

প্রভিশন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে রয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা নিয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটি ঋণ ও লিজ খাতে ৪২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর এর জন্য ডেফারেল সুবিধা বা সময়সীমা বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে।
সেইসাথে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ, লিজ এবং অন্যান্য মিলে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৪৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮৪৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ, যা মোট বিনিয়োগের ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
হিসেবে আসেনি সুদের ব্যয়
নিরীক্ষা প্রতিবেদন (নোট ৭.১.১) অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসির নিকট থেকে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট ২৫২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি গৃহিত ঋণের ওপর আরোপিত সুদ ব্যয় হিসাব করেনি। ১১ শতাংশ সুদ হারে নেওয়া এ ঋণে সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যয় ও দায়ের চিত্র সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয়নি। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুদকে আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করে তা ‘ইন্টারেস্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে’ স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স।
সেইসাথে বিদেশি ঋণের বিপরীতে সৃষ্ট বিনিময় ক্ষতি (আনরিয়ালাইজড এক্সচেঞ্জ লস) আর্থিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদি এটা অন্তর্ভুক্ত করা হতো, তাহলে ৪৯ কোটি ২৬ লাখ টাকার ক্ষতি হতো। নিরীক্ষক জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এই ক্ষতি ২০২৫-২৬ বছর থেকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে জমা হয়নি কোন অর্থ
নিরীক্ষক আরও জানিয়েছে, চলতি বছরে কোম্পানিটি কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে বা ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে (ডব্লিউপিপিএফ) কোনো অর্থ জমা করেনি। এটি শ্রম আইন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের নীতিমালার ব্যত্যয়।
এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শামিম আল মামুন বলেন, এ বিষয়ে আমাদের ব্যক্তব্য আর্থিক প্রতিবেদনে দেয়া আছে। তাঁর কাছ থেকে মন্তব্য চাইলে তিনি কোন ব্যক্তব্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
নিরীক্ষক জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন, সার্কুলার, নির্দেশিকা ও গাইডলাইন অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হিসাবমান নির্ধারক সংস্থা (আইএএসবি) কর্তৃক প্রণীত এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানের (আইএফআরএস) সঙ্গে ভিন্নতা তৈরি করে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধানই প্রাধান্য পায় বলে জানায় নিরীক্ষক। ফলে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানের (আইএফআরএস) কিছু ধারার বাইরে থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে নিরীক্ষক।
তৃতীয় প্রান্তিকে লংকাবাংলার আর্থিক অবস্থা
এদিকে চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৩৪ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৪) শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৪৬ পয়সা। আর চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সমন্বিত ইপিএস ছিল ৫৪ পয়সা। যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪-এর জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল ৬৭ পয়সা। চলতি বছরে জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বরে সমন্বিত এনওসিএফপিএস ছিল ৩ টাকা ৪১ পয়সা, যেখানে আগের বছরে ছিল ৫ টাকা। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে সমন্বিতভাবে শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য দাঁড়ায় (এনএভি) ১৮ টাকা ৮৭ পয়সা এবং ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরে শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য ছিল ১৮ টাকা ৩২ পয়সা।
লংকাবাংলা ফাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ ইপিএস কমার পেছনে কারণ হিসেবে বিনিয়োগ আয় হ্রাস পাওয়া, ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ বৃদ্ধি এবং ঋণ তহবিল সংগ্রহে ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত মোট নগদ প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় কমেছে। গ্রাহকদের কাছে ঋণ ও অগ্রিম অর্থ বিতরণ বৃদ্ধির কারণে এটি কমেছে। তবে কোম্পানির নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) বেড়েছে, যা মূলত অর্জিত লাভ থেকে অব্যবহৃত আয় (রিটেইনড আর্নিংস) বৃদ্ধির ফলে হয়েছে।
লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ২০২০ সালে ১২ শতাংশ এবং ২০২১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এছাড়া ২০১৬ সালে ১৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে সাড়ে ৭ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে।
কোম্পানিটির পরিচালক ও উদ্যোক্তাদের অধীনে ৩৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ২২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৪৩ দশমিক ০৮ শতাংশ শেয়ার।
এএ