

দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জন্য ব্যাংক নয়, আসতে হবে পুঁজিবাজারে। এ লক্ষ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রতিবেদন আকারে পাঠাতে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটিও হয়েছে। এই কমিটি বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বন্ড বা শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসে সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করণীয় বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে একসাথে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে।
পুঁজিবাজার গঠিত হয়েছে যৌথ কমিটি
গত ১১ মে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় শেয়ারবাজার নিয়ে অনুষ্ঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে পাঁচটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বড় বড় কোম্পানি যাতে ব্যাংকঋণ নেওয়ার বদলে শেয়ারবাজারে বন্ড বা শেয়ার ছেড়ে পুঁজি সংগ্রহে আগ্রহী হয়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও ছিল। এ নির্দেশনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে কাজ শুরু করে বিএসইসি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের চার জন প্রতিনিধি, বিএসইসির দুই জন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুই জনসহ মোট আট জনের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গঠিত কমিটি সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে বন্ড বা শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয় বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরেছে এই কমিটি। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারে জোর বিশেষজ্ঞদের
বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংক থেকে অর্থায়নের প্রতি জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংকগুলোকেই বেছে নেয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। অচথ ব্যাংক কখনোই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে পারেনা। বড় বড় প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজারে যাওয়ার পরামর্শ তাঁদের। সেইসাথে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ভাগাভাগি করতেও জোর দিয়েছেন তাঁরা। এজন্য বন্ড, ডিবেঞ্চার ও শেয়ারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ সাধারণত পুঁজিবাজার থেকে হয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারটা সেভাবে উন্নত হয়নি বলেই কিন্তু আসলে দীর্ঘদিন ব্যাংক নির্ভরশীলতা ছিল। সেজন্য পুঁজিবাজারকে ভাইব্রেট করতে চাইলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি যে ঋণগুলো আছে সেগুলো যাতে করে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে হয়। এটা আমাদের সুপারিশের মধ্যে ছিল।
ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নেয়ার ঝুঁকি তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো স্বল্প মেয়াদে মানুষের ডিপোজিট নিয়ে যখন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান করে তখন এখানে খেলাপি ঋণ তৈরি হয়। এখানে সময়ের বিষয় আছে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি মূলধন পুঁজিবাজারই সরবরাহ করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বা বড় অংকের ঋণ কোন অবস্থাতেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেয় না। ব্যাংকের কাজ হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী ও মধ্যমেয়াদী ঋণ দেওয়া। স্বল্প মেয়োদে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সর্বোচ্চ মধ্যমেয়াদী ঋণকে ধরা যেতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যাংকের কাজ নয়।
পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সরবরাহে কাজ করছে বিএসইসি
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ যাতে পুঁজিবাজার থেকে হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছে বিএসইসি। এর আগে পুঁজিবাজার সংস্কারের লক্ষ্যে বিশেষ এই টাস্কফোর্স গঠন করেছিল বিএসইসি। এই টাস্কফোর্স বিভিন্ন সুপারিশ সংস্থাটির নিকট তুলে ধরে। সুপারিশে ব্যাংক থেকে যেসব কোম্পানি এক হাজার কোটি টাকা বা এর বেশি ঋণ নেবে, সেসব কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ব্যাপারে সব ব্যাংকে নির্দেশনা প্রদানের সুপারিশও করা হয়। পর্বর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ যাতে পুঁজিবাজার থেকে হয় সে বিষয়ে নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টাও। সেই নির্দেশনার অংশ হিসেবেই কাজ করছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক রিপোর্ট জমা দিলে এরপর সরকার সেই রিপোর্টে যেই টাইমলাইন বা ইত্যাদি দেওয়া থাকবে সেটা অনুযায়ী কমিশনের যা করণীয় এটা করবে। এখানে যদি বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্যদের হেল্প প্রয়োজন হয় সেই জায়গায় কমিশন যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সেগুলো নিবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি আছে। সেক্ষেত্রে সরকার যদি বড় ঋণের নির্ভরতা ব্যাংক খাত থেকে কমিয়ে পুঁজিবাজারের দিকে নিতে পারে তাহলে ব্যাংকে খেলাপি ঋণের চাপটা কমবে, অর্থনীতি অবস্থা ভালো থাকবে। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জন্য নীতিমালা প্রণীত হলে তা খুবই ইতিবাচক হবে। এছাড়াও সার্বিক ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি ক্যাপিটাল মার্কেট ও মানি মার্কেট দুইটার জন্যই ভারসাম্য তৈরি করতে এটা জরুরী বলে মনে করেন তাঁরা।
এএ