বাংলাদেশে কী পুঁজিবাজারের প্রয়োজন আছে?

বিনিয়োগকারীদের পথে বাসাচ্ছে সরকার

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৫-১১-০৬ ১০:০৯:০১


পুঁজিবাজারের পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে দুর্বল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসকরা বুধবারই যোগদান করেছেন। এর মাধ্যমে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূতকরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলো।

একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পথে বসাচ্ছে সরকার। নতুন হতে যাওয়া ব্যাংকের কোন শেয়ার পাবে না সাধারণ শেয়ারহোল্ডারা। শেয়ারহোল্ডাদের প্রশ্ন আমাদের অপরাধ কোথায়? আর্থিক প্রতিবেদন দেখে আমরা বিনিয়োগ করেছি। এখন মনে হয় বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের প্রয়োজন আছে?

গভর্নরের সংবাদ সম্মেলনের পর বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়, ব্যাংক খাতে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাসহ সামগ্রিক শৃঙ্খলা আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাসহ জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে পাঁচটি ব্যাংককে রেজল্যুশন বা নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হলো।

একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে গত সরকারের আমলে চারটি ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। আর ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান ও নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল এক্সিম ব্যাংক। এস আলম গ্রুপ ও এর প্রধান সাইফুল আলম এবং নজরুল ইসলাম মজুমদারদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। নজরুল ইসলাম মজুমদার বর্তমানে কারাগারে আটক। অন্যদিকে সাইফুল আলম দেশে নেই।

গত সরকারের সময়ে এসব ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে  উচ্চ খেলাপি ঋণ, ব্যাপক মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকট তৈরি হয়। ব্যাংকগুলো অনেকদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ঠিকমতো ফেরত দিতে পারছে না। এসব ব্যাংকে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে। এসব ব্যাংকে আমানতকারীর সংখ্যা ৭৫ লাখ।

সময় লাগবে দুই বছর

বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের সঙ্গে  চার ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকগুলোতে প্রশাসকরাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গভর্নর বলেন, একীভূতকরণের কাজ পুরোপুরি শেষ হতে এক থেকে দুই বছর লাগতে পারে। এসব ব্যাংকের  আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকার নিলেও পরিচালনা পর্ষদ ও  ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ হবে বেসরকারি ব্যাংকের আদলে।

আমানতকারীদের উদ্দেশে আহসান মনসুর বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ব্যাংকগুলোর আমানত নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কেউ যেন অপ্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা না করেন। বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক থেকেও সবাই টাকা তোলার জন্য লাইন ধরলে ওই ব্যাংক টাকা দিতে পারবে না।

তিনি বলেন, একীভূতকরণ কার্যকরের দিন থেকেই এসব ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে বাজারভিত্তিক মুনাফা দেওয়া হবে। ফলে কেবল সুদের কারণে কেউ টাকা তুলবেন না। এরপরও ব্যাপক অর্থ উত্তোলন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুই লাখ টাকার বেশি আমানত উত্তোলনের একটি সময়সীমা দেওয়া হবে।  সরকারি গেজেটের মাধ্যমে যা জানানো হবে। তবে যেসব আমানতকারীর দুই লাখ টাকা বা তার কম রয়েছে, তারা চাইলে চলতি মাসেই সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

গভর্নর বলেন, একীভূত হওয়ার পর নতুন ব্যাংকটি হবে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক। সেভাবেই পরিচালনা পর্ষদ ও এমডি নিয়োগ হবে। এর আগে ইস্টার্ন ব্যাংক একীভূতকরণের সময় যেসব আমানতকারী শেয়ার পেয়েছিলেন তারা সবাই লাভবান হয়েছেন। এসব ব্যাংকের যেসব আমানতকারী শেয়ার পাবেন তারাও অনেক লাভবান হবেন।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর  বলেন, যে সরকারই আসুক, তাদের স্বার্থেই  এগিয়ে নিতে হবে। জনগণ, দেশ এবং আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকগুলো  একীভূত  করা হচ্ছে। এর সফল বাস্তবায়ন আগামী সরকারের জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক স্থিতিশীলতা আনবে এবং অর্থনীতিতে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। ফলে এগিয়ে না নেওয়ার কিছু তিনি দেখেন না। তবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।

কোন ব্যাংক ডুবাল কে

ব্যাংকগুলোতে পাঠানো চিঠিতে কোন প্রতিষ্ঠানে কার বেশি ঋণ, সে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে এস আলম, নাসা, সিকদার, বসুন্ধরা গ্রুপসহ আরও কয়েকটি গোষ্ঠী জড়িত। এস আলম গ্রুপ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতিতে জড়িত। এ ছাড়া সিকদার, নাসা ও দেশবন্ধু গ্রুপের নেওয়া ঋণের আদায় নেই। ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের একই পরিণতির জন্য দায়ী এস আলম গ্রপ। এক্সিম ব্যাংকের ক্ষেত্রে দায়ী করা হয় নাসা, বেক্সিমকো, এস আলমসহ আরও কয়েকটি গ্রুপকে।

চিঠিতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়, ‘আপনাদের ব্যাংক আর্থিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এককভাবে কার্যকর হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আয় দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে অক্ষম।’

শেয়ার শূন্য হবে

একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। ব্যাংকের অর্ধেকের মতো শেয়ার স্পন্সর উদ্যোক্তাদের হাতে। বাকি অর্ধেক পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের হাতে।

শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে এসব ব্যাংকের শেয়ার শূন্য হবে। কোনো ব্যাংকের নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হলে সেই ব্যাংকের শেয়ার থেকে পাওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, বাজার থেকে শেয়ারহোল্ডাররা ঝুঁকি নিয়েই শেয়ার কিনেছেন। অনেক দেশে নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হলে শেয়ারহোল্ডারদের উল্টো টাকা দিতে হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেদিকে যাচ্ছে না। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে সব শেয়ার শূন্য করার কথা বলা হয়েছে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রতিটির ১০ টাকার শেয়ারের মূল্য ঋণাত্মক ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা হয়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক চর্চা অনুযায়ী শেয়ারধারীরা কিছুই পাবেন না। তাঁদের শেয়ার শূন্য হয়ে গেছে। তাঁদের কাছে আমরা অর্থ দাবি করছি না, এটাই তাঁদের ভাগ্য। তবে যাঁরা বন্ডে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁরা টাকা বা শেয়ার পাবেন।’

প্রশাসক কারা

এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শওকাতুল আলম। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে আরেক নির্বাহী পরিচালক সালাহ উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।  ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান দিদার প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মো. মোকসুদুজ্জামান এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে আরেক পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসেমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বুধবারই পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকরা বিভাগীয় প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে তারা প্রাথমিক দিকনির্দেশনা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, ‘অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক একীভূতকরণের একটি পর্যায় আমরা পার হলাম। তাদের সহায়তার জন্য প্রতিটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরও চারজন করে কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথমত– ব্যাংকগুলোর এলসি খোলাসহ দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা। দ্বিতীয়ত–  তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো ও নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা। তৃতীয়ত– মানবসম্পদের মূল্যায়ন।  চতুর্থত– একই এলাকায় একাধিক শাখা থাকলে বন্ধ করে দূরবর্তী এলাকায় স্থাপনের ব্যবস্থা।

নাম হবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংক মিলে নতুন ব্যাংকের নাম হবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। নতুন ব্যাংক আপাতত সরকারি মালিকানায় থাকবে। এক পর্যায়ে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। এর মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার। আর আমানতকারীদের তাদের আমানতের বিপরীতে  ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে। এসব ব্যাংকে আমানতকারীর বর্তমানে জমা আছে এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা ৭৬ শতাংশ এখন খেলাপি।

জনবলের কী হবে

একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকে বর্তমান ৭৫ লাখ আমানতকারীর জমা আছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকার। এই ঋণের মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা ৭৬ শতাংশই এখন খেলাপি। সারা দেশে এসব ব্যাংকের ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকের। এ ছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামীর ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামীর ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। ব্যাংকগুলোতে রয়েছে ১৫ হাজার জনবল।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, পাঁচ ব্যাংকে জনবল যা আছে, তারা সবাই থাকবে। এসব ব্যাংকের শাখা কোথায় স্থানান্তর করা যায়, তা যাচাই করে দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারও চাকরি যাবে না। ভবিষ্যতে একীভূত ব্যাংকের যাত্রা শুরু হলে তখন চাহিদা অনুযায়ী জনবল থাকবে।