পাঁচ শরিয়াহ ব্যাংক একীভূতকরণ: ‘বেইল-ইন’ ‘অবসায়ন’ নাকি ‘একত্রীকরণ’?
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-১০-০৯ ১৬:৪৫:১৫

মোঃ খায়রুল হাসান: ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এর অধীনে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের মিটিংয়ে উক্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। আশা করা হচ্ছে আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের সর্ববৃহৎ এই ইসলামী ব্যাংকটি। ফলে গ্রাহক ও আমানতকারীদের আতংক দূর হবে এবং ইসলামী ব্যাংকিং সেবার পরিধি বৃদ্ধি পাবে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মারাত্নক প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণের অসহনীয় বোঝা এবং সুশাসনের অভাবে ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছা ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা, ব্যাংক খাতকে বড় ধরণের সংকট থেকে বাঁচানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপনের জন্য এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া অবধারিত ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি স্বতন্ত্র পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। যার একটি ‘প্রোম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ)’ বা ‘দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ’ এবং অন্যটি রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্জার এবং অবসায়ন। যখন পিসিএ’র মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তখন চূড়ান্ত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। এই অধ্যাদেশটি বাংলাদেশ ব্যাংককে সংকটগ্রস্ত ব্যাংক উদ্ধারে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদান করে। এর আওতায় প্রশাসক নিয়োগ, সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, ব্রিজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং ‘বেইল-ইন’ (মূলধন ও দায় রূপান্তর) এর মতো শক্তিশালী টুলস ব্যবহারের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এই অধ্যাদেশের বিধান অন্য যেকোনো আইনের ঊর্ধ্বে হওয়ায়, এটি নিয়ন্ত্রককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
পাঁচটি ব্যাংকের এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় পিসিএ কাঠামোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সংশোধনের আগেই ব্যাংকগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, রেজল্যুশন অধ্যাদেশের অধীনে সরাসরি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে এই জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়াটিকে কী নামে অভিহিত করা উচিত? এটি কি দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছায় একত্রিত হওয়ার মতো সাধারণ ‘একীভূতকরণ’? নাকি এটি এমন কোনো ব্যবস্থা যেখানে মালিক ও পাওনাদারদের ওপর দায় চাপানো হয়, যাকে ‘বেইল-ইন’ বলা হয়? অথবা এটি কি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার মতো ‘অবসায়ন’? নাকি অ্যামালগামেশন বা একত্রীকরণ প্রক্রিয়া যেখানে দুই বা ততোধিক কোম্পানি স্বেচ্ছায় একত্রিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন সত্তা তৈরি করে এবং মূল কোম্পানিগুলোর কোনোটিরই আইনি অস্তিত্ব থাকে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে।
সংকট কতটা জটিল ও ভয়াবহ?
অবধারিত মার্জার প্রক্রিয়া বুঝতে হলে ব্যাংক খাতের সংকটের ভয়াবহতার মাত্রা উপলব্ধি করা জরুরি। এটি কোনো সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবসায়িক মন্দা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার এক পুঞ্জীভূত বিস্ফোরণ।
খেলাপি ঋণের পাহাড়: সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাহাড় সমান পুঞ্জিভুত খেলাপি ঋণের, যা সংক্রামক রোগের মতো সমগ্র ব্যাংক খাতকে অসুস্থ করে তুলেছে। এই পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের (প্রায় ১.৯০ লক্ষ কোটি টাকা) ৭৭ শতাংশ। এই অবস্থা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং একটি আর্থিক ব্যবস্থার জন্য কার্যত পঙ্গুত্বের শামিল। তুলনামূলক বিচারে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাংকিং খাতের গড় খেলাপি ঋণের হার ৩-৪% এবং বিশ্বব্যাপী সহনীয় মাত্রা হিসেবে ৫% বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩০% অতিক্রম করলে সেটিকে বাধ্যতামুলত অবসায়ন বা পুনর্গঠনের জন্য বিবেচনা করা হয়। সেখানে গড়ে ৭৭% খেলাপি ঋণ কার্যত ব্যাংকগুলোর জন্য এক আর্থিক মহাবিপর্যয়।
ব্যাংকগুলোর শোচনীয় চিত্রের নমুনা: ইউনিয়ন ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯৮%, যা একটি ব্যাংকের কার্যতঃ মৃত্যুর সমতুল্য। এর অর্থ, প্রতি ১০০ টাকা ঋণ দিয়ে ৯৮ টাকাই আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটিকে একটি ‘জীবন্মৃত’ বা ‘জিন্দা লাশে’ পরিণত করেছে। একইভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৯৬%, ৯৫% এবং ৬২%। আর এক্সিম ব্যাংক তুলনামূলকভাবে নিজেদেরকে “ভালো” অবস্থানে থাকার দাবি করলেও এর খেলাপি ঋণের হার ৪৮%, যা যেকোনো সুস্থ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অকল্পনীয়।
মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি: খেলাপি ঋণের ঝুঁকির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলো প্রায় ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতিতে পড়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। এর অর্থ হলো, সম্ভাব্য ক্ষতি পূরণের জন্য তাদের কাছে কোনো রক্ষাকবচ নাই, যা তাদের পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ: এই সংকটের মূলে রয়েছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতি। নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ জালিয়াতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের অভাব ব্যাংকগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে। বিশেষ করে সরকার ঘনিষ্ঠ এস. আলম এবং নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন এই পাঁচটি ব্যাংককে সমস্যাগুলো প্রকট ছিল।
নিয়ন্ত্রকের একচ্ছত্র ভূমিকা: ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুসারে এই প্রক্রিয়াটি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে বা পারস্পরিক সম্মতিতে শুরু হয়নি, বরং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে পরিকল্পিত, পরিচালিত এবং বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
‘নন-ভায়াবল’ ঘোষণা: মার্জার প্রক্রিয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ হলো বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পাঁচটি ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নন-ভায়াবল বা অকার্যকর’ ঘোষণা করা। এই ঘোষণার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়া হয় এবং রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়।
প্রশাসক নিয়োগ: বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রতিটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ, যা এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে। ইতোমধ্যে প্রতিটি ব্যাংকে একজন করে প্রশাসক বসানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আইনি ভিত্তি: এই কঠোর পদক্ষেপগুলোর আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে নতুন প্রণীত অধ্যাদেশটি। এই অধ্যাদেশটি বাংলাদেশ ব্যাংককে শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার উপেক্ষা করে এবং বিদ্যমান চুক্তি পরিবর্তন করার মত প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ ক্ষমতা প্রদান করেছে। কোম্পানি আইন ১৯৯৪সহ প্রচলিত আইনি কাঠামো আধুনিক ও বাধ্যতামূলক ব্যাংক রেজল্যুশন কার্যকর করার জন্য অপর্যাপ্ত ছিল, যা এই নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তাকে ত্বরান্ত্বিত করেছে। আইনি প্রক্রিয়া মেনে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রেজল্যুশনের বিভিন্ন আর্থিক পরিভাষার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা
প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে বিশ্লেষণের করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু আর্থিক পরিভাষার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা জানা প্রয়োজন। প্রতিটি কৌশলের পেছনে রয়েছে ভিন্ন দর্শন এবং এটি স্টেকহোল্ডারদের ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে।
একীভূতকরণ বা মার্জার: এটি দুটি বা ততোধিক কোম্পানির স্বেচ্ছায় একত্রিত হয়ে একটি নতুন আইনি সত্তা গঠন করার প্রক্রিয়া। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক সম্মতি এবং উভয় পক্ষের জন্য সুবিধাজনক শর্ত (উইন উইন সিচুয়েশন)। সাধারণত বাজার সম্প্রসারণ, খরচ কমানো বা নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করার মতো কৌশলগত কারণে এ ধরনের একীভূতকরণ হয়ে থাকে।
অবসায়ন বা লিকুইডেশন: এটি একটি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচায়ক। যখন একটি কোম্পানি আর কোনোভাবেই তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে না, তখন তার কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
বেইল-আউট বা পতন রোধ করা: যখন কোনো ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে, বিশেষ করে সরকারি তহবিল থেকে মূলধন জোগান দেওয়া হয়, তখন তাকে বেইল-আউট বলে। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে সিস্টেমিক পতন রোধ করা, কিন্তু এর প্রধান সমালোচনা হলো এটি ‘মরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করে, অর্থাৎ ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করে।
বেইল-ইন বা বাঁচিয়ে তোলা: এটি একটি আধুনিক ও অপেক্ষাকৃত নতুন রেজল্যুশন প্রক্রিয়া, যা ২০০৮ সালের সংকটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে জনপ্রিয়তা পায়। এখানে একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে তার নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে বাঁচানো হয়। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগের মূল্য বাতিল করা হয় এবং বৃহৎ পাওনাদার বা আমানতকারীদের দাবিকে (ঋণকে) নতুন শেয়ারে (মালিকানা) রূপান্তর করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যর্থতার দায় করদাতার ওপর না চাপিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্টেকহোল্ডারদের ওপর আরোপ করা এবং বাজারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
কেন এটি প্রকৃত ‘একীভূতকরণ’ নয়? এই জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বাংলাদেশ ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-এর ক্ষমতাবলে এই একত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি জোরপূর্বক আরোপ করেছে, যা ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বা শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতির তোয়াক্কা করেনি। সাধারণ একীভূতকরণে দীর্ঘ সময় ধরে ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ বা পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষা চালানো হয়, যেখানে উভয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, সম্পদ ও দায়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয় এবং সবশেষে শেয়ারহোল্ডারদের ভোটে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এখানে তেমন কিছুই ঘটেনি। এটিকে একটি ‘শটগান ওয়েডিং’ বা বন্দুকের নলের মুখে বিয়ে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা চলে। যেখানে সাধারণ একীভূতকরণের উদ্দেশ্য থাকে সিনার্জি (যেমন—পরিচালন খরচ কমানো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি) তৈরি করা, সেখানে এই পদক্ষেপের একমাত্র উদ্দেশ্য অস্তিত্ব রক্ষা এবং একটি ব্যাংকের পতন থেকে সৃষ্ট সংকট যেন অন্য ব্যাংকে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
কেন এটি ‘অবসায়ন’ নয়? পুরো পরিকল্পনাটিই অবসায়ন এড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। পাঁচটি ব্যাংককে একসঙ্গে অবসায়ন করা হলে তা দেশের আর্থিক খাতে সুনামি ডেকে আনবে। এই ব্যাংকগুলোতে কোটি কোটি আমানতকারীর হিসাব রয়েছে। সবার আমানত একসঙ্গে ফেরত দিতে হলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত, আন্তঃব্যাংক লেনদেন বন্ধ হয়ে যেত এবং অর্থনীতির চাকা থেমে যাওয়ার উপক্রম হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্রিজ ব্যাংক চালুর মাধ্যমে আর্থিক পরিষেবা চালু রাখা এবং সিস্টেমিক কলাপ্স রোধ করা।
“রাষ্ট্র-নির্দেশিত বাধ্যতামূলক একত্রীকরণ”: এটি কোনো স্বাভাবিক বা প্রচলিত একীভূতকরণ নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলো স্বেচ্ছায় বা ব্যবসায়িক স্বার্থে একীভূত হচ্ছে না, বরং এটি সরকারের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত। এর মূল লক্ষ্য হলো, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহত্তর ও সবল কাঠামোর অধীনে এনে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা।
“পুনঃমূলধনীকরণ”: সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি নতুন করে শক্তিশালী করা। বিপুল পরিমাণ মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকগুলোর সলভেন্সি বা পরিশোধ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং সেগুলোকে কার্যকর ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই এর লক্ষ্য।
“হাইব্রিড বেইল-ইন/বেইল-আউট পদ্ধতি”: ব্যাংকগুলোকে উদ্ধারের খরচ দুটি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। ‘বেইল-ইন’ পদ্ধতির আওতায়, লোকসানের একটি বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে ব্যাংকের মালিক, শেয়ারহোল্ডার এবং বৃহৎ আমানতকারীদের। অন্যদিকে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য সিস্টেমিক ঝুঁকি বা সার্বিক পতন রোধ করতে সরকার ‘বেইল-আউট’ পদ্ধতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে প্রয়োজন ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার ২০০ কোটি, আমানত বিমা ট্রাস্ট থেকে আসবে সাড়ে ৭ হাজার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দেবেন আরও সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার।
যৌক্তিকতা এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: এই হাইব্রিড পদ্ধতি, যদিও জটিল, তবে এটি অনন্য নয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর অনেক দেশেই রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় একই ধরনের পদ্ধতির সমন্বয় দেখা গেছে, বিশেষ করে যেখানে একটি বিশুদ্ধ বেইল-ইন আর্থিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত অস্থিতিশীল বলে মনে করা হয়েছিল। বাংলাদেশে এই মডেলটি বেছে নেওয়ার কারণ হলো সংকটের ভয়াবহতা। মূলধনের ঘাটতি এতটাই বিশাল ছিল যে, শুধুমাত্র বেইল-ইনের মাধ্যমে তা পূরণ করতে গেলে সকল আমানতকারীর মধ্যে আস্থা সংকট তৈরি হতো, যা একটি সিস্টেমিক পতন ঘটাতে পারতো। এক্ষেত্রে, বেইল-আউট উপাদানটি সিস্টেমিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য একটি অপরিহার্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
মালয়েশিয়ার মডেল: ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়া ‘দানাহার্তা’ নামে একটি জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) প্রতিষ্ঠা করে। এর একমাত্র কাজ ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সমস্ত খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়া। এর ফলে মূল ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে “ভালো ব্যাংকে” পরিণত হয় এবং স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারে। অন্যদিকে, দানাহার্তা “খারাপ ব্যাংক” হিসেবে সেই খেলাপি ঋণ থেকে সর্বোচ্চ আদায়ের দিকে মনোনিবেশ করে। এই মডেলটি অত্যন্ত সফল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল কারণ এটি সমস্যার মূল (খেলাপি ঋণ) এবং সমাধানকে (নতুন ঋণ বিতরণ) দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে ভাগ করে দিয়েছিল।
জাপানের “হারানো দশক” এবং “জোম্বি ব্যাংকের” জন্ম: ১৯৯০-এর দশকে জাপান ভিন্ন পথে হেঁটেছিল। তারা খেলাপি ঋণ আলাদা না করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একে অপরের সাথে একীভূত করার নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে বিশাল কিন্তু অদক্ষ “জোম্বি ব্যাংক” তৈরি হয়, যেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণে বেঁচে থাকত কিন্তু খেলাপি ঋণের বোঝায় এতটাই ভারাক্রান্ত ছিল যে তারা অর্থনীতির সুস্থ ও উদ্ভাবনী খাতে ঋণ দিতে পারত না। এই ভুল নীতির কারণে জাপান প্রায় দুই দশক দীর্ঘ অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে পড়ে, যা “হারানো দশক” নামে পরিচিত।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ কি হতে পারে?
‘জোম্বি ব্যাংকের’ ফাঁদ এড়ানো: বাংলাদেশের গৃহীত পদ্ধতিটি জাপানের মডেলের কাছাকাছি, যা বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। নতুন ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংককে একই সাথে “ভালো ব্যাংক” এবং “খারাপ ব্যাংক”-এর দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায় এবং নতুন ঋণ বিতরণ—এই দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য একসাথে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। এর ব্যবস্থাপকদের একদিকে পুরোনো খেলাপিদের পেছনে ছুটতে হবে, অন্যদিকে নতুন ও সম্ভাবনাময় খাতে ঋণ বিতরণের সুযোগ খুঁজতে হবে, যা কঠিন ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা।
মরাল হ্যাজার্ডের ঝুঁকি: ২০ হাজার ২০০ কোটি টাকার সরকারি অর্থের ব্যবহার এই শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, বড় আকারের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ক্ষতির বোঝা বহন করবে। এটি ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণকে উৎসাহিত করতে পারে। যদি সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কোনো প্রকার জবাবদিহির আওতায় আনা না হয়, তবে এই বেইল-আউট দুর্নীতিকে পুরস্কৃত করার নামান্তর হবে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা: এই সংকটের মূল কারণ ছিল সুশাসনের অভাব। সুতরাং, স্থায়ী সমাধানও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আসতে হবে। নতুন ব্যাংকের জন্য একটি স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বন্ধ হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত থেকে কঠোর নজরদারি করার ক্ষমতা দেওয়া অপরিহার্য।
পরিশেষে বলা যায়, পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ কোনো গল্পের শেষ নয়, বরং এটি সংস্কারের পথে বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি দীর্ঘ এবং কঠিন পরীক্ষার শুরু। এই পদক্ষেপের সাফল্য বা ব্যর্থতা আগামী দশকের জন্য দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। চলমান এই হস্তক্ষেপকে কোনো একক নামে চিহ্নিত করা হলে তা কেবল খণ্ডিত সত্য প্রকাশ করবে। এটি একাধারে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন, আর্থিক পুনরুজ্জীবন এবং ঝুঁকি বণ্টনের এক জটিল সমন্বয়, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন্স প্রধান।







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













