শরিয়াহভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংক: আর্থিক খাতে নতুন দিগন্ত
::মো. খায়রুল হাসান, সিএসএএ প্রকাশ: ২০২৫-১০-২৬ ১৭:৪২:১৪

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আকিজ রিসোর্স লিমিটেড ঘোষণা দিয়েছে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার। “মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক” নামে প্রস্তাবিত এই প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম শরিয়াহ-সম্মত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক—যা প্রযুক্তি, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে ব্যাংকিং খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাত দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, এমনকি ভারতেও ইতোমধ্যে ডিজিটাল-অনলি ব্যাংক বা শাখাবিহীন ব্যাংকিং সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইউরোপের “Revolut”, “N26”, যুক্তরাষ্ট্রের “Chime” বা মালয়েশিয়ার “Boost Bank” সবগুলোই সম্পূর্ণ ভার্চ্যুয়াল ব্যাংক, যেখানে গ্রাহকরা অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে ঋণ গ্রহণ পর্যন্ত নিজেদের সুবিধামত সব কাজ করতে পারেন শাখায় না গিয়েই। বিশ্ব পরিক্রমায় বাংলাদেশও এখন সেই ধারায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন আহ্বান করেছে, যেখানে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলা।
আকিজ রিসোর্সের উদ্যোগ: “মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক”
গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীর আকিজ হাউজে আয়োজিত “আকিজ রিসোর্স ডিজিটাল ইকোসিস্টেম: পরিবর্তনে নেতৃত্বদানকারী” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের প্রস্তাবিত ব্যাংকটির নাম হবে “মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক”, যার কার্যক্রম পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ ইসলামী শরিয়াহ নীতিমালার আলোকে। এ বিষয়ে আকিজ রিসোর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জসিম উদ্দিন বলেন, “আকিজ রিসোর্স বিশ্বাস করে ব্যাংকিং শুধু লেনদেন নয়, এটি মানুষের আর্থিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অগ্রগতির হাতিয়ার। আমরা এমন একটি ডিজিটাল ব্যাংক তৈরি করতে চাই, যা প্রযুক্তি, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে পরিচালিত হবে।”
প্রতিষ্ঠানটির চিফ ডিজিটাল ও ইনোভেশন অফিসার ইঞ্জি. মো. ফিরোজ কবির বলেন, আমরা এমন একটি স্মার্ট সিস্টেম তৈরি করছি, যেখানে ব্যাংকিং হবে দ্রুত, সহজ ও ব্যবহারবান্ধব। ব্যাংকের দরজায় না গিয়েও গ্রাহক তার সব আর্থিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক হবে সুদমুক্ত ও চার্জ-ফ্রি। অর্থাৎ, টাকা স্থানান্তর বা লেনদেনে কোনো চার্জ দিতে হবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, নারী উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি (এমএসএমই) ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি আবাসন ও গৃহায়ন খাতেও শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন করেব প্রতিষ্ঠানটি।
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ও ডিজিটাল রূপান্তরের সমন্বয়
ইসলামী ব্যাংকিং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক এবং বেশ কয়েকটি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী উইন্ডো রয়েছে। তবে, শাখা-ভিত্তিক প্রচলিত কাঠামোর কারণে এই ব্যাংকগুলোতে এখনো প্রযুক্তিগতভাবে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে “মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক”এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। একদিকে শরিয়াহভিত্তিক ন্যায্য ও সুদমুক্ত আর্থিক কাঠামো, অন্যদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার—এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম। ডিজিটাল ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচিকে আরো ত্বরান্বিত করবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০% জনগণ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে। স্মার্টফোন ও মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তারের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠী সহজেই শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল ব্যাংকের আওতায় আসতে পারবে।
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা: আকিজের প্রস্তুতি
আকিজ রিসোর্স দীর্ঘদিন ধরেই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অগ্রগামী। তাদের সব ইউনিটে কাগজবিহীন ও ডিজিটাল লজিস্টিক সিস্টেম চালু রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই তারা ব্যাংকিং খাতে নিরাপদ ও কার্যকর ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি টিম ইতোমধ্যে ভবিষ্যতের ব্যাংকিং অবকাঠামো তৈরিতে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডাটা অ্যানালিটিকস ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন একটি স্মার্ট ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে, যা হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরাপদ। ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে এটি কোনো শাখা, এটিএম, বা শারীরিক কাউন্টার ছাড়া সম্পূর্ণ অনলাইন-নির্ভরভাবে পরিচালিত হবে। গ্রাহকরা মোবাইল অ্যাপ, ওয়েব প্ল্যাটফর্ম ও কিউআর ভিত্তিক পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সেবা পাবেন।
নৈতিক ব্যাংকিং ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
“মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক” শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটি একটি নৈতিক ব্যাংকিং আন্দোলন । ব্যাংকটির লক্ষ্য শুধু মুনাফা নয়, বরং আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটানো। শরিয়াহ অনুযায়ী ব্যাংকটি সুদ (রিবা) গ্রহণ বা প্রদান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবে। বিনিয়োগ হবে বাস্তব অর্থনীতিতে, যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, গৃহায়ন ও সামাজিক উদ্যোগে। এই ব্যাংক ঝুঁকি-বণ্টনমূলক অংশীদারিত্ব মডেল (profit-and-loss sharing) অনুসরণ করবে, যা প্রচলিত ব্যাংকের ঋণভিত্তিক পদ্ধতির বিকল্প। এছাড়া, আকিজ রিসোর্স ব্যাংকিং সেবায় সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যাতে গ্রামীণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যেমন-
- জনগণের ক্রমবর্ধমান আস্থা: শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিংয়ের প্রতি জনগণের আস্থা ও চাহিদা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান।
- ডিজিটাল স্বাক্ষরতা সম্পন্ন গ্রাহক: দেশে প্রায় ১১ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছে, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিশাল বাজার।
- খরচ বিহীন সহজ লেনদেন: ফি-মুক্ত সেবা ও সহজ লেনদেন গ্রাহকদের জন্য নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করবে।
যেহেতু ডিজিটাল ব্যাংকের ধারণা বাংলাদেশে নতুন, যেহেতু এই সার্ভিসে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে-
- সাইবার নিরাপত্তা: ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও সাইবার হুমকি মোকাবিলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
- ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা: গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
- সঠিক তদারকি: শরিয়াহ বোর্ডের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যসমূহ শরিয়াহর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
- বাজার প্রতিযোগীতা: প্রচলিত ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিস (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট) এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেও কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ইতোমধ্যেই মোট আমানতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দখল করেছে। এখন সময় এসেছে এই খাতকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার। “মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক” সফলভাবে চালু হলে শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও শরিয়াহসম্মত অর্থনীতির প্রসারেও অবদান রাখবে। ডিজিটাল ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তারা সহজে বিনিয়োগ পাবে, শিক্ষিত বেকার যুব সমাজ হালাল ফাইন্যান্সে উদ্যোগ নিতে পারবে এবং দেশের আর্থিক খাত আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠবে।
“মুনাফা ডিজিটাল ব্যাংক” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত শুধু ডিজিটালই হবে না, বরং ন্যায্যতা, আস্থা ও সামাজিক দায়িত্বের ভিত্তিতে টেকসই ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপান্তরের এই যাত্রা হতে পারে বিশ্বের প্রথম সারির শরিয়াহভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম— যা একদিন “Smart, Ethical & Inclusive Bangladesh” গঠনের পথে নেতৃত্ব দেবে।
লেখক: ইসলামী ব্যাংকিং ও শরীয়াহ গভর্নেন্স বিশেষজ্ঞ এবং আর্থিক যোগাযোগ প্রফেশনাল
এএ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













