাইজড ট্রেড প্রসেসিং ইউনিট (কেন্দ্রীভূত বাণিজ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট) বৈদেশিক মুদ্রার ধরন নির্দিষ্ট করে দিলেও আমদানি বিল ইস্যুর জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি আমদানিকারকদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত ১৪৮ কোটি টাকা আদায় করে। বিপুল পরিমাণ এ অর্থ ব্যাংকের মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার বেশ কয়েকটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এজন্য কোনো রকম অনুমোদন না নিয়েই ফরেন এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর নামে সাতটি হিসাব খোলা হয়।
একই সময়ে ব্যাংকটি বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউসের কাছ থেকে নির্ধারিত দরের চেয়ে উচ্চমূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছে। একটিমাত্র এডি শাখার মাধ্যমেই বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে অতিরিক্ত ২১১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এক্সচেঞ্জ হাউসের নামে খোলা পূবালী ব্যাংকের সাতটি হিসাবের মধ্যে চারটির অনুমোদন দিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব)। অন্য তিনটি হিসাব কার অনুমতি নিয়ে খোলা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পূবালী ব্যাংক ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি দরে এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে উচ্চমূল্য পরিশোধ করে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্সের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়ায় সরকারের ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পূবালী ব্যাংকের এসব অনিয়ম চিহ্নিত করার পর অন্যান্য শাখায় পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল। তবে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেই উদ্যোগ আটকে দেন। এমনকি উদ্ঘাটিত অনিয়মের জন্য পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি।
লেনদেন হয়েছে যেসব এক্সচেঞ্জ হাউসের নামে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ওই সময় অ্যারাবিয়ান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আনে পূবালী ব্যাংক। এ সময় বাজারের দর ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১১০ টাকার মধ্যে হলেও ব্যাংকটি ডলার কিনেছে সর্বোচ্চ ১১৭ টাকায়। এতে ব্যাংকটিকে অতিরিক্ত ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
মার্চেনট্রেডের কাছ থেকে ৫ কোটি ৫২ লাখ ডলার কিনতে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা দর দিয়েছে ব্যাংকটি। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। গালফ ওভারসিজ এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার কেনা হয় সর্বোচ্চ ১২২ টাকা দরে। এজন্য অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয় ২৬ কোটি টাকা। ইউনিভার্সাল এক্সচেঞ্জ সেন্টার থেকে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৭৭ লাখ ডলার কিনে পূবালী ব্যাংক, এতে অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
এনবিএল মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে ৪৫ লাখ ডলার কিনেছে ব্যাংকটি। এতে সর্বোচ্চ দর ছিল ১১৭ টাকা ৫০ পয়সা, যার কারণে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে।
ব্যাংকটি কন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জ সলিউশন্সের (আরআইএ) মাধ্যমে ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার কিনেছে। এতে সর্বোচ্চ দর ছিল ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি টাকা।
এছাড়া মাল্টিনেট ট্রাস্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৬ লাখ দিরহাম রেমিট্যান্স কিনেছে পূবালী ব্যাংক। এতে নির্ধারিত রেট ছিল ৩০ টাকা ০৮ পয়সা। কিন্তু ব্যাংকটি রেমিট্যান্স কিনেছে সর্বোচ্চ ৩৩ টাকা ২১ পয়সা দামে। এতে বাড়তি খরচ হয়েছে ১৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে আরও বলা হয়েছে, পূবালী ব্যাংক বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে আমদানিকারকদের কাছ থেকে থেকে বিল মূল্য বাবদ ঘোষিত দরের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছে। এই অর্থ মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার ৭টি হিসাবের বাইরেও ব্যাংকের অন্যান্য শাখার বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এমনকি এ কাজে বিভিন্ন গ্রাহকের হিসাবও ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে পূবালী ব্যাংকের বরিশাল হসপিটাল রোড শাখা একটি এলসির বিপরীতে ৫৬ হাজার ৮৫০ টাকা আদায় করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
পূবালী ব্যাংকের ডলার কারসাজির বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পূবালী ব্যাংককে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দুদকে
অপরদিকে, দুদকে পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিচ্ছিন্ন নির্দেশনা উপেক্ষা করে পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ্যান্ড সিইও মোহাম্মদ আলীসহ একটি চক্র ব্যাংকটিতে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার অনুত্থানেরপরও এই চক্রটি ব্যাংকে বহাল তবিয়ে আছেন এবং তাঁরা লুটপাট ও অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। বিষয়টি অতন্ত অনঅভিপ্রেত ও দুঃখজনক এবং ব্যাংকটির নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে অদক্ষ অযোগ্য কর্মকর্তা মোহজদ অলীকে এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগ করেছেন। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের শেল্টার পাওয়া তাদের জন্য সহজ হয়। এছাড়া ফাহিম আহমেদ ফারুক চৌধুরীকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যাংকটির পরিচালক করেছেন। তাদের মাধ্যমে যাবতীয় অনিয়ম ‘হালাল’ করার অপচেষ্টা করছেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এমডি মোহাম্মদ আলী চক্র হেড অফিস কর্পোরেট শাখায় নির্ধারিত রেটের বাইরে অতিরিক্ত দামে ডলার ক্রয় করে ব্যাংকের ২১১ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় অর্থাৎ আত্মসাৎ করেছেন। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটে পুবালী ব্যাংকের হেড অফিস কর্পোরেট শাখায় বিষয়টি সনাক্ত হওয়ার পর পুবলী ব্যাংকের ট্রেজারি শাখার প্রধান ও আইটি বিভাগের তৎকালীন প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় তারা স্বীকার করেন যে, বাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরণা রহমান ও এমডি মোহঞ্জদ আলীর নির্দেশে তারা নির্ধারিত দামের অনেক অতিরিক্ত দানে ওলার ক্রয় করেন। যাতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রয়কৃত ওই ডলারের অধিকাংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছিল। পূবালী ব্যাংকের হেড অফিস কর্পোরেট শাখায় ডলার ক্রয়ে জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসর পর পূবালী ব্যাংকের প্রতিটি কর্পোরেট শাখার জালিয়াতি ও ডলার ক্রয়ে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি অডিট করব নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু মোহাম্মদ আলী নিজের দুর্নীতি ধামা চাপা দিতে কৌশলে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইয়) চিফ প্রধান) মাসুদ বিশ্বাস, ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান ও মো. খুরশীদ আলমকে ম্যানেজ করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের এক্সচেঞ্জ করা শতশত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে না দিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ আসে পুবালী ব্যাংক পিএলসির বিরুদ্ধে। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানেও এই অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ বিষয়েও দুদকের একটি তদন্ত চলমান রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। এমনকি বিষয়টি উল্লেখ করে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও কোনো উত্তর দেন নি।
এএ